• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

আনন্দ বিনোদন

শিল্পীরা চিন্তিত নন

  • প্রকাশিত ১৮ এপ্রিল ২০১৮

রাফিউজ্জামান রাফি

একটা সময় ছিল যখন আমরা গান শুধু শুনতাম। রাস্তার মোড়ে উচ্চস্বরে গান বাজত, পাশের বাড়ির বিদেশ থেকে পাঠানো ড্যাকসেটে গান বাজত, নিজের বাড়িতেও আর কিছুতে না হলেও অন্তত ওয়াকম্যানে গান বাজত আর আমরা শুনতাম। এখন আর সেইদিন নেই। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে গানও শোনার জিনিসের পাশাপাশি দেখার জিনিসে রূপ নিয়েছে।

মানে, মিউজিক ভিডিওর কথা বলছিলাম আরকি! ভালোই তো, একের ভেতর দুই! খারপ কী! আমরা  মিউজিক ভিডিও দেখতে শুরু করলাম। তাতে সুশ্রী ও সুদর্শন মডেল থাকে। তারা যা পড়ে তাতেই  ভাল্লাগে, যা করে তাই ভাল্লাগে। তাতে সুন্দর সুন্দর লোকেশন থাকে। ক্যামেরায় যেভাবে ধরে সেভাবেই ভাল্লাগে। এই সুন্দর সুন্দর জিনিস দেখতে দেখতে আমরা তার  ভেতরে হারিয়ে যাই। পাঁচ মিনিট সময় কোথা দিয়ে শেষ হয় বুঝি না! তবে শেষ হলেও তার রেশ থেকে যায়। মান অভিমান, হাসি কান্নার দৃশ্যগুলো চোখে চোখে ভাসতে থাকে। মনে দোলা দিতে থাকে। কিন্তু কানে কিছু ভাসে না, কানে কিছু দোলা দেয় না। কী দেখলাম তা মনে থাকে কিন্তু কী শুনলাম তা মনে থাকে না। মনে মনে ভাবি, এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! কী দেখলাম তা মনে না থাকলেও চলত, কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু কানে কী শুনলাম সেটা তো অবশ্যই মনে থাকা দরকার। কেননা, শোনার জিনিসটার (গান) ওপর ভিত্তি করেই দেখার জিনিসটা তৈরি হয়েছে। যে গানটাকে ঘিরে এত চাকচিক্যময়  ভিডিও, এত উজ্জ্বল ভিডিও, সেই গানটাই যদি মনে দোলা না দেয় তাহলে এত সুন্দর চাকচিক্যময় ভিডিওটির সার্থকতা কোথায় কিংবা সেখানে শিল্পীরইবা কৃতিত্ব কোথায়?

মিউজিক ভিডিওর উজ্জ্বলতায় শিল্পীর খুশি হওয়ার কিছু নেই। কেননা,  মিউজিক ভিডিওর উজ্জ্বলতার কৃতিত্ব তো শিল্পীর নয়, ভিডিও নির্মাতার, অভিনেতা-অভিনেত্রীর। দুঃখের বিষয় এসব নিয়ে আমরা হতাশ ও চিন্তিত হলেও অধিকাংশ শিল্পীকে মোটেই চিন্তিত মনে হয় না। বরং তাদের গায়ক-গায়িকার চেয়ে মিউজিক ভিডিওর নায়ক-নায়িকা হিসেবেই বেশি নিবেদিত ও অন্তঃপ্রাণ মনে হয়। গানটাকে আকর্ষণীয় করার চেয়ে তারা যেন মিউজিক ভিডিওকে আকর্ষণীয় করতেই বেশি ব্যস্ত।

জ্বী, মাতামাতিটা এমন পর্যায়েই চলে এসেছে। সেই সঙ্গে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানেরও দাবি অডিও নয় ভিডিও। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এটা দাবি করতেই পারে। কারণ তাদের মাথাব্যথা থাকার কথা নয় এ ব্যাপারে। কেননা, দিন শেষে তাদের ব্যবসায় প্রফিট থাকলেই হলো। সেটা গানের সফলতায়ই হোক আর মিউজিক ভিডিওর সফলতায়ই হোক। কিন্তু দিন শেষে একজন শিল্পীর ঝুলিতে তো গান ভিন্ন আর কিছু জমা হবে না। যতই ঝকঝকে মিউজিক ভিডিও বানানো হোক, শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখবে ওই গানই যা নাকি মিউজিক ভিডিওর যুগে তাদের নিকট থেকে পাচ্ছে বিমাতাসুলভ আচরণ।

অথচ মনে হয় না এ নিয়ে মুষ্টিমেয় শিল্পী ছাড়া কেউ ভাবেন। ভাবলে তো উজ্জ্বল ভিডিওর চেয়ে উজ্জ্বল অডিওই পাওয়া যেত তাদের নিকট থেকে।

পুনশ্চ, গান যদি ভালো হয় তবে তার জন্য উচ্চমানের মিউজিক ভিডিও নিষ্প্রয়োজন। মোটামুটি মানের অথবা একটি লিরিক ভিডিও হলেই যথেষ্ট। এই কথা শুনে কেউ ভাববেন না এ তত্ত্ব আকাশ থেকে টুপ করে পড়া। ইউটিউব ঘাটলেই পেয়ে যাবেন অনেক লিরিক ভিডিও আছে যার ভিউয়ারস প্রমাণ সাইজের। এটা ভালো গানের ফসল।

এখনই সময় কণ্ঠশিল্পীদের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ার। না হলে ভবিষ্যতে অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগতে পারেন তারা। বিগ বাজেটে মিউজিক ভিডিও বানিয়েই আর কয়দিন টিকে থাকবেন তারা? দুদিনে মিলিয়ন ডলার দর্শক প্রাপ্তির সফলতাই বা কয়দিন থাকবে যদি গানটাই মনের মতো না হয়? শুনেছি দুদিনে মিলিয়ন ডলার দর্শক প্রাপ্তির পেছনে নাকি আবার বুষ্ট হাসে! এভাবে আর কতদিন?

তার চেয়ে সুরুচিসম্পন্ন ভালোমানের গান বানানোর দিকে আগে মনোযোগী হওয়াটাই বোধ হয় উচিত। শ্রোতারা মুখিয়ে আছে ভালো গানের জন্য। তাদের ভালো গান উপহার দিন। তাতেই তারা খুশি হবে। আর তা না করে এখন যা করছেন তা করলেই বরং শ্রোতারা রাগ করবে। আর সেই রাগের ফসল হবে বিদেশির ভাষার গানটাকে আপন করে নেওয়া। তখন আর কিছুই করার থাকবে না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads