• রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads

অপরাধ

আলোচনায় সম্রাট

ধরাছোঁয়ার বাইরে গডফাদাররা

  • এমদাদুল হক খান
  • প্রকাশিত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান শুদ্ধি অভিযান সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শুদ্ধি অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হবে যদি মদতদাতাদের আইনের আওতায় আনা না যায়। কেবল চুনোপুঁটিদের আইনের আওতায় আনলে সুশাসন নিশ্চিত হবে না। আবারো একই চিত্র ফিরে আসবে।

চলমান অভিযানে ক্যাসিনো ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগে চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও মূল গডফাদাররা এখনো রয়েছেন বহালতবিয়তে। পর্দার আড়ালে থাকা যেসব গডফাদার কোটি কোটি টাকার ভাগ নিয়েছেন, তাদের কী হবে, তারা ধরা পড়বেন তো? এ রকম নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের মানুষের মুখে মুখে।

অনেকেই বলছেন, বিভিন্ন দল থেকে আসা ক্ষমতাসীনদের দলে ভেড়া হাইব্রিড নেতাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার, চলমান অভিযানে প্রকৃত গডফাদাররা এখনো কেউ ধরা পড়েননি।

অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীতে ক্যাসিনো চালানো, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিসহ পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। তার ছত্রছায়ায় থেকেই যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও জি কে শামীম অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। প্রতিদিন ক্যাসিনো থেকে ৪০ লাখ টাকা ভাগ পেতেন যুবলীগ নেতা সম্রাট। তাদের অবৈধ ব্যবসার ভাগ পেতেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, রাজনীতিবিদ ও দেশের বাইরে থাকা তালিকাভুক্ত কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, মতিঝিলসহ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় যেসব ক্লাব রয়েছে, তাতে ক্যাসিনোসহ প্রতিদিন চলত জুয়া। এসব ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি সম্রাট। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও ভবনের টেন্ডারও তার নিয়ন্ত্রণে। এই এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অবৈধ কার পার্কিং থেকেও প্রতিদিন মোটা অঙ্কের চাঁদা ঢোকে সম্রাটের পকেটে। এসব নিয়ন্ত্রণ করে সম্রাটের লোকজন।

আগে থেকে সম্রাটের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ থাকলেও যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি এলাকায় আরো প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বলে সূত্রগুলো জানায়।

গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করছে মহানগর ডিবি পুলিশ। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে ৫০ জনের একটি তালিকা দিয়েছেন খালেদ। যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদের মুখ থেকে রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৫০ জনের নাম শুনে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছেন জিজ্ঞাসাবাদকারী পুলিশ কর্মকর্তারা। বিশেষ করে মতিঝিল ক্লাবপাড়ার ক্যাসিনোগুলো থেকে পুলিশ প্রকাশ্যে মাসোহারা নিয়ে যেত। মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট জোনের এসি, এডিসি ও ডিসিকে ম্যানেজ করেই চলত এ ব্যবসা। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদে ৩ জন ক্রীড়া সাংবাদিক ও রেলের দুই কর্মকর্তারও নাম এসেছে। যাদের সঙ্গে তার অর্থ লেনদেন হয়েছিল। রাজধানী ঢাকার ১৭টি ক্লাবে ক্যাসিনো চালানো, টেন্ডারবাজি ও পশুর হাটে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সদ্য বহিষ্কৃত ঢাকা দক্ষিণের যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। ভূঁইয়া অ্যান্ড ভূঁইয়া নামে প্রতিষ্ঠানের নামে রাজউক, রেল ভবন, ঢাকা সিটি করপোরেশন (দক্ষিণ), পানি উন্নয়ন বোর্ড, যুব ভবন, কৃষি ভবন, ফকিরাপুল ওয়াসা জোন ও শিক্ষা ভবনসহ বিভিন্ন সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করতেন খালেদ। এদিকে এতদিন যুবলীগের পরিচয়ে গ্রেপ্তাররা প্রতাপ দেখিয়ে এলেও এখন তাদের দায়িত্ব নিচ্ছে না সংগঠনটি। খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং জি কে শামীম যুবলীগের কেউ নয় বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের এক কর্মসূচিতে যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যে-ই গ্রেপ্তার হবে তাকেই সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হবে।

একাধিক সূত্র জানায়, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেই রাতে কাকরাইলে নিজের কার্যালয়ে সহস্রাধিক অনুসারীকে নিয়ে অবস্থান নেন ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। তারা গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে সম্রাটের পক্ষে স্লোগানও দেন। কী কারণে সম্রাট সেই রাতে এমন অবস্থান নিয়েছেন, তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা তৈরি হয়েছে। 

তবে গতকাল শনিবার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, দুর্নীতি বা অপকর্মের তথ্যপ্রমাণ পেলে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে যে দলের বা সংস্থার লোক হোক না কেন। কেউ বাদ যাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে জানিয়ে অন্যায় করে কেউই পার পাবে না বলে হুঁশিয়ার দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অবৈধ ব্যবসা, অনৈতিক কাজ, টেন্ডারবাজি যেটাই করুক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা যার বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রমাণ পাব তার বিরুদ্ধেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই এ অভিযান চলছে। যেই হোক জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের লোক, প্রমাণ পেলেই তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান অভিযানটিও মাদকবিরোধী অভিযানের মতো হবে। মাদকবিরোধী অভিযানে চুনোপুঁটিরা ক্রসফায়ারে মৃত্যুবরণ করলেও মূল গডফাদার সাবেক সংসদ সদস্য বদি রয়েছেন বহালতবিয়তে। সে সময় সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তাকে হজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সংসদ নির্বাচনে তার বদলে স্ত্রীকে দেওয়া হয় দলীয় মনোনয়ন।

সূত্র জানায়, ক্যাসিনো নামে রাজধানীতে জমজমাট ১৭টি ক্লাব। এসব জুয়ার আসর থেকে যুবলীগের নামে দৈনিক ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ চাঁদা তোলা হয়। প্রতিটি ক্লাব থেকে দৈনিক চাঁদা নির্ধারণ করা আছে ১০ লাখ টাকা। সে হিসেবে দৈনিক চাঁদার পরিমাণ ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। মাসে চাঁদা ওঠে ৩৬ কোটি টাকা। বছরে এই টাকার পরিমাণ ৪৩২ কোটি, যা অবিশ্বাস্য বটে। তবে বিশাল অঙ্কের এই টাকার ভাগ যায় সরকারি দলের বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতার পকেটে। 

সূত্রমতে, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা রকম অপকর্মের অভিযোগে যুবলীগে চলছে শুদ্ধি অভিযান। এ অভিযানের শুরুটা হয়েছিল ঢাকা মহানগর দক্ষিণকে ঘিরেই। প্রথম দিনের অভিযানে গ্রেপ্তার হন সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। কিন্তু এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন গডফাদারখ্যাত ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। তার বিরুদ্ধে রয়েছে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ। সম্রাটের বাসভবন বা কাকরাইলের সুরক্ষিত অফিসটিতে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযান চালানো হয়নি। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবেন সম্রাট?

অভিযান শুরুর প্রথম দিনে গুঞ্জন ছিল যেকোনো সময় সম্রাট গ্রেপ্তার হতে পারেন। এমন সংবাদের মধ্যেই সম্রাট নেতাকর্মীদের নিয়ে কাকরাইলের অফিসেই অবস্থান করেন রাতভর। এরপর থেকে আর তার অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি। তবে গুঞ্জন রয়েছে, সম্রাটের অপরাধ সাম্রাজ্য থেকে মহানগর যুবলীগে প্রবেশের সহায়তাকারী এক সংসদ সদস্যের আশ্রয়ে আছেন তিনি। অভিযান শুরুর পরের দিনই কাকরাইল থেকে সটকে পড়ে আশ্রয় নেন ওই সংসদ সদস্যের ছায়াতলে।

কাকরাইলের আলোচিত সম্রাটের ৬ তলা ভবনটিতে যাতায়াত ছিল, এমন একাধিক যুবলীগ নেতা জানান, ভবনটির ৬ তলার ছাদের ওপরে স্টিলে স্ট্রাকচার দিয়ে তৈরি করা বিশেষ ফ্লোরটিতে বসত ক্যাসিনো ও জুয়ার আসর। এ আসরে অংশ নিতেন দেশের ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী ও ঠিকাদাররা। ৪ ও ৫ তলায় রয়েছে সম্রাটের বিলাসবহুল অফিস। ৩ তলায় মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের নেতাকর্মীদের বসার স্থান। দ্বিতীয় তলায় গুদাম আর নিচতলায় যুবলীগের লাইব্রেরি। এক বছর আগে এই লাইব্রেরির উদ্বোধন করেছিলেন যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে সখ্য আছে আলোচিত যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীমের (জি কে শামীম)। রাজনীতিবিদদের সখ্যের প্রভাব খাটিয়ে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান জি কে বিল্ডার্সের মাধ্যমে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন। দীর্ঘ সময় ধরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অঘোষিত ‘টেন্ডার কিং’। শুক্রবার বিকালে গুলশান নিকেতনের নিজের কার্যালয় থেকেই আটকের পর শামীমকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে র্যাব। তাতে তার অবৈধ কর্মকাণ্ডের অনেক তথ্য বেরিয়ে আসে। র্যাবের ওই কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, রাজধানীজুড়েই শামীমের টেন্ডার আধিপত্য আছে। তার ভয়ে অধিকাংশ লোকই টেন্ডার জমা দিতেন না। কেউ জমা দিলে তাকে ভয়-ভীতি দেখানো হতো। আবার তার নিজের একাধিক লোকই টেন্ডার জমা দিত। এগুলো ছিল টেন্ডার বাগানোর পরিকল্পনার অংশ। জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ওই র্যাব কর্মকর্তা আরো বলেন, যুবলীগের পরিচয় দিয়ে শামীম টেন্ডারবাজি করতেন। তার অবৈধ টেন্ডারবাজি থেকে আয়ের একটি অংশ তিনি দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ ও মধ্যম সারির কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়মিত মাসোহারা হিসেবে দিতেন। এছাড়া আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অর্থ দিয়ে সেসব অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিতেন। বহু নেতার সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে ভয় দেখাতেন অন্যদের। আর তাকে না জানিয়ে কেউ টেন্ডার জমা দিলে তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হতো। ভয় দেখিয়ে টেন্ডার হাতিয়ে নিতেন শামীম।  এ ছাড়া চাঁদাবাজি থেকে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকাও আয় করতেন। এসব পন্থা অবলম্বন করে শামীম হাজার কোটি টাকার মালিকও হয়েছেন। র্যাব জানায়, শীর্ষ রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও ছিল তার ‘বিশেষ খাতির’। ‘সহযোদ্ধা’ হিসেবে পাশে ছিলেন যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গেও লিয়াজোঁ রক্ষা করে চলতেন তিনি। নিজে যেমন একাধিক বডিগার্ড নিয়ে ঘুরতেন, তেমনি অবৈধ অস্ত্রধারী ক্যাডার বাহিনীও ছিল তার।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads