• সোমবার, ১ মার্চ ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

ব্যবসার খবর

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন মাত্র ৩৪০ কোটি টাকা

বিদেশে বিনিয়োগ তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ২৭ জানুয়ারি ২০২১

ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ২০১৮ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত বৈধ বিনিয়োগের ৭৪ দশমিক ৮১ গুণ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে বিদেশে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৪০ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বৈধভাবে অনুমোদন পাওয়া ১০টি প্রতিষ্ঠান হলো আকিজ জুট মিলস, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড, ডিবিএল গ্রুপ, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, স্পেকট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম, সার্ভিস ইঞ্জিন লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, এসিআই হেলথকেয়ার লিমিটেড এবং বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস। এসব প্রতিষ্ঠান বৈধ পন্থায় ৫২.৭৯ মিলিয়ন ডলার বিদেশে বিনিয়োগ করেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদনে ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। সেগুলো বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ। অথবা পাচার করা অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। যদি এই বিনিয়োগ পাচার করা অর্থের মাধ্যমে হয়ে থাকে তাহলে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়। আর যদি শুধুমাত্র প্রবাসীদের দ্বারা হয়ে থাকে তাহলে সেটি খতিয়ে দেখে তাদেরকে দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলতে উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

এ ব্যাপারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘যেহেতু অঙ্কটা অনেক বেশি, সেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের খতিয়ে দেখা উচিত।’।

বাংলাদেশি বিভিন্ন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী বাংলাদেশের বাইরে বিনিয়োগ করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে অনুমতির দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু ঢালাওভাবে এ রকম বিনিয়োগ করার কোনো নীতিগত ও আইনগত সুযোগ নেই। তবে সরকারের ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি সাপেক্ষে বিদেশে টাকা পাঠানো ও  সেই টাকা থেকে বিনিয়োগের বিধান রয়েছে। এছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে রয়েছে নানা জটিলতা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ১০০ ডলার বিনিয়োগ করতে গিয়ে এসিআই কোম্পানিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং সিঙ্গাপুরে সাড়ে ১০ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার (সাড়ে সাত হাজার মার্কিন ডলার) বা ৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছে। একই খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ারিং বিদেশে সাড়ে সাত হাজার ডলার বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পেয়েছে। তবে এসব অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনেককে ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে বলে জানা গেছে। অনেক চেষ্টা করেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে অনেক উদ্যোক্তা অর্থপাচারের পথ বেছে নিচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন, এ ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া দরকার। আবার কারো মতে, ঢালাওভাবে বিদেশে বিনিয়োগের সময় এখনো আসেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন, বিধিনিষেধ আরোপ করার কারণে দেশ থেকে অনেক বেশি পরিমাণে অর্থ পাচার হচ্ছে। তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘আংশিক হলেও ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্টকে কনভার্টেবল করা উচিত। কারণ সারা পৃথিবী রেস্ট্রিকশন তুলে দিয়েছে। শুধু বাংলাদেশ ছাড়া। আমি হলে বলতাম, যেহেতু পাচারই হয় তাহলে রেস্ট্রিকশন তুলে দাও।’ বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হলে পাচারের পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আরো বাড়বে বলে মনে করেন আবু আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন সহজে নিতে পারবে তখন আর সে পাচার করবে না। তখন টাকা নিজের দেশে রাখবে। এখান থেকে টাকা সরাতে না পারলে বিদেশ থেকেও টাকা আসবে না। বিদেশের পোর্টফোলিও ইনভেস্টররা বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ইনভেস্ট করতে পারে। ফরেন এক্সচেঞ্জ নিয়েও যেতে পারে। তাদেরকে বাধা দেওয়া হয় না। তাহলে বাংলাদেশের লোকেরা কেন পারবে না। সরকার তাতে বাধা দেয়। আর বাধা দেওয়ার কারণেই বাংলাদেশের ধনীরা অর্থ পাচার করে।’

সিপিডির মুস্তাফিজুর রহমান বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপকে সঠিক মনে করছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের টাকা এখনো ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্টে কনভার্টেবল না। এটাকে ঢালাওভাবে দেওয়া হলে সমস্যা হবে। অতএব বাংলাদেশ ব্যাংক বেছে বেছে যেভাবে দিচ্ছে সেটা ঠিক আছে বলে আমি মনে করি।’

২০১৩ সালে ‘এমজেএল বাংলাদেশ’ মিয়ানমারে ৫ লাখ ১০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে। ২০১৭ সালে আকিজ গ্রুপ মালয়েশিয়ার রবিন রিসোর্সেস কিনে নিতে প্রায় আট কোটি ডলার বিনিয়োগের অনুমতি পায় মন্ত্রিপরিষদের কাছ থেকে। ২০১৮ সালে এই লেনদেন সম্পন্ন হয়।

তবে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর কী পরিমাণ অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ করার জন্য বৈধ পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তার কোনো সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত  পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ বা যেকোনো দেশ থেকেই ঘোষিত বিদেশে বিনিয়োগের অর্থ সাধারণত বৈধ পথে স্থানান্তরিত হয়। তাই এটির সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হিসাব থাকার কথা। যা বৈধ পথে যায় না, তার হিসাব পাওয়া খুব কঠিন হয়। আর সেই টাকা পাচার হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার কিছু অর্থ অনুমোদন ছাড়াই বৈধ পথে নানা কৌশলে স্থানান্তরিত হয়, যা চিহ্নিত করাও বেশ দুষ্কর।

বিষয়টি স্বীকার করে সিপিডির মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিদেশে পাচারের বিষয়ে ডেটা পাওয়া খুবই মুশকিল। তথ্য-উপাত্ত না পেলে গবেষণায় সমস্যা হয়।’ 

আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বরাত দিয়ে বিদেশে বাংলাদেশি বিনিয়োগের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তা যথাযথ নয় বলেও মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, আকিজ গ্রুপ ২০১৮ সালে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারের লেনদেন সম্পন্ন করেছে মালয়েশিয়ার দুটি কোম্পানি কেনার জন্য। এর মধ্যে দুই কোটি ডলারই গেছে আকিজের রপ্তানি প্রত্যাবাসন কোটায় সংরক্ষিত অর্থ থেকে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

লেনদেনের ভারসাম্যের বিস্তারিত পরিসংখ্যান বাংলাদেশে ব্যাংক প্রতিবছর প্রকাশ করলেও সাধারণ মানুষের পক্ষেতো নয়ই, গবেষকদের পক্ষেও সেখান থেকে মূল তথ্যটি উদ্ধার করা কষ্টসাধ্য।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads