• বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

অপরাধ

নীরব চাঁদাবাজির জালে দেশ

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ১৭ জানুয়ারি ২০২১

পলাতক বা কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙিয়ে সারা দেশে চাঁদাবাজির জাল বিছিয়েছে কয়েকটি চক্র। তারা বড় ব্যবসায়ীসহ উচ্চপদস্থ চাকরিজীবীদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তিন ধাপে নীরব চাঁদাবাজি করছে। এসব চক্রের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে চাঁদাও দিচ্ছেন। সম্প্রতি কক্সবাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের নামে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এক চক্র। চাঁদা না দিলে হত্যার হুমকিও দেয়। এই ব্যবসায়ী তাদের টাকাও দেন। পরবর্তী সময়ে আরো টাকা দাবি করলে তিনি পুলিশের কাছে গেলে এ চক্রের ৬ জনকে আটক করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য জানিয়ে মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, এ ধরনের কয়েকটি চক্র তৎপর রয়েছে। যারা পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজি করছে। কথিত ফাইভ স্টার, সেভেন স্টার গ্রুপের নাম করে এরা চাঁদাবাজি করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান, ইমন, মামুন, শাহাদাৎ, কারাগারে থাকা কাইল্যা পলাশসহ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম করে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির জাল বিছিয়েছে বিভিন্ন চক্র, বিশেষ করে তারা ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে। চক্রটি বিভিন্ন উপায়ে ব্যবসায়ীদের মোবাইল কিংবা টেলিফোন নম্বর সংগ্রহ করে থাকে। এরপর তিনটি ধাপে তার কাছে চাঁদা দাবি করে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, প্রথমে টার্গেট ব্যবসায়ীকে ফোন করা হয়। এরপর বড় ভাই সম্বোধন করে একজনের সঙ্গে কথা বলতে দেয়। তৃতীয় ধাপে টাকা নেয়। অনেক ব্যবসায়ী হুমকির কারণে প্রাণভয়ে টাকাও দেয়। সন্ত্রাসী জিসানের নামেই একাধিক গ্রুপ রয়েছে বলেও জানান কর্মকর্তারা। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, কেউ এ ধরনের হুমকি দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে। তাহলে এ চক্রগুলো চাঁদাবাজির সাহস পাবে না, পাশাপাশি আইনের আওতায় আনা যাবে। সম্প্রতি কক্সবাজারের এক ব্যবসায়ীর ঢাকাসহ খুলনা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন স্থানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার কাছে চাঁদা চাওয়ার ঘটনায় একটি চক্রের অন্যতম ও গ্রুপ প্রধানসহ ৬ জনকে আটক করা হয়।

গতকাল শনিবার তাদের গ্রেপ্তারের কথা জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারের সদস্য অতিরিক্ত ডিআইজি ওয়ালিদ হোসেন।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো-চক্রের প্রধান বেল্লাল খান, রাকিব খান টিটুল, মো. আবদুল হান্নান, মো. দেলোয়ার হোসেন, মো. সোহাগ এবং খোরশেদ আলম। এ সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, সিমকার্ড ও নথিপত্র উদ্ধার করা হয়। গত ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, তুরাগ ও পল্টন এলাকা থেকে ওই ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের একটি দল।

সংবাদ সম্মেলনে ওয়ালিদ হোসেন বলেন, বেশ কিছুদিন আগে কক্সবাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছে মোবাইল ফোনে টাকা চাওয়া হয়। টাকা না দিলে তাকে ও তার ছেলেকে হত্যা-গুম করবে বলে হুমকি দেয়। ওই ব্যবসায়ী ভয় পেয়ে প্রতি মাসে তাদের পাঁচ হাজার টাকা করে দিতে থাকেন। এভাবে তাদের ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। এরপর ওই চক্রটি তার কাছে আরো বড় অঙ্কের টাকা দাবি করলে তিনি ডিএমপির গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগে অভিযোগ করেন।

তার অভিযোগ পেয়ে গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের এডিসি মনিরের নেতৃত্বে তদন্ত শুরু হয়। এরা ৮ থেকে ১০ জনের একটি চক্র। এই চক্রটির গ্রুপের সদস্যরা প্রথমে ঢাকার নীলক্ষেতের পুরাতন বইয়ের দোকান, বিভিন্ন বই ব্যবসায়ী, বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতির বার্ষিক সদস্যদের (ঠিকানা ও মোবাইল নম্বরের তালিকা) টেলিফোন গাইড সংগ্রহ করে দ্বিতীয় গ্রুপকে দেয়। দ্বিতীয় গ্রুপ ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী সেভেন স্টার গ্রুপের জিসানের নাম করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ফোনে টাকা চাদা দাবি করে। তাদের ফোনে অনেকে ভয় পেয়ে টাকা দিয়ে দেয়। তারা ভিকটিমদের বিকাশ বা নগদের বিভিন্ন হিসাবে টাকা দিতে বলে। তৃতীয় গ্রুপটি ওই হিসাব থেকে টাকা সংগ্রহ করে।

এডিসি মনির বলেন, আমরা প্রথমে এই গ্রুপের প্রধান বেলাল খানকে গ্রেপ্তার করি। পরে টুটুল খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পর্যায়ক্রমে তাদের গ্রুপের আরো চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একটি ডাইরি উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে ভিকটিমদের তালিকা পাওয়া যায়।

এরা কীভাবে বিকাশ কিংবা নগদের হিসাব নম্বর খোলে এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়ালিদ হোসেন বলেন, বিভিন্ন নিরীহ লোকদের ও তাদের আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে হিসাব খোলে।

এই গ্রুপটি মাদারীপুর নারায়ণগঞ্জ ও বরিশালকেন্দ্রিক কাজ করে। তাদের একটি গ্রুপ ঢাকায় রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত ছয়জনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও চাঁদাবাজি আইনে ছয়টি মামলা রয়েছে।

কে এই জিসান

জিসানের পুরো নাম জিসান আহমেদ মন্টি। ঢাকার আলোচিত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও জি কে শামীমের সঙ্গে অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন জিসান। এই ত্রয়ীর সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল আরেক ক্যাসিনো গডফাদার  ইসমাইল হোসেন সম্রাটের।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত এক দশকে দেশের শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর নাম তালিকাভুক্ত করেছে। তাদের অন্যতম হলেন জিসান। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। রাজধানীর গুলশান, বনানী, বাড্ডা, ফকিরাপুল, পল্ট মতিঝিলসহ বেশ কিছু অঞ্চলে তার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। ওইসব এলাকার সরকারি ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে নিয়মিত চাঁদাবাজি করতেন তিনি। ইন্টারপোল তার নামে রেড অ্যালার্ট জারি করে রেখেছে। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে জিসান সম্পর্কে বলা আছে, তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড ঘটানো এবং বিস্ফোরক বহনের অভিযোগ আছে।

২০০৩ সালে মালিবাগের একটি হোটেলে দুজন ডিবি পুলিশকে হত্যার পর আলোচনায় আসেন জিসান। এর পরেই গা ঢাকা দেন। ২০০৫ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে সে দেশ ছাড়ে বলে ধারণা করা হয়।

সূত্র জানায়, সেই সময় পালিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন জিসান। এরপর নিজের নাম পরিবর্তন করে আলী আকবর চৌধুরী নামে পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন। ভারতীয় নাগরিক হিসেবে ঠিকানা দেখানো হয়েছে সারদা পল্লী, ঘানাইলা, মালুগ্রাম শিলচর, চাষার, আসাম। বাবার নাম হাবিবুর রহমান চৌধুরী। মায়ের নাম শাফিতুন্নেছা চৌধুরী। আর স্ত্রীর নামের স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে রিনাজ বেগম চৌধুরী। পাসপোর্ট ইস্যুর স্থান দুবাই হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। দেখা গেছে, ২০০৯ সালের ৭ জুন প্রদান করা পাসপোর্টটির মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ২০১৯ সালের ৬ জুন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের খবর, চলতি বছরের ৬ জুন পাসপোর্টটির মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পর ফের ভারতীয় পাসপোর্টটি ১০ বছর মেয়াদের নবায়ন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুবাইয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের দুটি রেস্টুরেন্ট আছে; আছে গাড়ির ব্যবসাও। এসব দেখভাল করেন তার ছোট ভাই শামীম এবং ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শাকিল মাজহার। এর মধ্যে শাকিল মাজহার যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সহসম্পাদক রাজিব হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। এ হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে দুবাই চলে যান তিনি।

সাম্প্রতিক দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে দুই যুবলীগ নেতা জিকে শামীম ও খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে আটকের পর তার (জিসানের) নাম ফের নতুন করে আলোচনায় আসে। তাদের মধ্যে এক সময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। পরে ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বে জিসান শামীম ও খালেদকে হত্যা করতে লোক ভাড়া করেছিলেন।

সূত্র জানায়, জিকে শামীমকে ঘিরে ঢাকা মহানগর যুবলীগের এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে জিসানের বিরোধ তৈরি হয়। এ সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন আরেক যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। বিরোধের একপর্যায়ে জিসান খুবই ক্ষুব্ধ হন তাদের ওপর। অবস্থা ভিন্ন দিকে চলে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় জিসানের সঙ্গে বিরোধ মেটাতে সমঝোতা বৈঠকের আয়োজন করেন খালেদ।

গত জুনের মাঝামাঝি সিঙ্গাপুরে যান জিকে শামীম, মহানগর যুবলীগের ওই শীর্ষ নেতা ও খালেদ। আর জিসান দুবাই থেকে সেখানে যান। সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে এলাকার একটি বিলাসবহুল হোটেলে তাদের বৈঠক হয়। যদিও বৈঠকে শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে কিলিং মিশনে অংশ নিতে দুবাই থেকে ঢাকায় পাঠানো হয় জিসানের সহযোগীদের।

ঢাকার টেন্ডারবাজ জি কে শামীম গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, আগে কখনো এত দেহরক্ষী রাখেননি তিনি। মূলত জিসানের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হওয়ার পর থেকে ‘ভয়ে’ বড় নিরাপত্তা টিম গঠন করেন।

সরকারের পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষসন্ত্রাসীর মধ্যে অন্যতম জিসান। এ তালিকার অন্যরা, যারা এক সময় ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপাত, তাদের কেউ এখন বিদেশে, কেউবা কারাগারে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads