• বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ৪ মাঘ ১৪২৪
বদলে গেছে অর্থনীতি

প্রবৃদ্ধিতে শিল্প খাতের অবদান বাড়ছে

ছবি : ইন্টারনেট

অর্থ ও বাণিজ্য

বদলে গেছে অর্থনীতি

# জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান বাড়লেও কর্মসংস্থান সন্তোষজনক নয় # প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে প্রয়োজন উৎপাদনশীলতা # কর্মসংস্থানে এখনো এগিয়ে কৃষি খাত

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ১২ জানুয়ারি ২০১৯

বদলে গেছে দেশের অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো। স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে অর্থনীতির ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। এ সময়ে শিল্প ও সেবা খাত বিকশিত হয়ে হাল ধরেছে অর্থনীতির। এর মধ্যে সেবা খাত এখন শীর্ষে।  তবে কর্মসংস্থান ও মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প খাতের অবদান সন্তোষজনক নয়। কর্মসংস্থানের দিক থেকে কৃষি খাত এখনো এগিয়ে। 

অর্থনীতিবিদ ও সরকারের প্রতিনিধিরা বলছেন, বিশ্ববাজারভিত্তিক অর্থনীতির প্রভাবেই এই পরিবর্তন। তা না হলে অর্থনীতি এত বেশি বিকশিত হতো না। অর্থনীতি বিকাশের সঙ্গে একটি দেশের শিল্প, সেবা ও কৃষি খাতের কাঠামোগত রূপান্তর হয়। বিকাশমান জিডিপিতে ক্রমান্বয়ে শিল্প খাত ও চূড়ান্তভাবে সেবা খাতের অবদান বাড়লে অর্থনীতি সুসংহত হয়।

জানতে চাইলে নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাংলাদেশের খবরকে বলেন, আমরা ইচ্ছে করেই কৃষি থেকে সরে এসেছি। তবে কৃষিকে গুরুত্ব কম দেওয়া হয়নি। কিন্তু ইমার্জিং অর্থনীতির জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য আমাদের শিল্প, সেবা ও বাণিজ্য প্রসার জরুরি। এটি না করলে আমরা এগিয়ে, তবে কৃষি তার নিজ অবস্থান হারায়নি।

মন্ত্রী বলেন, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর দিকে নজর দিলেও আমরা একই চিত্র দেখা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রে একসময় ৯৫ ভাগ মানুষ কৃষির সঙ্গে জড়িত ছিল। আজ সেটি নেই। আমরা উন্নতি করছি। আমাদের কৃষিতেও আগের থেকে পরিবর্তন এসেছে। সামনের দিনগুলোতে আরো হবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা কৃষি থেকে সরে এসেছি। আমাদের শিল্প, সেবা ও বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা দরকার ছিল। তবে গত পাঁচ দশকে আমাদের কৃষিতেও ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। একসময় কৃষি বলতে ধান ও পাট বোঝাত। কিন্তু সেই কৃষি আজ নেই। অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন আমাদের খাদ্যশস্যের ৯৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।

কৃষিই এখনো আমাদের কর্মসংস্থানের বড় খাত উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি বদলে গেছে। তাই বিশ্ব বাজারভিত্তিক অর্থনীতির জন্য আমাদের রফতানিনির্ভর অর্থনীতির দিকে যেতেই হবে। তবে এখানে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা ডুয়িং বিজনেস সূচকে  ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৭৬তম। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে আমরা ১৪০টি দেশের মধ্যে ৯৯তম। দুর্নীতির ধারণা সূচকে আমরা উন্নতি করলেও এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে। এসব বিষয় আমাদের এখনই চিহ্নিত করতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ১৯৭২-৭৩ সালে আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ছিল ২৬ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। ওই সময় কৃষির অবদান ছিল প্রায় ৫৯ শতাংশ। আর শিল্পের অবদান ছিল ৬ থেকে ৭ শতাংশ। বাকিটা সেবা খাতের।

সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমাদের জিডিপি আকার ২২ লাখ ২৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শিল্প খাতের অবদান প্রায় ৩৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। কৃষি খাতের অবদান ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। আর সেবা খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১৮ শতাংশ। জিডিপির প্রধান (রিয়াল সেক্টর) তিনটি খাতের মধ্যে কৃষির অবদান তৃতীয় স্থানে। সেবা খাতের অবদান শীর্ষে।

বিবিএস’র সর্বশেষ তথ্যমতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ১৭ লাখ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। দেশের অর্থনীতির ইতিহাসে এই প্রথম এত উচ্চমাত্রায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী ২৫ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি বাড়েনি। এর মধ্যে ১৯৭৩-৭৪ থেকে ১৯৭৯-৮০ সময়ে প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র গড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের ১০ বছর জিডিপি বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ হারে। এর পর থেকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে গেছে ৬ শতাংশ।

উন্নতি হয়েছে মাথাপিছু আয়ে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৬৭১ টাকা। বর্তমানে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলার। আগামী পাঁচ বছরে সরকার এটি দুই হাজার ৭৫০ ডলার নিতে চায়। 

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দেশে বস্ত্র-কাপড়ের সঙ্কট তৈরি হয়েছিল। সেই দেশ তৈরি পোশাক রফতানি করে এখন আয় করছে ২৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ এখন তৈরি পোশাক বাণিজ্যে ভারত, পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। ২০২১ সালে পোশাক রফতানি থেকে আয় দাঁড়াবে ৫০ বিলিয়ন ডলার।  

বিবিএস সূত্রমতে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্রামে বসবাস করেন। গ্রামে যারা বসবাসকারীদের প্রায় ৬০ শতাংশের এখনো কৃষিখামার বা চাষাবাদ রয়েছে। অন্যদিকে শহরেও শতকরা প্রায় ১১ ভাগ মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে মোট জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান শতকরা ১৫ দশমিক ৩৩ ভাগ।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনও বলছে, বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান অর্থনীতি থেকে একটি শিল্প-সেবা খাতভিত্তিক অর্থনীতির দেশে পরিণত হচ্ছে।

১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ছিল এক লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাতের অবদান ছিল ৪৫ শতাংশ। শিল্প খাতের অবদান ছিল ১০ শতাংশ। বাকি অংশ এসেছিল সেবা খাত থেকে। সেবা খাতের আওতায় পরিবহন ও যোগাযোগ, বাণিজ্য, আবাসন, ব্যাংক ও বীমা এবং অন্যান্যা সেবা সংশ্লিষ্ট খাতকে বোঝায়।

এরপর ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপির মোট আকার দাঁড়ায় এক লাখ ৭৫ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। তাতে কৃষির অবদান নেমে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৪১ শতাংশ, শিল্প খাতের অবদান ছিল ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং সেবা খাতের অবদান ছিল ৩৪ শতাংশ।  

২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল দুই লাখ ৮৪ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। এতে কৃষির অবদান ছিল ১৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। শিল্প খাতের অবদান বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ শতাংশ। বাকি অংশ আসে সেবা খাত থেকে।

তবে বাংলাদেশে এখন কৃষিপণ্য শুধু ধান, গম, ভুট্টা, চা, পাট, তুলা, আখ, আলু, ডাল, তৈলবীজ, ফল, মসলা, ফুল ও রেশমগুটি  বোঝায় না। এর বাইরে মাছ চাষ, সবজি চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন অন্যতম। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির আনুপাতিক অবদান কমলেও মোট কৃষি উৎপাদন বাড়ছে। কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি, বীজ, সার এবং যন্ত্রের ব্যবহার উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান কারণ। তবে কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দীন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, স্বাধীনতার পর আমাদের শিল্প ও বাণিজ্যেও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। অর্থনীতি এখন শিল্প ও সেবা খাতনির্ভর। আমরা আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তিতে পোশাক রফতানি করে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয় করতে চাই। এ থেকে বোঝা যায় আমরা কোথায় এসেছি গত পাঁচ দশকে। তবে আরো এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads