• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

অর্থনীতি

শুল্কমুক্ত সুবিধায় বাড়লেও কমেছে বাণিজ্যিক আমদানি

  • প্রকাশিত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকা থেকে গত ২৮ জানুয়ারি প্রায় সাড়ে ১০ হাজার পিস পোশাকের কাঁচামালসহ দুটি কাভার্ড ভ্যান আটক করে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রাম। শুল্কমুক্ত সুবিধায় মেসার্স সুপার থ্রেড লিমিটেডের আমদানি করা এসব পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির জন্য নেয়া হচ্ছিল।

এর এক সপ্তাহ আগে শুল্কমুক্ত সুবিধায় এনে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগে কেডিএস গার্মেন্টসের এক কাভার্ড ভ্যান কাপড় (ফ্যাব্রিকস) জব্দ করে চট্টগ্রাম শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। নগরীর পাহাড়তলী এলাকা থেকে জব্দ করা ফ্যাব্রিকসের চালানটি নগরীর কালুরঘাটের কেডিএস গার্মেন্টস লিমিটেড থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

শুধু কেডিএস বা সুপার থ্রেড নয়, এ রকম আরো অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক রফতানির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বন্ড সুবিধায় (শুল্কমুক্ত) কাপড় বা কাঁচামাল এনে বিক্রি করে দিচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের স্থানীয় খোলাবাজারে। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ও শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযানে প্রতিনিয়ত ধরা পড়ছে এমন বন্ডের পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান। কখনো গুদাম থেকে, কখনো বন্দর থেকেই সরাসরি খোলাবাজারে চলে যায় রফতানিমুখী শিল্পের নামে আনা এসব পণ্য। আবার নির্দিষ্ট মেশিনারিজের সক্ষমতার অনেক বেশি উৎপাদন দেখিয়ে অস্বাভাবিকহারে আমদানি প্রাপ্যতার সুযোগ নিয়েও জালিয়াতি সংঘটিত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কাপড় আমদানির একটি চিত্র উঠে এসেছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের এক পরিসংখ্যানে। এতে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বাণিজ্যিক কাপড় (শুল্ক কর পরিশোধ করে) আমদানির চালান সম্প্রতি কমতে শুরু করেছে। অন্যদিকে জ্যামিতিকহারে বাড়ছে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে আনা আমদানির চালান। খোদ রাজস্ব কর্মকর্তারাই এ চিত্রকে অস্বাভাবিক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে গত আড়াই বছরে ৪৯ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ৯ লাখ টন কাপড় আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা মূল্যের ৩ লাখ ৩৭ হাজার টন, ২০১৬-১৭ বছরে ১৮ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা মূল্যের ৩ লাখ ৪৪ হাজার টন এবং সর্বশেষ চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ১০ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা মূল্যের ১ লাখ ৯২ হাজার টন কাপড় আমদানি হয়।

অন্যদিকে বাণিজ্যিকভাবে (শুল্ক কর পরিশোধ করে) গত আড়াই বছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কাপড় আমদানি হয়েছে মাত্র ৫০৩ কোটি টাকা মূল্যের ২১ হাজার ৪৫৭ টন। এর মধ্যে গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৩৪ কোটি টাকা মূল্যের ১১ হাজার ৫৭৫ টন, ২০১৬-১৭ বছরে তা কমে ১৯৭ কোটি টাকা মূল্যের ৭ হাজার ৪০০ টন এবং সর্বশেষ চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) আরো কমে ৭২ কোটি টাকা মূল্যের ২ হাজার ৪৮২ টন কাপড় আমদানি হয়েছে ।

নাম না প্রকাশের শর্তে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ ও খতিয়ে দেখতে অটোমেশন পদ্ধতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না এ খাতের ব্যবসায়ীদের কারণে। দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে তারা সরকারকে শুল্ক থেকে শুধু বঞ্চিতই করছেন না, দেশীয় শিল্পেরও বড় ক্ষতি করছেন। বন্ড লাইসেন্সে পণ্যের প্রাপ্যতা সঠিকভাবে নির্ধারণ, ডেডো (শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তর) কর্তৃক সঠিকভাবে সহগ নিরূপণ ও নির্দিষ্ট সময় পরপর তা হালনাগাদ করা, বন্ডে আমদানির তথ্য পাস বইতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা, ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তা কর্তৃক শিল্প-প্রতিষ্ঠানে সঠিকভাবে মনিটরিং এবং কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট কর্তৃক বন্ডেড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় যথাযথভাবে অডিট করা হলে এ জালিয়াতি অনেক নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের কমিশনার মো. আজিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘রফতানিমুখী শিল্প-কারখানাগুলো পুনঃরফতানির শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ পায়। কিন্তু শুল্ককর অব্যাহতির এ সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরাও। গত শুধু দুই মাসেই আমরা ১২টি প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি ধরতে সক্ষম হয়েছি। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কারখানা পরিদর্শন, মজুদ যাচাই, মূসক ও ডেলিভারি চালান যাচাই করা হচ্ছে।’

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের তথ্য মতে, ২০১৭ সালে ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জালিয়াতি উদঘাটন হয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে— মেসার্স সিওয়েজ বন্ডেড ওয়্যারহাউজ, মেসার্স ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিমিটেড, এইচবি নিটিং লিমিটেড, মেসার্স শাহ আমানত নিটিং অ্যান্ড ডায়িং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মেসার্স ইয়েচেন টেক্সটাইল, মেসার্স গুডি অ্যাকসেসরিজ, মেসার্স বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ, মেসার্স ভেনকট লিমিটেড, মেসার্স ডিজিটাল প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ, মেসার্স ব্লু প্যাক লিমিটেড, মেসার্স ইউনিটি পলি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও মেসার্স সুপার থ্রেড লিমিটেড।

এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯২টি প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি শনাক্ত ও মামলা করেছে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রাম। এই তালিকায় রয়েছে— রিগ্যাল পলি প্যাকেজিং, আর এস সোয়েটার, গোল্ডেন সন, সি টেক্সটাইল, স্যানম্যান নিট ফ্যাব্রিকস, হার্বিস কনভার্টিং, ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রি, ইউনিভোগ গার্মেন্টস, সুপার নিটিং অ্যান্ড ডায়িং মিলস, শেং সেং এন্টারপ্রাইজ, রিলায়েন্স ওয়াশিং ইন্ডাস্ট্রিজ, লিবার্টি অ্যাকসেসরিজ (বিডি), ইমতি পলি প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি, কেডিএস থ্রেড, জয় জয় মিলস (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেড, স্পার্কল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ, ক্যান অ্যাকসেসরিজ ইন্ডাস্ট্রিজ, জেনফোর্ট সুজ (বিডি), টিএইচ পেপার অ্যান্ড প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ, ব্রাইট অ্যাকসেসরিজ ইন্ডাস্ট্রিজ, এমআইপি (বিডি), এমি অ্যাকসেসরিজ (বিডি), এমআইপি (বিডি), হোলি ইলাস্টিক, এভারগ্রিন প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ, জিএবি প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ, সিমস ফ্যাশন, রাস টেক্স ইন্টারন্যাশনাল, যমুনা ইলাস্টিক অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ, সুপার থ্রেড, কর্ণফুলী স্টিল মিলস, এস আর প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজেস, ইনটিমেইট অ্যাপারেলস, কেনপার্ক বাংলাদেশ অ্যাপারেলস, বিডি ডিজাইনস, অর্কিড প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ, এইচআরএম অ্যাকসেসরিজ, এমি অ্যাকসেসরিজ (বিডি), প্রো প্যাকেজিং, এইচ টি আমীন অ্যাকসেসরিজ, ভ্যানগার্ড প্যাকেজেস, মেলভিন অ্যাকসেসরিজ, সানরাইজ অ্যাকসেসরিজ, চিটাগাং কার্টনস, ইয়োগোটেক্স ফ্যাব্রিকস, নিড প্যাকেজিং, চুনজি ইন্ডাস্ট্রিজ, ডেলমাস অ্যাপারেল, প্রিন্টিং প্রো ডিজাইন, নিউ কার্টন প্যাক, লিবার্টি এন্টারপ্রাইজ, হোলি গার্মেন্টস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ, ফারমিন পলি অ্যান্ড প্যাকেজিং ও ইয়াচেন টেক্সটাইল করপোরেশন।

এছাড়াও রয়েছে— হার্বিস কনভার্টিং, লোটস প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ, ফরচুন প্যাকেজিং, লিগ্যাসি ফ্যাশন, নুরানী ডায়িং অ্যান্ড সোয়েটার, হাইস্পিড প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ ইন্ডাস্ট্রিজ, ফারমিন পলি অ্যান্ড প্যাকেজিং, কেবি ইন্টারলাইনিং কোং, ইউজিং ইন্ডাস্ট্রিয়াল, নেসা স্প্রিনার, ব্যান্ডিক্স ক্যাজুয়াল ওয়্যার, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, কোটস বাংলাদেশ, রিলায়েন্স বক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ভার্চুয়াল টেক্স, স্যামপ্যাক, এম সি এম্বেল ম্যানুফ্যাকচারিং, কোং, আর এন মিলস, গোল্ডেন সন, ইসলাম প্যাক অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ, ইউনাইটেড প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ, জে এস ইন্টারন্যাশনাল, এরিনা কম্পোজিট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, পালমি সুজ ও জিন চেং সুজের নাম।

একশভাগ রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্স সুবিধা পেয়ে থাকেন। বন্ড সুবিধা নিয়ে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আনলে তাতে শুল্ক ও কর দিতে হয় না। তবে শর্ত থাকে, সেই কাঁচামাল পুরোপুরি ব্যবহার করে দুই বছরের মধ্যে রফতানি করতে হবে। এ জন্য বন্দর দিয়ে কী পরিমাণ পণ্য বন্ড সুবিধায় এসেছে এর যেমন হিসাব রাখতে হয়, আবার ওই প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউজে কতটা রক্ষিত আছে, কী পরিমাণ ব্যবহূত হয়েছে, সেই হিসাবের সঙ্গেও মিল থাকতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় গরমিল করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল ইসলাম বলেন, ‘কেউ রফতানির নামে কাপড়, সুতা এনে কারখানায় না নিয়েই রাজধানীর ইসলামপুর, চট্টগ্রামের টেরিবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে দিয়েছেন। আবার কেউ বন্ড সুবিধায় সুতা এনে তা বিক্রি করে দিচ্ছেন। শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অভিযানে প্রতিনিয়তই এ ধরনের জালিয়াতি উদঘাটিত হচ্ছে।’

 

সূত্রঃ বণিক বার্তা

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads