• বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
ads
মুখোমুখি হচ্ছেন সম্রাট খালেদ ও শামীম

ছবি : সংগৃহীত

অপরাধ

মুখোমুখি হচ্ছেন সম্রাট খালেদ ও শামীম

  • এমদাদুল হক খান
  • প্রকাশিত ০৯ অক্টোবর ২০১৯

ক্যাসিনো-কাণ্ডে জড়িত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, জি কে শামীম ও খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ক্যাসিনো ব্যবসা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা বিষয়ে তাদের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন র্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। 

দখল, উৎখাত আর জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে রাজধানীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন যুবলীগের আলোচিত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। এক্ষেত্রে তার প্রধান সহচর ছিলেন খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এছাড়া সম্রাটের আরেক সহযোগী আরমান নানা অপকর্মে হাত পাকিয়ে চলচ্চিত্র প্রযোজনায় নেমে এ অঙ্গনকে কলুষিত করেছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সম্রাটের বিরুদ্ধে রমনা থানায় দায়ের করা অস্ত্র আইনের মামলায় র্যাব অভিযোগ করেছে, চাঁদাবাজির জন্য একটি বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন সম্রাট। কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে প্রথমে তাকে লাঠিপেটা করা হতো। এতেও কাজ না হলে দেওয়া হতো বৈদ্যুতিক শক। এজন্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও ছিল তাদের। এর বাইরেও ১০টি ক্যাসিনো ছিল তার। কাকরাইলের ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে ছিল সম্রাটের টর্চারসেল।

এদিকে র্যাব বলছে, সব অভিযোগের ব্যাপারেই তদন্ত চলছে। প্রয়োজনে খালেদ, শামীম এবং সম্রাটকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, জি কে শামীমকে আমরা নয় দিনের রিমান্ডে পেয়েছি। খালেদকেও রিমান্ডে আনা হয়েছে। প্রত্যেকটা রিমান্ডের একটা সময় থাকে, তারপর আমরা চেষ্টা করব এবং সুযোগ থাকে অবশ্যই একসঙ্গে করে জিজ্ঞাসাবাদ করব তাদের। সম্রাট, আরমানকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে একটি অধ্যায় শেষ হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ অভিযান চলমান থাকবে।

এদিকে কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ায় সম্রাটকে চিকিৎসার জন্য গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে।

কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলাম জানান, গতকাল মঙ্গলবার ভোরে কারাগারের সূর্যমুখী সেলে থাকা অবস্থায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে ছয় মাসের কারাদণ্ড পাওয়া যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল চৌধুরী ওরফে সম্রাটের প্রেসার খুব লো হয়ে পড়ে। ওই সেলে থাকা অবস্থায় সম্রাটের বুকে ব্যথা শুরু হয়। এমনিতেই তার আগে থেকেই শারীরিক অবস্থা খারাপ ছিল। তখন আমাদের কারা চিকিৎসকরা দ্রুত তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। চিকিৎসা নেওয়ার সময় সম্রাটের প্রেসার খুবই লো দেখাচ্ছিল। পরে দ্রুত কারাগারের মাইক্রোবাসযোগে কারারক্ষীদের প্রহরায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে হাসপাতালে নিয়ম অনুযায়ী জরুরি বিভাগ থেকে তার নাম দিয়ে একটি টিকিট কাটা হয়। পরে জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে, তিনি দ্রুত নতুন ভবনের তিনতলায় কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) রেফার করেন। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রোগীর সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাদের নির্দেশক্রমে জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসক তার অবস্থা দেখে দ্রুত ভর্তি নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন।

তিনি আরো জানান, গত রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কারাগারে সম্রাটকে রিসিভ করা হয়। তিনি আমদানিতে সারারাত ছিলেন। পরদিন সকালে তাকে সূর্যমুখী সেলে নেওয়া হয় ও কারাবিধি নিয়ম অনুযায়ী কারাগারে প্রবেশের পরপরই তার দেহ তল্লাশি করা হয়। জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. আফজালুর রহমান জানান, সম্রাটের বুকের একটি ভাল্ভ আগে থেকে রিপ্লেসমেন্ট ছিল। সে কারণে তিনি কারাগারে ভেতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমরা তার বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করাচ্ছি। তবে তিনি এখন ভালো আছেন।

ডা. আফজালুর রহমান জানান, আজ সকাল থেকে (মঙ্গলবার) সম্রাটের যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে সেগুলো পজেটিভ। তবে তিনি যেহেতু হূদরোগে আক্রান্ত তাই আমরা এ ধরনের রোগীদের ২৪ ঘণ্টা ফলোআপে রাখি। সে হিসেবে বুধবার (আজ) সকালে তার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখনো তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। শঙ্কার কোনো কারণ নেই।

তিনি আরো বলেন, তার চিকিৎসায় ইতোমধ্যে আমরা সাত সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছি। মেডিকেল বোর্ডের প্রধান হিসেবে আমি থাকছি। মেডিকেল বোর্ডের বাকি সদস্যরা হলেন প্রফেসর মীর জামাল উদ্দিন, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর মহসিন আহমেদ, প্রফেসর নাসির উদ্দিন, প্রফেসর কাজী আবুল আজাদ, প্রফেসর আশরাফুল হক সিয়াম ও সার্জারি ডিপার্টমেন্টের প্রধান রামপদ সরকার।

এর আগে চিকিৎসক আফজালুর রহমান জানিয়েছিলেন, সম্রাটের চিকিৎসার জন্য তাকে প্রধান করে অস্থায়ী ভিত্তিতে তিন সদস্যের একটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমের পর্যবেক্ষণে সম্রাটের চিকিৎসা চলছে। ওই মেডিকেল টিমে আরো রয়েছেন ডা. আশরাফুল হক সিয়াম এবং ডা. আর এম খান।

গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বর্তমানে সম্রাট হূদরোগ ইনস্টিটিউটের সিসিইউ-১ বিভাগের বেড নম্বর-৩-এ ভর্তি আছেন। তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা মেডিক্যালে নেয়া হলে পরিস্থিতি বিবেচনায় সেখান থেকে জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। গতকাল সকালে অবস্থার অবনতি হলে সম্রাটকে সিসিইউতে নেওয়া হয়।

এদিকে সদ্য বহিষ্কৃত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে রমনা থানায় দায়ের করা অস্ত্র ও মাদক আইনে দায়ের করা পৃথক দুই মামলায় ১০ দিন করে ২০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছে পুলিশ। আজ বুধবার সম্রাটের উপস্থিতিতে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনসহ রিমান্ডের শুনানি হবে। গত সোমবার রাতে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রমনা থানা পুলিশ সম্রাটের বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করেন।

আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) নিজাম উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত সোমবার রাতে রমনা থানার তদন্ত কর্মকর্তা এ আবেদন করলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইয়াসমিন আরা আজ বুধবার রিমান্ড শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ করেছেন।

জিআরও আরো জানান, এছাড়া একই দিন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানের বিরুদ্ধে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। আদালত তারও রিমান্ড এবং গ্রেপ্তার শুনানি একই দিনে ধার্য করেছেন।

নথি থেকে জানা যায়, গত সোমবার বিকাল ৪টায় র্যাব-১-এর ডিএডি আবদুল খালেক বাদী হয়ে রমনা মডেল থানায় মামলা দুটি করেন। এর মধ্যে মাদক মামলায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকেও আসামি করা হয়েছে।

গত রোববার ভোর পাঁচটার দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জশ্রীপুর গ্রামের মুনীর হোসেন চৌধুরীর বাসা থেকে সম্রাট ও তার সহযোগী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকে আটক করে র্যাব। পরে তাদের ঢাকায় এনে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে র‍্যাব। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে নিয়ে অভিযানে বের হয় র‍্যাব।

সুনসান নীরবতা ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে : প্রতিদিন দুপুর হলেই নেতা-কর্মীদের ভিড়ে জমজমাট থাকত কাকরাইলের ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টার। নেতা-কর্মীদের ভিড়ে ভবনটির সামনের সড়কে প্রায় প্রতিদিনই যানজটের সৃষ্টি হতো। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পরও এই চিত্রের খুব একটা হেরফের হয়নি। তবে গত রোববার ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট গ্রেপ্তার হওয়ার পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সম্রাটের দখল করা ভবন ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারের সামনে গতকাল মঙ্গলবার কোনো ভিড় ছিল না।

বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক এক নেতা ভবনের সামনে আসেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত একটা কাজে এই পথ হয়ে যাচ্ছিলেন। চা-বিস্কুট খেতে এখানে দাঁড়িয়েছেন।

ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারের পাশে ৪০ বছর ধরে একটি খাবারের দোকান চালান মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, এখন যা অবস্থা, তাতে মনে হয় না কেউ আর এখানে আড্ডা দিতে আসবে।

ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে বসেই রাজধানীর অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন সম্রাট। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত এই ভবনে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা আসতেন। গত রোববার ভোরে সম্রাটকে আটকের পর তাকে নিয়েই ভবনটিতে অভিযান চালিয়েছিল র‍্যাব। অভিযানের পর ভবনটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।

কাকরাইলে সম্রাটের কার্যালয়টি রমনা থানা থেকে ২০০ গজের ভেতরে। এত দিন নানা অপরাধ হলেও পুলিশ কেন ব্যবস্থা নেয়নি? রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী মাইনুল ইসলামের কাছে এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমরা আগে এসব জানতাম না। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সম্রাটের এসব অপকর্মে পুলিশ সব সময় বিশেষ সুবিধা দিয়ে এসেছে। ক্ষমতাসীন দলের পদে থাকায় সম্রাট ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ তাকে ও তার অনুগত বাহিনীকে সহায়তা দিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ক্যাসিনো থেকে অনেক পুলিশ সদস্য নিয়মিত টাকা পেতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মহানগর পুলিশের একটি দল এ অভিযোগ খতিয়ে দেখছে।

কয়েক দিন আগেও রাজধানীর মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ছিল খালেদ ভূঁইয়া ও সম্রাট। এ ব্যাপারে সবাই নিশ্চুপ থাকলেও তাদের গ্রেপ্তারের পর মুখ খুলতে শুরু করেছেন তারা। চাঁদাবাজি নির্যাতন ছিল নিয়মিত ঘটনা। চাইলেই দখল করে নিতেন কারো দোকান কিংবা বাড়ি। এখন গ্রেপ্তারের পর এ রকম দুটি দখল করা দোকান ছেড়ে পালিয়েছেন তার লোকজন। 

বরকতুল্লাহ মাহমুদ পৈত্রিক জায়গায় ছয়তলা ভবন করেন কয়েক বছর আগে। গত বছর জোর করে সম্রাটের ইশারায় সেখানকার একটি ফ্ল্যাট দখল করে নেন খালেদ। এ নিয়ে নানা জায়গায় দেনদরবার করেও শেষ রক্ষা হয়নি বরকতুল্লাহর।

তিনি বলেন, খালেদের হুমকিতে আমার বড় ভাই গত বছর মারা যান। তারা একই সঙ্গে একই দলের মানুষ, একজন সভাপতি একজন সাংগঠনিক সম্পাদক, তারা একসঙ্গে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। 

এদিকে, লাগেজ পার্টির ব্যবসা থেকে সম্রাটের আশ্রয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হন আরমান। ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ায় বিশ্বস্ত আরমানকে সহ-সভাপতি করেন সম্রাট। একপর্যায়ে দেশ মাল্টিমিডিয়া নামে একটি প্রযোজনা সংস্থা বানিয়ে নাম লেখান চলচ্চিত্র প্রযোজনায়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads