• বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
ads

অপরাধ

যেভাবে ক্যাসিনো কিং

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৯

রাজধানীতে ক্যাসিনো ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, যিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি। মতিঝিল, ফকিরাপুল, পল্টন, কাকরাইল এলাকায় ক্লাব-হোটেলগুলোয় ক্যাসিনো ব্যবসার মুকুটহীন সম্রাট তিনি। ক্লাবে যাতায়াতকারীদের কাছে যিনি ক্যাসিনো সম্রাট নামেও পরিচিত। জন্ম ১৯৭১ সালে ফেনীর পরশুরামে মির্জানগর ইউনিয়নের পূর্ব সাহেবনগর গ্রামে। বাবা ফয়েজ আহমেদ চৌধুরী ছিলেন রাউজকের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। ফেনীর পরশুরামে জন্ম হলেও ১৪-১৫ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। রাজউকে বাবার চাকরিসূত্রে কাকরাইলের সার্কিট হাউস সড়কের সরকারি কোয়ার্টারে থাকতেন সম্রাট।

১৯৯০ সালে সম্রাট প্রবেশ করেন রাজনীতিতে। তখন ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন তিনি। সে সময় তার চাচাতো ভাই শরীফ সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হলে রাজনীতির মাঠে সম্রাট পরিচিত হতে শুরু করেন। সে সময় সারা দেশে এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলছিল। সম্রাট রাজধানীর রমনা অঞ্চলে আন্দোলনের সংগঠকের দায়িত্বে ছিলেন। তখন নির্যাতনসহ জেলও খাটতে হয় তাকে। এরশাদের পতনের পর ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। সে আমলে সম্রাটের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। 

সম্রাটের উত্থান নিয়ে কথা বলেছেন সাম্প্রতিক সময়ে কোণঠাসা হয়ে থাকা যুবলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা। তিনি জানান, সম্রাটের বেড়ে ওঠা মতিঝিল আর রমনা এলাকায়। তার বাবা ছিলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মচারী। তিন ভাইয়ের মধ্যে সম্রাট দ্বিতীয়। ১৯৯০ সালে সম্রাট প্রবেশ করেন রাজনীতিতে। তখন ছাত্রলীগের একজন নেতা ছিলেন। সে সময় তার চাচাতো ভাই শরীফ সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হলে রাজনীতির মাঠে সম্রাট পরিচিত হতে শুরু করেন। সে সময় সারা দেশে এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলছিল। সম্রাট রাজধানীর রমনা অঞ্চলে আন্দোলনের সংগঠকের দায়িত্বে ছিলেন। তখন নির্যাতনসহ জেলও খাটতে হয় তাকে। এরশাদের পতনের পর ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। সে আমলে সম্রাটের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়।

 ১৯৯৩ সালে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পান সম্রাট। সে সময় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন। ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েই বেপরোয়া হয়ে উঠতে থাকেন সম্রাট। নিজের ওয়ার্ড সভাপতি লুৎফুর রহমানকে প্রহারের অভিযোগও উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। কিন্তু ওই ঘটনায় সম্রাটসহ তিনজনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হলেও পরে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। তবে তারপর থেকে মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় সম্রাটের আনাগোনা বেড়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবলীগ নেতা বলেন, ২০০৩ সালে যুবলীগের কাউন্সিলে জাহাঙ্গীর কবীর নানক ও মির্জা আজম দায়িত্ব পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সম্রাটের আসা-যাওয়া বেড়ে যায়। তখনই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পান মহিউদ্দিন মহি এবং সাধারণ সম্পাদক হন নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন। সে সময় মহির সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে শাওন নিজের হাত শক্ত করতে সম্রাটকে দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক করেন। শাওনের বিশ্বস্ত হিসেবেই সম্রাট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করতেন। ২০১২ সালে ওমর ফারুক চৌধুরী যুবলীগের চেয়ারম্যান হওয়ার পর সম্রাট ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি হন। যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি পদ পেয়ে সম্রাট বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। আওয়ামী লীগের বড় সব অনুষ্ঠানে পরিচিত মুখ হিসেবে উপস্থিত থাকতেন সম্রাট। যুবলীগ কর্মীদের নিয়ে শোডাউন দিতেন দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। সম্রাটের নেতৃত্বাধীন ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগকে সেরা সংগঠন ও সম্রাটকে সেরা সংগঠক হিসেবে ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। সরকারি সংস্থার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় চালু করেন ক্যাসিনো ব্যবসা।

সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর আরমানকে সহসভাপতি করে নেন তিনি। আরমান অতীতে কখনোই আওয়ামী লীগ বা এর কোনো সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।     

সম্রাটের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা আরমানও দীর্ঘদিন ধরে ক্যাসিনো কারবারে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি তিনি ঢাকাই সিনেমাতেও টাকা খাটাচ্ছিলেন।

আরমানের প্রোডাকশন হাউজ ‘দেশ বাংলা মাল্টিমিডিয়া’র ব্যানারে প্রথম সিনেমাটি মুক্তি পায় গত কোরবানির ঈদে। ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ নামের ওই সিনেমায় অভিনয় করেছেন শাকিব খান ও বুবলী। সম্রাট এবং আরমান নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে উভয়কে ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

যুবলীগের একাধিক নেতা বলেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের অন্তর্গত মৎস্য ভবন, বিদ্যুৎ বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সকল সরকারি দপ্তরের দরপত্রও সম্রাটের নিয়ন্ত্রণে ছিলে। আর সম্রাটের পক্ষে এসব বিষয় দেখভাল করতেন আরমান।

ঢাকার দুটি বাসায় সম্রাটের দুই স্ত্রী তাদের সন্তানদের নিয়ে থাকেন বলে র্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে আরমানের পরিবার সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য কেউ দিতে পারেননি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, প্রতি রাতে ১৫টি ক্যাসিনো থেকে ৪০ লাখ টাকা চাঁদা পেতেন সম্রাট। প্রতি মাসে মাসে অন্তত ১০ দিন সিঙ্গাপুরে থাকতেন তিনি। সিঙ্গাপুরে গেলে বিমানবন্দর থেকে তাকে বিলাসবহুল লিমুজিন গাড়িতে করে ওই ক্যাসিনোতে নেওয়া হতো।

রাষ্ট্র বা জনগণের স্বীকৃতি ছাড়াও নিজ প্রভাবে কেউ কেউ সম্রাটদের মতোই ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন। অর্থের প্রাচুর্য, অফুরন্ত ক্ষমতা, ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাফিয়া চক্রের গডফাদাররা গড়ে তোলেন নিজস্ব এমন সাম্রাজ্য। তেমনই একজন সম্রাট ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট। তার নামটি যেমন সম্রাট, দাপটও ছিল সম্রাটদের মতোই। তিনি সড়কে নামলে সামনে থেকে সরে যেত সবকিছু। হুইসেল বাজিয়ে যেতেন গন্তব্যে। মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরাও অতটা দাপদ দেখাতে পারেন না।

ক্যাসিনো সম্রাটকে ঘিরে থাকত অস্ত্রধারী নিরাপত্তা বাহিনী। আশপাশে তার প্রজার অভাব ছিল না। অপকর্মের এই গডফাদারের অনুসারীরা ঢাকা কাঁপিয়ে বেড়াত। এই সম্রাটের নির্দেশেই গত ১০ বছর ধরে তার রাজ্যে চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বাড়ি ও জমি দখল সবই হয়েছে।

সম্রাটের ‘গুণের মুগ্ধতা’ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছে গেছে। সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনোতে সম্রাট ভিআইপি জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত। সিঙ্গাপুরের চেঙ্গি এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করার বিশেষ ব্যবস্থাও আছে।

সম্রাটের এই রাজত্ব চলত রাজধানীর কাকরাইল থেকে। কাকরাইলের রাজমণি সিনেমা হলের উল্টোপাশে তার কার্যালয় রাজপ্রাসাদের চেয়ে কম কিছু নয়। এই প্রাসাদে গভীর রাত পর্যন্ত চলত ভিআইপি জুয়া। বাইরে অপেক্ষায় থাকত দামি ব্র্যান্ডের বহু গাড়ি। সম্রাটের এই কার্যালয়ের ভেতরে ঠিক কী আছে তা এখনো জানা যায়নি। তবে এখানে খেলতে এসে জিতে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। কেউ জিতলেও তার টাকা জোরপূর্বক রেখে দেওয়া হতো। জুয়ার এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘চুঙ্গি ফিট’। অনেকে ‘অল ইন’ বলে থাকে। যারা এখানে যেতেন তারা এই পদ্ধতির ফলে সর্বস্বান্ত হয়ে ফিরতেন। তবে সবকিছু পাল্টে যায় ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে র‍্যাবের অভিযানের পর। ক্যাসিনোর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় আটক করা হয় সম্রাটের সহযোগী কয়েকজনকে। তারপর থেকে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান এ ক্যাসিনো সম্রাট। গতকাল রোববার তাকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads