• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৬
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা, আশ্রিতরা বেপরোয়া

প্রতীকী ছবি

অপরাধ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা, আশ্রিতরা বেপরোয়া

  • মাহাবুবুর রহমান, কক্সবাজার
  • প্রকাশিত ১৭ অক্টোবর ২০২০

মিয়ানমারে বসবাসকালীন রোহিঙ্গারা ছিল রাখাইনদের পরাধীন জাতিগোষ্ঠী। তাদের কথায় আজীবন উঠবস করেছে রোহিঙ্গারা। সেখানে নেতৃত্ব বা স্বাধীনতার স্বাদ পেতে দেয়া হয়নি কখনও। সামরিক জান্তা ও রাখাইনদের অত্যাচারে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে এখানে নেতৃত্ব ও স্বাধীনতা পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে আশ্রিত রোহিঙ্গারা।

সচেতন মহল জানান, নেতৃত্ব পেয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে নগদ টাকার লোভ চলে এসেছে। সে জন্য ভাগবাটোয়ারার জন্য সংঘর্ষ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ক্যাম্প অভ্যন্তরে মাদক ব্যবসা, দোকান ভাড়া তথা চাঁদা আদায়, ত্রাণের পণ্য বিক্রি থেকে শুরু করে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বারবার অশান্ত হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা শিবির। এনজিওতে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের চাকরি ও ক্যাম্প এলাকায় দোকানপাট করতে দেয়াটা মারাত্মক ভুল হচ্ছে বলে দাবি করেছেন সচেতন মহল। তারা বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রিত উদ্বাস্তু হিসেবে জীবনযাপন করতে দেয়া উচিৎ। তারা নগদ টাকা কামাই করতে পেরে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

এদিকে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের দুই নেতাকে অপহরণ করা হয়েছে দাবি উভয় পক্ষের ক্যাডারদের। ইয়াবার বড় চালান ছিনতাই ও আত্মসাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের ক্যাডারদের মুখোমুখি সংঘর্ষ বাঁধছে প্রতিনিয়ত। সম্প্রতি ইয়াবা ডন চার রোহিঙ্গার দেড় লক্ষ পিস ইয়াবার চালান খোয়া যায় ক্যাম্পে। এ ঘটনায় রোহিঙ্গা বিদ্রোহী নেতা ও শালবন আনসার ক্যাম্পের অস্ত্র লুট মামলার আসামি আবুল কালামকে দায়ী করে অপহরণ করে সন্ত্রাসী মুন্না গ্রুপের ক্যাডাররা। খবর পেয়ে মাস্টার আবুল কালাম ও মৌলবি আনাস বাহিনীর ক্যাডাররা মুন্নার দুই ভাইকে হত্যা ও মাস্টার মুন্নাকে অপরহল করে নিয়ে যায়। মাস্টার আবুল কালাম ২৬ আগস্ট থেকে নিখোঁজ হলে সর্বশেষ ৭ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী মাস্টার মুন্নার দুই ভাই মাহমুদুল হক ও ফরিদকে আনাস বাহিনীর ক্যাডার ও উত্তেজিত রোহিঙ্গারা কুপিয়ে হত্যা করেছে। একই দিনে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে টেকনাফের পশ্চিম হ্নীলার নুর হোসেনের পুত্র মাইক্রো চালক নুরুল হুদাকে। ২৬ আগস্ট কুতুপালং আমতলী এলাকা দিয়ে বড় ধরনের ইয়াবার চালান নিয়ে আসছিল রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মুন্না গ্রুপ। সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে চলাফেরা করতো মুন্না। ইয়াবা ডন মুন্না কুতুপালং আনরেজিষ্ট্রার্ড এলাকায় মারকাজ পাহাড়ে অবস্থান করলেও বর্তমানে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ক্যাম্প অভ্যন্তরে গড়ে উঠা দোকান থেকে মাসোয়ারা, ইয়াবা-স্বর্ণের চালান নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্রের মহড়া ও আধিপত্য বিস্তার যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের। গুটি কয়েক চাঁদাবাজ রোহিঙ্গা নেতার কারণে ৩৪টি ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারা জিম্মি হয়ে পড়েছে। এসব রোহিঙ্গাদের তালিকা করে আইনের আওতায় আনা না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

সূত্র জানায়, রোহিঙ্গারাই এখন ইয়াবা কারবারের প্রধান চালিকা শক্তি। তাই যত দ্রুত সম্ভব তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো অথবা বিকল্প কোন ব্যবস্থা করতে হবে। না হয় স্থানীয়দের জন্য মহা বিপদ অপেক্ষা করছে বলে বিশ্লেষকগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। প্রতিমাসে বিপুল সংখ্যক নগদ টাকার লোভে রোহিঙ্গারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা নেতাকে ক্যাম্প পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান, মাঝি-হেডমাঝি বানিয়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ছোটখাট বিচার করার ক্ষমতা দেয়ায় এটি কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের আচরণ এবং মারমুখি মনোভাবের ফলে নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে স্থানীয়রা।

রোহিঙ্গাদের টাকা আদায়ের খাত : মাদক ব্যবসা, স্বর্ণের চালান পার করিয়ে আনা, ত্রাণের মালামাল বিক্রি, দোকান পাট থেকে ভাড়া আদায়, এনজিওদের কাছে রোহিঙ্গা নারীপুরুষের চাকরি নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারী কাজে লেবারদের মাঝি হওয়া, শেডে-ব্লকে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ঝামেলা বা বনিবনা না হলে বিচারের রায় দেয়াসহ অনেক খাত থেকে টাকা আয় করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। কুতুপালং ক্যাম্প নেতা হাফেজ জালাল আহমদ বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু খারাপ রোহিঙ্গা আছে। তারা ক্যাম্পে শান্তি ভঙ্গ করছে।

অস্ত্র উদ্ধারের দাবী : কক্সবাজার শহরে বসবাসকারী সৈয়দ আলম নামে এক ব্যক্তি বলেন, মামলা সংক্রান্ত উচ্চ আদালতে ঢাকায় গেলে হোটেলে বা বিভিন্ন স্থানে নিজ বাড়ী উখিয়া বলে পরিচয় দিতে লজ্জা হয়। রোহিঙ্গা ও মাদক কারবারিদের কারণে মাদক বিরোধী লোকজনকেও সন্দেহের চোখে দেখে অনেকে। রোহিঙ্গাদের বেপরোয়া আচরণ নিয়ে স্থানীয়রা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের মানবতা না দেখিয়ে অভিযান পরিচালনা করে আগ্নেয়াত্রগুলো উদ্ধারের দাবী জানান স্থানীয়রা। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের এনজিও’র চাকরি থেকে ছাটাই করা জরুরী। ক্যাম্পে মাঝি প্রথা বাতিল করে সবাইকে আশ্রিত হিসেবে নির্দেশনা দেয়া দরকার।

জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সভাপতি প্রফেসর এমএ বারী জানান, রোহিঙ্গাদের বেপরোয়া সাহস এবং তাদের হাতে প্রকাশ্য অস্ত্র দেখে আমি শঙ্কিত। এই অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের কক্সবাজার ছেড়ে পালানো ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। তাই সকল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান তিনি।

ডিআইজির নির্দেশ পালন হচ্ছেনা : সম্প্রতি কুতুপালং ক্যাম্প পরিদর্শনকালে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার নামে কোন প্রকার নৈরাজ্য করা চলবে না। এখানে আধিপত্য থাকবে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যা যা পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তাই নেয়া হবে। ক্যাম্পে লুকিয়ে রাখা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হবে। কোন অপরাধীকে ছাড় দেয়া হবে না। তবে এ পর্যন্তও সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের অস্ত্রগুলো উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads