• বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
কোন পথে দেশের অর্থনীতি

প্রতীকী ছবি

অর্থ ও বাণিজ্য

কোন পথে দেশের অর্থনীতি

  • নাজমুল হুসাইন
  • প্রকাশিত ০১ এপ্রিল ২০২০

চীন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি। আর এখন দেশেও এর প্রকোপে সরাসরি ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে অর্থনীতি যাচ্ছে মন্দার পথে। বৈশ্বিক এ মহামারী সব দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সীমিত করে দিয়েছে, ধাক্কা দিচ্ছে রেমিট্যান্সে। করোনার কারণে দেশে ক্ষুদ্র-মাঝারি থেকে শুরু করে বড় বড় সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, এমনকি দোকানপাটও বন্ধ রয়েছে। কর্মহীন দিন কাটাচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক সব শ্রেণির শ্রমিক।

করোনা ভাইরাস পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকেই ওলটপালট করে দিচ্ছে, যে ধাক্কা থেকে মুক্ত থাকার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশেরও। আর কবে থামবে অর্থনীতির এ উল্টোযাত্রা, ক্ষতিই হবে কতটা, তা পুনরুদ্ধারে কতো সময় যাবে— এ সবই এখনো অজানা। বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতিতে বড় ধস নামবে, তবে সেটা কতটা ভয়াবহ হতে পারে সেটা সময়ই বলে দেবে।

অর্থাৎ করোনা ভাইরাস শেষ পর্যন্ত কতটা প্রভাব ফেলবে বাংলাদেশে অর্থনীতিতে— সেই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়ার সময় এখনো হয়নি। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে বিভিন্ন খাতের স্থবিরতা পর্যবেক্ষণ করে ক্ষতির আকার যে অনেক বড় হবে, আমাদের নিজস্ব অর্থনীতিবিদরা সেই ধারণা করছেন।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, পরিস্থিতি এতটাই খারাপের দিকে গেছে যে, এখন সরকারকে অর্থনৈতিক উত্তরণের উপায় বাদ দিয়ে মানুষের ন্যূনতম স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিতে কাজ করতে হচ্ছে। অর্থনীতির স্বাভাবিক সময়ে এ বিষয়গুলো কখনোই গুরুত্ব পায় না। অর্থাৎ অর্থনীতির এ সময়টা সবচেয়ে মন্দ সময়। তিনি বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্ব এখন অর্থনীতির ভাবনা থেকে বেরিয়ে জীবন রক্ষায় মনোযোগী। এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটিয়ে কত দ্রুততার সঙ্গে স্বাভাবিক সময়ে ফেরা যায় সেটা ভাবতে হবে। আমাদের সরকারও সে বিষয় মাথায় রেখেই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে, কারা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবকিছুর পরে দেখা যাবে, সব খাতই কম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমানে করোনা ভাইরাসের যে পরিস্থিতিতে আমরা আটকে আছি সেটা শেষ হলেই পরবর্তী করণীয় বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে। সে বিষয়ে আমরা এখনো চিন্তা করতে পারছি না।

করোনা ভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণটা কত হতে পারে তা নিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) যে বিশ্লেষণ করেছিল তাতে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হার ১ দশমিক ১ শতাংশ কমবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। যদিও তখন করোনার প্রকোপ আরো কম ছিল। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা আর প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ।

এডিবির এ আশঙ্কা সত্য হলে বিগত কয়েক বছরের বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হোঁচট খাবে। কারণ তিন বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ৭ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। আর সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

এডিবির এ শঙ্কা ভাবিয়ে তুলেছে দেশের অর্থমন্ত্রীকেও। তিনিও করোনা ভাইরাসের কারণে অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক আঘাতের আশঙ্কার কথা বলছেন। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের শাটডাউনের কারণে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের চাহিদা কমছে। ফলে এ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে অবকাঠামো খাতের প্রকল্পগুলোয়। বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) অর্থনীতিকে অনেকটা চাঙা করে রাখে, কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী বিদেশ থেকে ফিরে এসেছেন। এতে রেমিট্যান্সের ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন। ফলে এ ধাক্কাটা সামলাতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

এদিকে করোনা কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি তার একটি প্রমাণ মেলে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের এক প্রতিবেদনেও। সংস্থাটির করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫টি দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে বাংলাদেশকে।

‘গ্লোবাল ট্রেড ইম্প্যাক্ট অব দ্য করোনা ভাইরাস এপিডেমিক’ শিরোনামে ওই গবেষণা প্রতিবেদনটিতে করোনা ভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্প খাত, কাঠ ও আসবাব শিল্প এবং চামড়াশিল্পে বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদন অনুযায়ী চীনের অর্থনীতি শ্লথ হওয়ায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে চামড়াশিল্পে। এই শিল্পে ১৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বস্ত্র ও আসবাবপত্র শিল্পে এক মিলিয়ন ডলার করে ক্ষতি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।

এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের (আইসিসি,বি) সভাপতি মাহবুবুর রহমানও বলেন, করোনা ভাইরাস নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য স্মরণকালের সবচেয়ে বড় আঘাত। এটি বিগত বিশ্বমন্দাকে ছেড়ে যাবে। তবে করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি যেহেতু প্রতিদিন বাড়ছে, অর্থনৈতিক অনুমানগুলো কেবল এর প্রভাবের মাত্রা জানাতে পারবে। করোনার প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী কী ক্ষতি হবে এখনই তা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, করোনা প্রাদুর্ভাবের স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করবে এর শাখাপ্রশাখা বিস্তারের পরিধি। সেটা পর্যবেক্ষণসাপেক্ষে নীতিনির্ধারকরা কীভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পদক্ষেপ নিতে পারবেন তার ওপর নির্ভর করবে অন্য সবকিছু। তবে সে ধাক্কাটা খুবই বড় হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads