• রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

অপরাধ

ছিনতাইকারীদের টার্গেট ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনকারীরা

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

গত ৭ ফেব্রুয়ারি শহিদুল ইসলাম তাঁতীবাজার থেকে ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে রিকশায় ব্যাংকের উদ্দেশে রওনা হন। রিকশাটি শাহবাগের টিঅ্যান্ডটি এক্সচেঞ্জের পূর্বপাশের টেম্পো স্ট্যান্ডের কাছে পৌঁছালে তিনি ছিনতাইকারীদের খপ্পরে পড়েন। ওই সময় ৮-১০ জন তার রিকশার গতিরোধ করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। পরদিন তিনি শাহবাগ থানায় মামলা করেন।

এ ঘটনায় ছিনতাইকারী দলকে ধরতে ব্যাপক অভিযান শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। অবশেষে ছিনতাইকারী গ্রুপের ৬ সদস্যকে আটক করে। উদ্ধার হয় আড়াই লাখ টাকাও। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো-মাজহারুল ইসলাম ওরফে রাকিব, জহিরুল তালুকদার, আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে খোকা, সেলিম ওরফে ল্যাংড়া সেলিম, মো. লালন ও সেলিম মিয়া। এ সময় তাদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহূত দুটি চাপাতি, দুটি চাকু, একটি এন্টিকাটার ও একটি হাতুড়ি উদ্ধার করা হয়।

ডিবির রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মিশু বিশ্বাস বলেন, ছিনতাইকারীদের এই চক্রটি স্বর্ণ ব্যবসায়ীসহ বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন করে-এমন ব্যক্তিদের তাঁতীবাজার থেকেই অনুসরণ শুরু করে। এরপর সুবিধাজনক স্থানে টাকা ছিনিয়ে নেয়। ১০-১৫ জনের এই চক্রের সদস্য তিন ভাগে কাজ করে। পরে তারা লুটের টাকা ভাগ করে নেয়। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে একাধিক ছিনতাই মামলাও রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের এক দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে তারা ছিনতাইয়ে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের কয়েকটি চক্র রয়েছে। বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের তারা টার্গেট করে। নজরদারি করে টার্গেটকৃত ব্যক্তির ব্যাংকে আসা-যাওয়ার সময়ের দিকে। ব্যাংকে যাওয়া ও ব্যাংক থেকে ফেরার পথেই তারা ছিনতাই করে।

ছিনতাইয়ের সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে গত বছরের ১০ মে। পুরান ঢাকায় বিভিন্ন শাখা থেকে উত্তোলন করা ন্যাশনাল ব্যাংকের ৮০ লাখ টাকার একটি বস্তা গাড়ি থেকে খোঁয়া যায়। দিনেদুপুরে ঘটে যাওয়া ওই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা করে ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনা ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

পরে রহস্য উদ্ঘাটনে নামে ডিবি। তদন্তে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হয় ৪ জনকে। ৮০ লাখ ছিনতাইয়ের ৬০ লাখ উদ্ধার করা হয়।  গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, হান্নান ওরফে রবিন ওরফে রফিকুল ইসলাম (৫০), মো. মোস্তাফা (৫২), মো. বাবুল মিয়া (৫৫) ও পারভীন (৩১)।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীতে এ ধরনের অন্তত ৩০/৪০ টি গ্রুপ রয়েছে। এরা মতিঝিল, পুরাণ ঢাকা থেকে শুরু করে রাজধানীর অদূরে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, টঙ্গি থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। একেক গ্রুপে ১০ থেকে ১২ জন থাকে। এদের মধ্যে কাজও ভাগ করা থাকে।

অনেক সময় এদের দু একজন সদস্য ব্যাংকের ভেতরে ঢুকে বড় অংকের টাকা উত্তোলন করা ব্যক্তিকে টার্গেট করে। আর ব্যাংকের বাইরে আশপাশে থাকে আরো কয়েকজন। ব্যাংকের ভেতর থেকে টাকা উত্তোলনকারীর তথ্য দিয়ে দেয়। পরবর্তীতে তারা টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে কখনো ডিবি, কখন র্যাব অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর তাকে মারধর করে টাকা নিয়ে রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেয়। অনেক সময় খুন করতেও দ্বিধাবোধ করেনা।

জানা যায়, এর বাইরেও বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে ছিনতাইকারীরা। টার্গেটকৃত ব্যক্তি ব্যাংক থেকে বের হয়ে সামান্য কিছুদূর গেলেই অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তি চিৎকার করলে অনেক সময় ছুরিকাহত বা গুলিও করে। এমনকী ছিনতাইকারীরা ককটেল বোমারও ব্যবহার করে।

সম্প্রতি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। দুই ভাইকে রড দিয়ে পেটানোর পর ফাঁকা গুলি চালিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ৫৫ লাখ টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায় একটি চক্র। ছিনতাইকারীদের কবলে পড়া ওই দুই ব্যক্তি হলেন-সাইফুল ইসলাম সবুজ (৩৫) ও রফিকুল ইসলাম মুকুল (৩০)। তারা দুজনই ডাচ-বাংলা মোবাইলে ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট।

জানা যায়, বেলা সোয়া ১১টার দিকে ওই দুই ব্যক্তি একটি মোটরসাইকেলে মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ ব্যাংকে ৫৫ লাখ টাকা জমা দিতে যাচ্ছিলেন। পথে ৩টি মোটরসাইকেলে আসা ৬ ছিনতাইকারী তাদের গতিরোধ করে এবং লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করে দুই ভাইয়ের কাছে থাকা টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। এরপর ফাঁকা গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। এই ঘটনায় আহত হন দুই ভাই।

যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরায় ছিনতাইয়ের ঘটনাটি দেখা গেছে। ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, গত এক মাসে বিশেষ অভিযানে শতাধিক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদের কাউকে কাউকে রিমান্ডে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে ছিনতাইয়ের কৌশলসহ নানা চাঞ্চল্যকর তথ্যও পাওয়া গেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, অনেক ছিনতাইকারী তারা ভোরে বের হয়। টার্মিনাল এলাকাগুলোতে অবস্থান নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যক্তিদের টার্গেট করে ছিনতাই করে, আবার সকালে হাঁটতে বের হওয়া নারীদের স্বর্ণালঙ্কারও ছিনতাই করে।

অনেক ছিনতাইকারী সংঘবদ্ধ গ্রুপে থাকে। এরা কখনো ডিবি আবার র্যাব পরিচয় দিয়ে ব্যাংকের সাথে লেনদেন করা বড় ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে ছিনতাই করে। তারা ব্যাংকের ভেতরে লোক পাঠিয়ে দেখে কারা বড় অংকের টাকা উঠাচ্ছে। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বের হলেই তারা তাকে আটকে টাকা ছিনতাই করে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, পুরাণ ঢাকায় তারা আগে থেকেই ব্যবসায়ীকে টার্গেট করে। এ জন্য ওই এলাকা তারা বিভিন্নভাবে রেকিও করে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুবুর রহমান বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিম কাজ করে। গত মাসেই প্রায় শতাধিক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছিনতাই এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি বলেন, ডিবি বা র্যাব পরিচয়ে যারা টার্গেট ছিনতাইয়ে জড়িত তাদের গ্রেপ্তারে ডিবি সবসময় তৎপর।

মাহবুব আলম বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধ আমরা করে আসছি। ছিনতাইয়ের শিকার যেন না হন এ কারণে সচেতনতাও জরুরি। বড় টাকা ব্যাংক থেকে উঠানো বা ব্যাংকে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পুলিশের সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।  

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads