• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
ads

আনন্দ বিনোদন

আমরা জুড়ে যেতে পারি না ছবি দিয়ে?

  • প্রকাশিত ২১ এপ্রিল ২০১৮

কল্লোল লাহিড়ী

লাইনটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে গোর্কি সদনকে ঘিরে ধরেছে। লাইনের একদম শেষের দিকে আছি আমি। টেনশন আছে মনে। ঠিকভাবে ঢুকতে পারব তো হলে? সময়টা এই শতকের গোড়ার দিকের। আমরা প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি পরিচালকের প্রথম কাহিনীচিত্র দেখব। এই ছবি নিয়ে টুকরো খবর ঘুরে বেড়িয়েছে ফিল্ম ক্লাবগুলোতে। ছবির ভালোবাসা মানুষগুলোর ব্যাগে, কথায়, লেখনীতে। তখনো ছবিটা সেইভাবে দেখানো হয়নি। যতদূর মনে পড়ছে, আইনস্টাইন সিনে ক্লাব আর গোর্কি সদনের ব্যবস্থাপনায় আমরা দেখতে চলেছি তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’।

বাংলাদেশের মাঠ-ঘাট, নদী, পালা-পার্বণ যখন আছড়ে পড়ছিল সাদা পর্দায়, মগ্ন হয়ে গিয়েছিল দর্শক। মনে তখন প্রশ্ন জাগত, এই ছবি এই বাংলার হলগুলোতে কেন চলবে না? কেন সবাই দেখার সুযোগ পাবে না? তারও অনেক পরে পরিচয় হয়েছিল তারেক ভাইয়ের সঙ্গে। ছবি দেখার সূত্র ধরেই। তিনি সেবার দেখাতে ঝুলি ভর্তি করে ছবি নিয়ে এসেছিলেন। ‘মুক্তির গান’ দেখে কলকাতার নন্দন থেকে যখন বেরোচ্ছি, কথা বলার ভাষা ছিল না আমাদের। ‘অন্তরযাত্রা’ এ তো শুধু মা আর ছেলের গল্প নয়, দেশের কাছে ফিরে আসার এক অন্তরমুখী চেতনার টান। নন্দন চত্বরে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে কথায় আড্ডায় জানতে চেয়েছিলাম তারেক ভাইয়ের কাছে— আমরা জুড়ে যেতে পারি না আবার ছবি দিয়ে? খুব সুন্দর কথা বলেছিলেন তারেক ভাই। ‘জুড়েই তো আছি কল্লোল।’ না হলে ‘মুক্তির গান’ দেখাই কী করে? আমার ‘অন্তরযাত্রা’? সত্যি হয়তো তাই। কিন্তু সে তো মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে। আর সমগ্রের স্বার্থে যদি ভাবা যায়, এক ভাষার স্বার্থে যদি ভাবা যায়, বাণিজ্যের আদান-প্রদানের জন্য যদি ভাবা যায়? সেদিন বেশিক্ষণ কথা এগোয়নি। সম্ভব ছিল না। তারপর আর দেখা হয়নি তারেক ভাইয়ের সঙ্গে।

অনেক সময় পরে ইউল্যাবের অ্যানিমেশন বিভাগের অধ্যাপক শিপু ভাইসহ দেখা করেছিলাম ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে। নিয়ে এসেছিলাম তার শেষ ছবি ‘রানওয়ে’। যে বিপন্নতা মানুষের আড়ালে-আবডালে মাথা উঁচিয়ে বড় হচ্ছে, সেই বিপন্নতার অংশীদার তো আমরা সবাই। কাজেই ওই, আবার জুড়ে যাওয়ার প্রশ্ন। অনেক বড় দর্শকের চাহিদা। অনেকের কাছে পৌঁছানোর আবেদন। ‘চলচ্চিত্র যাত্রা’ বইটি পড়েও বেশ বোঝা যায় তারেক মাসুদও চেয়েছিলেন সেই দর্শকদের পেতে। সেই হলগুলোতে ঢুঁ মারতে, যারা কোনোদিন তথাকথিত পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক ছবি দেখেননি বা প্রদর্শন করেননি। ‘মুক্তির গান’ নিয়ে তার বিভিন্ন জায়গায় ছুটে যাওয়া বা ‘রানওয়ে’ দেখানোর জন্য মরিয়া চেষ্টা- সেসব কথারই সূত্র বহন করে। 

ঢাকায় বেশ কয়েকবার গেছি কার্যসূত্রে। কাজের অবসরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে। নজরে পড়েছিল অধিকাংশ হলে ইংরেজি ছবির আধিপত্য। অবাক হয়েছিলাম যখন বসুন্ধরায় পোস্টার দেখতে পেলাম একটি তথ্যচিত্রের। ‘শুনতে কি পাও’? ছবিটি সে বছর পুরস্কার পেয়েছিল মুম্বাই ইন্টারন্যাশানাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। ঢাকার বন্ধুদের দেখতে গেলাম। আশ্চর্যের সঙ্গে আবিষ্কার করলাম ছবিটার সম্পাদনা করেছেন আমার কলকাতার বন্ধু। হল থেকে বেরিয়েই তাকে পাঠালাম বসুন্ধরার ছবি। বিশাল পোস্টার। ছবি দেখতে আসা মানুষের ভিড়। কলকাতায় বসে তখন উত্তেজিত সে। কিন্তু এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল। না হলে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ কী করে হতো? ‘পালঙ্ক’? ‘পদ্মা নদীর মাঝি’? ‘মনের মানুষ’? ‘শঙ্খচিল’? ‘ডুব’? আরো এমন কত কত? এ ধরনের আদান-প্রদান যত বাড়বে, মনের জানলাগুলো তত খুলে যাবে নানাদিকে। বাণিজ্যের তরী ছুটবে সাঁই সাঁই করে। বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গে যদি একই সঙ্গে বাংলা ছবি মুক্তি পায়, তাহলে দুই দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে জোয়ার আসতে বাধ্য। সরকারি ফাইলে, নীতিমালায় কী আছে আমি জানি না। বাণিজ্যের সেই পাওয়া না পাওয়ার জটিল সমীকরণেও যেতে মন চায় না।

বাংলাদেশের কোনো ছবি নিয়ে যখন হইচই হয়, মনে হয় এটা কেন আমি কলকাতায় বসে এখনই আমার হলে দেখতে পাব না বা যখন বাংলাদেশের বন্ধুরা বলেন আপনাদের ওই ছবি দেখতে এখনো এক মাস বসে থাকতে হবে, তখন মন খারাপ হয়। আজিজ মার্কেটে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে মনে হতো যদি ‘পাঠক সমাবেশ’ কলেজ স্ট্রিটে, গড়িয়া হাটে কিংবা যাদবপুরে স্টল দিত! যদি ‘রঙে’র একটা বড় শোরুম থাকত কলকাতায়! যদি চন্দননগরের ‘জলভরা সন্দেশ’ ফাহমিদ ঢাকায় বসে খেতে পারত! কিংবা আমি ময়মনসিংহের ‘মণ্ডা’ উত্তরপাড়ায়। কী এমন ক্ষতি হতো?

তবে এর কিছু কিছু কলকাতা শহরে শুরু হয়েছে সবেমাত্র। ‘পাঠক সমাবেশ’ তাদের একটা স্টল করেছে কলেজ স্ট্রিটে। ‘ধ্যানবিন্দু’ রাখছে বাংলাদেশের অনেক লিটল ম্যাগাজিন। আজিজ মার্কেটের ‘বিদিত’ রাখছেন কলকাতার অনেক তরুণ লেখকের বই। আজ থেকে দুই বছর আগে বাংলাদেশের বই পেতে হলে হাতেগোনা কয়েকজন ছিলেন, তারাই এনে দিতে পারতেন। তাও সময় লাগত অনেক। কিন্তু চিত্রটা পাল্টাতে শুরু করেছে। আমার আশা ছবির মানচিত্রও পাল্টাবে। একই সঙ্গে আমরা দুই বাংলার মানুষজন ছবির প্রথম দিনের প্রথম শোয়ের দুর্লভ মুহূর্ত শেয়ার করব নিশ্চয়ই একদিন। ছবি আমাদের জুড়ে দেবে দুই দেশকে, মানুষকে, সংস্কৃতিকে, ভাষাকে।

জসীমউদ্দীনকে দিয়ে শেষ করি লেখাটা। ঋত্বিক ঘটক আর রাজেন তরফদার নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, “রাজেনের ভাষায়, ‘সামনে কি হইবে জানি না, আগামীই বলিতে পারে’। ঋত্বিকের কথায় সমাজ বিকাশের নিয়ম ‘আগামী মানেই আলো। মানবতার জয় অবশ্যম্ভাবী।’ এগিয়ে চলো শঙ্কাহীনভাবে। তাই তিতাসের বাসন্তীর চোখে মৃত্যুর মুখে নতুন দিনের আলো। আগামী দিনে শিঙা ফুকিয়ে ঘোষণা করছে জীবনের জয়। জয় মানুষের।”

আপাতত সেইটুকুই ভরসা।

 

লেখক : চিত্রনাট্যকার ও তথ্যচিত্র নির্মাতা, কলকাতা

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads