• বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬
ads

অপরাধ

সাবেক প্রতিমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে উত্থান রাজীবের

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৩ অক্টোবর ২০১৯

সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর প্রশ্রয়েই যুবলীগ নেতা ও কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব টং দোকানি থেকে মোহাম্মদপুরের ত্রাসের সম্রাটে পরিণত হন। সূত্র বলছে, রাজীবকে সব ধরনের কর্মকাণ্ডে মদত ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও প্রভাবশালী এই আওয়ামী লীগ নেতা। তার প্রত্যক্ষ মদতে মোহাম্মদপুরে দীর্ঘদিন ত্রাসের রাজত্ব চালিয়েছেন রাজীব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য জানিয়েছেন বলে দাবি জিজ্ঞাবাসাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। কাউন্সিলর হওয়ার আগে ও পরে মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম করে বেড়াতেন রাজীব। এসব করেই অল্প দিনে শত কোটি টাকার মালিক বনে যান তিনি। ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ এত দিন মুখ খোলার সাহস পাননি। সম্প্রতি র্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর তার সম্পর্কে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। তার অপরাধ জগৎ নিয়ে উঠে আসছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। এত দিন ভয়ে যারা টুঁ শব্দটি করার সাহস করেনি তারা রাজীবের গ্রেপ্তারের পর নির্ভয়ে কথা বলছেন। গত শনিবার কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবকে গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে রাজধানীর ভাটারা থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি মামলা করে র্যাব। সেই দুই মামলায় ১৪ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে তাকে। বর্তমানে ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশ তাকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব কয়েকটি জমি দখলের কথা স্বীকার করেছেন। রাজীব জানিয়েছেন, মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নম্বর রোডের ৩৩ নম্বর প্লটে ৫ কাঠা জমির ওপর ডুপ্লেক্স বাড়ির জমিটি তার দখল করা। দুই বছর আগে ‘অল্প টাকায়’ জোরপূর্বক মালিকের কাছ থেকে তিনি জমিটি দলিল করে নেন। ওই ব্যক্তি স্থানীয় কয়েকজনের কাছে সহায়তা চান। এ নিয়ে ওই গ্রুপের সঙ্গে বিরোধ শুরুর পর তিনি জমিটি দখল করে ডুপ্লেক্স বাড়ি তৈরি করেন।

স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি মোহাম্মদপুরে রাজীবের প্রতিপক্ষ একটি গ্রুপ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তারা এলাকার এক ব্যক্তির বাড়ি দখলের চেষ্টা করেন। বাড়ির মালিক তখন কাউন্সিলর রাজীবের সহায়তা চান। পরে রাজীব সেখানে অফিস তৈরি করায় ওই গ্রুপ বাড়িটি দখল করতে পারেনি। এ নিয়ে ওই গ্রুপের সঙ্গে রাজীবের বিরোধ তৈরি হয়।

এলাকাবাসী জানান, ফুটপাতের সামান্য টং দোকানদার ছিলেন রাজীব। সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের হাত ধরে মোহাম্মদপুরে যুবলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফাহিমকে পিটিয়ে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই তিনি যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। এ জন্য যুবলীগের কেন্দ্রীয় এক নেতাকে এক কোটি ২০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা রাজীবকে পদ দিতে যুবলীগ চেয়ারম্যানকে একটি ডিও লেটারও দেন। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর আশীর্বাদে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এর পর থেকেই মূলত তার ভাগ্য খুলে যায়।

যুবলীগের সাইনবোর্ড আর কাউন্সিলরের পদ ব্যবহার করে এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলেন তিনি। তার বাহিনীর সদস্যরাই এলাকায় কিশোর গ্যাং, মাদক ও ডিস ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। মোহাম্মদপুরে যুবলীগকর্মী তসির উদ্দিন হত্যা মামলার আসামিরাও তারই ঘনিষ্ঠ।

স্থানীয় ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন বলেন, কাউন্সিলর হওয়ার পর এমন কোনো অপকর্ম নেই যা রাজীব করেনি। তার হয়ে যারা চাঁদা আদায় করে তাদের মধ্যে আছে— অভি ফারুক, শাহ আলম, সিএনজি কামাল, ইসরাফিল লাবু প্রমুখ। তারা ফুটপাত থেকেই প্রতিদিন ৪০-৫০ হাজার টাকা আদায় করে বলে জামাল উদ্দিন জানান।

ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, অস্ত্র ও মাদক মামলায় ৭ দিন করে ১৪ দিনের রিমান্ড নিয়ে রাজীবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব নিজেই তার অবৈধ লেনদেন, দখলদারিত্ব এবং অপরাধ জগতের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য দিয়েছেন। সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের নাম ভাঙিয়ে এসব অপকর্ম করতেন তিনি। গ্রেপ্তার হওয়া অপর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানের সহযোগী ছিলেন রাজীব। মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদে রাজীবের নাম বেরিয়ে আসে। আরো একজন কাউন্সিলর নজরদারিতে রয়েছে বলে জানায় ডিবি সূত্র।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ বেশকিছু নেতাকর্মী ও এলাকাবাসী জানান, রাজীবের গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহন উপজেলায়। দেশ স্বাধীনের পরপরই রাজীবের বাবা তোতা মিয়া হাওলাদার ও চাচা ইয়াছিন হাওলাদার ঢাকায় চলে আসেন। প্রথমদিকে তারা মোহাম্মদপুর এলাকায় রিকশা চালাতেন। এরপর রড মিস্ত্রির কাজ করতেন। এখন তারা সবাই কোটিপতি। রাজীবের মোহাম্মদপুরসহ আশপাশের এলাকায় ২০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমি রয়েছে। জমি ও ফ্ল্যাট দখলই ছিল তার নেশা। চড়তেন কোটি টাকার গাড়িতে। সামনে-পেছনে থাকত গাড়িবহর। তার চাচা ইয়াছিনেরও রয়েছে ১০-১৫টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট। চাচা-ভাতিজার দখল বাণিজ্যে নিঃস্ব হয়েছে অনেকে। তাদের ভয়ে তটস্থ এলাকাবাসী। রাজীবের সহযোগীদের ভয়ে অনেকে এলাকা ছেড়েছেন। কাউন্সিলর মিজান, রাজীব ও তুহিন একই সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করত।

রাজীবের এক আত্মীয় বলেন, তার হঠাৎ করে উত্থান অবিশ্বাস্য। কাউন্সিলর হওয়ার পর বাসায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। সে তার অতীত ভুলে গেছে।

স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, রাজীবকে আগে কেউ চিনত না। ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের সময় তাকে মোহাম্মদপুর এলাকার সাবেক এক এমপির বাসায় কাজ করতে দেখা যেত। সেখান থেকেই তার উত্থান। গত ৬ মাস আগে যুবলীগ চেয়ারম্যানকে এক কোটি টাকার বিনিময়ে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন ফুটপাত, বেড়িবাঁধ, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ড, চন্দ্রিমা হাউজিং, সাতমসজিদ হাউজিং, ঢাকা উদ্যানসহ বিভিন্ন এলাকায় দখলবাজি ও চাঁদাবাজিই তার অবৈধ সম্পদের মূল উৎসব। তার বিরুদ্ধে প্রবাসীদের বাসাসহ এলাকার অনেকের জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে। মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নম্বর রোডে তার যে বিলাসবহুল বাড়ি আছে তার বেশিরভাগ জায়গা সরকারি। পানির পাম্পের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গা দখল করে তিনি বাড়ি বানান। চাঁন মিয়া হাউজিংয়ের যেখানে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিস সে জায়গাটির মালিকানা জেলা প্রশাসনের। রাজীব তার বাবা এবং স্ত্রীর নামে অনেক সম্পদ করেছেন বলে অভিযানে থাকা একজন র্যাব সদস্য জানান।

র্যাব সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, মোহাম্মদপুরের ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক লোকমান ভূঁইয়া ও সেলিম প্রধান রিমান্ডে তারেকুজ্জামান রাজীবের নাম বলেছেন। সেই সূত্র ধরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব তার অবৈধ সম্পদের কিছু তথ্য র্যাবের কাছে জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে রাজীবের বড় ভাই আখতারুজ্জামান রাসেল বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। অল্প বয়স থেকে রাজীব রাজনীতিতে জড়িত। এলাকার মানুষ জানে সে কত জনপ্রিয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সে নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। এখন তাকে মিথ্যাভাবে ফাঁসানো হচ্ছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads