• বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭
ads

অর্থ ও বাণিজ্য

সরকারের প্রণোদনা-ভর্তুকি সহায়তা যাচ্ছে কোথায়

বরাদ্দ ৪৪ হাজার কোটি টাকা

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯

অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আ হ ম মুস্তফা কামাল অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বড় সংস্কার ও অগ্রগতি হবে অর্থনীতিতে এমনটি আশা তৈরি হয় তার বক্তব্যে। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রশ্ন বাড়ছে। অর্থমন্ত্রীর বড় প্রতিশ্রুতিগুলোর বেশিরভাগই এখনো অর্জনের বাইরে। তবে অব্যাহত রয়েছে সরকারের নিয়মিত নীতি সহায়তাগুলো। বিভিন্ন খাতে যাচ্ছে নগদ সহায়তা। কিন্তু তারপরও সুফল আসছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের এত নীতি সহায়তা ও নগদ প্রণোদনা যাচ্ছে কোথায়। তারা আশঙ্কা করছেন, জনগণের করের টাকায় দেওয়া নগদ সহায়তা তসরুপ হচ্ছে কি না-তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। 

বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, বাণিজ্য, রপ্তানি, পণ্যবাজার, মুদ্রাবাজার কিংবা শেয়ারবাজার— সবখানেই সরকারের পক্ষ থেকে কিছু প্রণোদনা রয়েছে। প্রণোদনা রয়েছে কৃষিতেও। কোথাও রয়েছে নগদ সহায়তা বা ভর্তুকি, কোথাও করছাড়। রয়েছে নীতি সহায়তাও। সব ধরনের প্রণোদনার উদ্দেশ্য, সাধারণ ভোক্তা বা গ্রাহককে সুরক্ষা দেওয়া। প্রতিবছর এ জন্য বাজেটে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়। করছাড়ের আদলে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়, তাতে সরাসরি ব্যয় না হলেও সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয় সরকার। দু’একটি ক্ষেত্র ছাড়া সরকারের এসব প্রণোদনা ও করছাড়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য নগদ সহায়তা দিয়ে বাড়ানো গেছে প্রবাসী আয়। বৈধ পথে পাঠানো রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ নগদ সহায়তা ঘোষণা করায় এই খাতে সুবাতাস বইছে। রপ্তানি আয় কমছেই। টানা চার মাস ধরে কমছে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই সূচক।

রপ্তানি আয় বাড়াতে ৩৭টি পণ্যে নগদ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। এ সংখ্যা আগে ছিল ২৫টি। নতুন করে গত অর্থবছরে ১২টি পণ্য এসেছে নগদ সহায়তার আওতায়। কিন্তু কোনো প্রভাব নেই। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব হালনাগাদ তথ্য বলছে, রপ্তানি আয় হোঁচট খাচ্ছে। আর এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা। রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প মালিকরা জরুরিভিত্তিতে সরকারের কাছে নীতি সহায়তা চেয়েছেন। প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা প্রস্তাব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। অর্থমন্ত্রীর কাছে এই অর্থ চেয়ে বলেছেন, চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) পণ্য রপ্তানি থেকে এক হাজার ৫৭৭ কোটি ৭০ লাখ (১৫.৭৭ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ কম। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। এই মাসে লক্ষ্যের চেয়ে আয় কমেছে ১৮ শতাংশ। নভেম্বরে ৩০৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল ৩৭২ কোটি ২০ লাখ ডলার।

সূত্র জানিয়েছে, ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের ১৪ শতাংশ। সরকার কৃষি, শিল্প, রপ্তানি, সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পাটকল করপোরেশন, চিনি শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন নগদ ঋণ আকারে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। কৃষি খাতে ভর্তুকির জন্য গত অর্থবছরে ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। চলতি অর্থবছরেও একই পরিমাণ বরাদ্দ রয়েছে। রপ্তানিতে প্রণোদনাবাবদ গত অর্থবছরে চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে সাত হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। রেমিট্যান্সে প্রণোদনার জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। নগদ সহায়তা বা ভর্তুকির পাশাপাশি রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা। শিল্পের জন্য রয়েছে নানা ক্ষেত্রে কর অবকাশ ও করছাড়। সরকারি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে প্রতিবছর বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া হচ্ছে বাজেট থেকে। শেয়ারবাজারের জন্য রয়েছে কম সুদে ঋণ নেওয়ার তহবিল। আবারো হাজার কোটি টাকা তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নগদ অর্থের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে রয়েছে নীতি সহায়তা।

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক গত শুক্রবার আলাপকালে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, দিন যত যাচ্ছে পরিস্থিতি ততই খারাপ হচ্ছে। এখনোই আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। তা না হলে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা আসবে।

অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ, প্রণোদনা দিতে হবে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা থেকে। সেখানে বিবেচনায় রাখতে হবে, মন্দা কাটানোর জন্য, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করতে কিংবা কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়টি। তবে আমাদের এখানে অনেক সময় যৌক্তিকতাকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দাবি মানতে এবং অদক্ষতা ও অনিয়মের খেসারত দিতে প্রণোদনা দেওয়া হয়, যার ফল অনেক সময় ভালো হয় না। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও অদক্ষতা রেখে ভর্তুকি দিয়ে পরিচালনার নীতি নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।

অর্থনীতির অধিকাংশ খাতই চোখ রাঙাচ্ছে। ঋণের সুদহার কমছে না, বাড়ছে খেলাপি ঋণ, ব্যাংকগুলোর সূচক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় নাজুক। সুশাসনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও অগ্রগতি নেই। ধারবাহিকভাবে কমছে বেসরকারি ঋণ। পুঁজি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা কমে যাচ্ছে, নিষ্পত্তিও কম। অন্যদিকে শেয়ারবাজার তো দীর্ঘদিন ধরেই পতনের ধারায়।

অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে তার থেকে এক টাকাও দূরে থাকবে না তিনি। কিন্তু প্রকৃত হিসাব ভিন্ন। লক্ষ্যমাত্রা থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। আয় কম থাকায় সরকারের ঋণ করার প্রবণতা বাড়ছে। ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার ৬৫ শতাংশ ঋণ এরই মধ্যে নিয়ে গেছে সরকার। অথচ আরো ৭ মাস চলতে হবে সরকারকে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বেসরকারি খাত আরো বাধাগ্রস্ত হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে সরকারের দেওয়া বিভিন্ন সহায়তা কোনো কাজে আসেনি। নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রেও প্রণোদনার প্রভাব সীমিত। সরকারি অদক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে পরিচালনা করতে গিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়েছে। সরকার অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার না করে নগদ টাকার জোগান দিচ্ছে নতুবা করছাড় দিচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাতে আর্থিক প্রণোদনার এক ধরনের নেশা তৈরি হয়েছে। প্রণোদনা পেতে অনেকে ভুয়া নথিপত্র উপস্থাপন করে অর্থ লোপাট করছেন।

তবে প্রণোদনা যেসব ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে তা নয়। ভর্তুকির কারণে কৃষি খাতের উপকার হচ্ছে। ডিজেল ও সারের দামে যে ভর্তুকি দেওয়া হয়, তা কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুৎ খাতে প্রণোদনা এর উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়িয়েছে। যদিও স্বল্পমেয়াদি কুইক রেন্টাল বা আইপিপিকে দীর্ঘমেয়াদে নিতে গিয়ে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। যার প্রভাবে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। আবারো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া নিয়ে শুনানি চলছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আলাপকালে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতে যেসব প্রণোদনা সার্বিকভাবে সুফল বয়ে আনছে না। কর অবকাশ, নগদ সহায়তাসহ বিভিন্নভাবে দেওয়া প্রণোদনা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারেনি। সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দিয়ে কোনো লাভ নেই। এগুলো সরকারকে আরো পর্যালোচনা করা দরকার।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads