• রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
জিম্মি হয়ে পড়েছে অর্থনীতি

প্রতীকী ছবি

অর্থ ও বাণিজ্য

জিম্মি হয়ে পড়েছে অর্থনীতি

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ১০ জুলাই ২০১৯

দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। ফলে বাড়ছে ঝুঁকি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবৃদ্ধির সুফল সবার ঘরে পৌঁছে দিতে এই জিম্মি পরিস্থিতি ভাঙতে হবে। অন্যথায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল কেবল হাতেগোনা কিছু মানুষই পাবে। আর এর ফলে প্রকট হবে আয় বৈষম্য।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছেন গুটিকয়েক ব্যক্তি। তাদের হাতে অর্থনীতির মেরুদণ্ড ব্যাংক খাত যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। ফলে তুলনামূলকভাবে ছোট ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়ছেন। দিন দিন তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম রুগ্ণ হয়ে পড়ছে।

অনেক সূচকের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির এখন ভালো সময়।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সরকারের পরিকল্পনা আগামী ৫ বছরের মধ্যেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাবে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে প্রতি বছর। রপ্তানি আয় ভালো। বড় হচ্ছে স্থানীয় বাজার। এ রকম এক সুসময়েও বেসরকারি খাতকে আরো ছড়িয়ে দিতে পারলে বিনিয়োগ বাড়বে। কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কমবে অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এখন ছোট ছোট ব্যবসায়ও আসছে বড় করপোরেটগুলো। এমনকি বেকারির ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগ করছেন তারা, যা এক সময় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা করত। কিন্তু এখন বেকারির পণ্য উৎপাদন করছে দেশের নামকরা করপোরেট। এতে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হচ্ছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের।

শুধু তাই নয়, দেশের ব্যাংকিং খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে কয়েকটি পরিবারের কাছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামভিত্তিক একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কব্জায় রয়েছে সাতটি বেসরকারি ব্যাংক। এছাড়া বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমান কোম্পানির মালিকাও ওই গ্রুপটি। ফলে পুরো আর্থিক খাত ঝুঁকিতে রয়েছে। গ্রুপটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতিতে এখন যে কয়টা বড় চিন্তার বিষয় রয়েছে, তার মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ অন্যতম। সাধারণত সরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। তবে বাংলাদেশে হচ্ছে উল্টোটা। সরকারি বিনিয়োগ দ্রুত হারে বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ সেই হারে বাড়ছে না। তাছাড়া নতুন বিনিয়োগকারী তৈরি হচ্ছে না। কিছু লোক এখন সব ব্যবসায় নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে যোগ রয়েছে কর্মসংস্থানের। কারখানা বাড়লে মানুষের কাজের সুযোগ বাড়ে। কাজ পেলে আয় বাড়ে, সেই সঙ্গে বাড়ে জীবনযাত্রার মান। কিন্তু দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না হওয়ায় প্রবৃদ্ধির সুফল সবার ঘরে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে।

তাদের মতে, বিনিয়োগের হার একটা ফাঁদে আটকে গেছে। বিনিয়োগ যদি উল্লেখযোগ্য হারে না বাড়ে, তাহলে কর্মসংস্থান হয় না। প্রকৃত মজুরি বাড়ে না। এতে স্থানীয় বাজার বড় হয় না। আবার স্থানীয় বাজারনির্ভর শিল্পেরও বিকাশ ঘটে না।

বিনিয়োগ জিডিপির ২৭-২৮ শতাংশে উন্নীত করতে হলে এবং সেটা বছর বছর ধরে রাখতে হলে অনেককে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া, কিছু ধনী ও প্রভাবশালীর মধ্যে সবকিছু ধরে রাখার এক ধরনের একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

সরকারি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এই শঙ্কার প্রমাণ। ২০১১-১২ অর্থবছরে মেয়াদি ঋণের ৬২ শতাংশ ছিল বড় শিল্পে। সর্বশেষ অর্থবছরে সেটা ৭৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিপরীতে এ ক্ষেত্রে মাঝারি শিল্পের অংশ ৩১ থেকে কমে ১৪ শতাংশে নেমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উৎপাদনমুখী শিল্প জরিপ বলছে, গত ছয় বছরে মাঝারি কারখানার সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে, ক্ষুদ্র শিল্প বেড়েছে। দেশের প্রত্যেকটি খাত এখন বড়দের দখলে চলে গেছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অবকাঠামো ঘাটতি, বিকল্প অর্থায়নের অভাব, নিয়মনীতির অনিশ্চয়তা ইত্যাদি পুরনো সমস্যাও রয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সর্বশেষ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদনে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দুর্নীতি, অদক্ষ আমলাতন্ত্র ও অবকাঠামো ঘাটতিকে তিনটি শীর্ষ সমস্যা হিসেবে দায়ী করা হয়েছে।

অবশ্য ব্যবসা সহজ করতে সরকারের সংস্কার কার্যক্রম চলমান। এজন্য কাজ করছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে সংস্থাটি। বেসরকারি বিনিয়োগে শৃঙ্খলা আনতে এবার একজন উপদেষ্টাও নিয়োগ দিয়েছেন সরকারপ্রধান। বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা করা হয়েছে বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানকে।

সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের পুরো অর্থনীতি একটি সংঘবদ্ধচক্রের কাছে জিম্মি। এই জিম্মিদশা থেকে অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে হবে। সেটি না করা গেলে আগামী দিনে অর্থনীতি একটি গভীর খাদে চলে যাবে। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে আমাদের।

উদ্বেগের বিষয় হলো, তরুণদের বেকারত্বের হার সাত বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৭ সালে এ হার ১২ দশমিক ৮-এ দাঁড়িয়েছে। তরুণদের একটা বড় অংশ আবার নিষ্ক্রিয়, যারা শিক্ষায় নেই, প্রশিক্ষণ নিচ্ছে না, আবার কর্মসংস্থানও খুঁজছে না। দেশে এমন তরুণের হার ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। শ্রমবাজার জরিপ-২০১৭ মোতাবেক, ২০১৩-১৪ ও ২০১৫-১৬ দুই বছরে মোট কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র ১৪ লাখ। অর্থাৎ বছরে ৭ লাখ করে। কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৩ এই তিন বছরে মোট কর্মসংস্থান বেড়েছিল ৪০ লাখ, অর্থাৎ বছরে ১৩ লাখ।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ছোট ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের দায় পরিশোধে এগিয়ে। বড় ব্যবসায়ীরা প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক থেকে অর্থ বের করে নেন। কিন্তু সঠিকভাবে পরিশোধ করেন না। ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে খেলাপি ঋণ। সর্বশেষ হিসাবমতে, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads