• মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

ফিচার

বেলাল চৌধুরী : স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী এক যুবরাজ

  • শিবলী মোকতাদির
  • প্রকাশিত ২৮ এপ্রিল ২০১৮

দিনগুলো দিগন্তের মতো বয়ে যাচ্ছে। কোথাও ভাসাভাসা, কোথাও আঁকাবাঁকা। সূর্যটা কোথাও তীক্ষ, এক্কেবারে খাড়া, তেজোদীপ্ত। যেন তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে কোতল করতে তার সকল অজাত শত্রুকে। এমনই নিষ্ঠুরতম মাস এই এপ্রিল। তাপ আর তৃষ্ণায় যখন আচ্ছন্ন এই দেহ, মন যখন গোলাপের পাপড়ির মতো মর্মরিত, ঠিক তখনই শীত এসে শীতল করে দিয়ে গেল এই দেহ। চারদিকে ঘোরলাগা ঘনঘটা। আকাশে জমতে শুরু করেছে কুয়াশার কোলাহল। আমাকে ভাবাচ্ছে। কেন হিম পড়ছে বাগানে? প্রায় গোলাকার ভূমণ্ডলের সহস্র নির্জনতা ভেদ করে দূরে কোথাও করুণ কান্নার ধ্বনি থেকে থেকে ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে আমার কানে। আমি বুঝি এই ব্যথা হারানোর, এই সুর চিরবিচ্ছেদের। ঘাসের কার্পেটে শুয়ে শুয়ে রাতের তারাদের বিস্ময়ের নানান প্রশ্ন তুলে ধরি। তারা বলে— পতন হয়েছে এক নক্ষত্রের।

২৪ এপ্রিল ২০১৮ বাংলা সাহিত্যের মেধাবী, সৃষ্টিশীল এবং প্রচণ্ড বোহেমিয়ান কবি বেলাল চৌধুরী চলে গেলেন, বিচিত্র চিহ্ন আর চিত্র রেখে আলেয়াপুরীর দিকে। এই যাওয়া শুভঙ্করের ফাঁকির মতো। আর আমি আসিব না ফিরে। ৮০ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে আমাদের সাহিত্যের সংগ্রহশালায় যেটুকু দিয়ে গেলেন তিনি— দীর্ঘ পাঁচ দশকব্যাপী, হতে পারে তা কবিতা, প্রবন্ধ, বিচিত্র সংকেতনামায় ভরপুর তার সাংবাদিকতা, ফোঁটায় ফোঁটায় গচ্ছিত তার গবেষণার খাতা, আইভি লতার মতো জড়িয়ে থাকা অহংকারের অনুবাদসহ মাতাল সময়ে— মত আর মর্জিমাফিক করে গেছেন পত্রিকার সম্পাদনা। নানান সূত্রে সাধিত এই সাধক জানি না সাহিত্যের কোন শাখায় কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন! তবে আমি তাকে ঠাঁই দেব মূলত কবির কাতারে। ৮০ বছরের বিচিত্র আর বর্ণাঢ্য জীবনের নানান কৃৎকৌশলের মসলা দিয়ে গড়ে ওঠা তার গর্বিত গ্লোব আজ এই রাতে বারবার ঘুরিয়ে দেখছি আমি। কোথায় নেই তিনি? শোনা যায়— কয়লার কুচি ও জ্বলন্ত ফুলকি শৈশবে রেল ইঞ্জিনের ড্রাইভার হওয়ার স্বপ্ন জাগিয়ে দিয়েছিল তার শিশুচিত্তে। শৈশব থেকেই পায়ে তার লেগে আছে সর্ষে। আচ্ছাতরে ঘুরেছেন। ঝড়ো হাওয়ার মতো উদ্দাম জলস্রোতকে পাল্লা দিয়ে কি পাহাড়! কি পর্বত! সমতল তো হাতের মুঠোয়। আর এই ভ্রমণের ভরসায় ভর করে দুই বাংলার কীর্তিমান কবি, লেখকদের সঙ্গে ঘটেছে তার পরিচয়। কি ঢাকা, কি কলকাতা সমস্ত অলিগলিতে লেগে আছে তার চরণচিহ্ন।

কবিমাত্রই বিরাজ করেন কল্পনার জগতে। সে চায় আমাকে রাত্রি দাও, আমাকে দুঃখ দাও— লিখব আমি আমার কবিতা। প্রহর যে বয়ে যায়! কবি বেলাল চৌধুরীর ভাষ্যে— মানুষকে তেপান্তরিত করা হয়। তাকে নাকি করা হয়েছিল দ্বীপান্তরিত। ফেনীতে জন্ম নিয়ে এই সন্দ্বীপ তো এই কুমিল্লা, কখনোবা কাপ্তাই। পোকা থেকে প্রজাপতি হওয়ার স্বভাব শৈশবেই তার পরিযায়ী স্বভাব তৈরি করে দিয়েছিল। ফলে বাড়ি থেকে পালিয়েছেন। মাছ ধরার ট্রলারে চেপে ভিড়েছেন কলকাতা। একহাতে তার প্রজাপতি অন্য হতে দাবানল। পঞ্চাশের পাষণ্ড সময়ে কখনো খেয়াল কখনোবা জেদ কোথায় কখন নিজেকে ছুড়ে দিয়েছেন কি কর্মে, কি সাহিত্যে! পিছু হটেননি তিনি। বিহঙ্গ নগরে গিয়ে হয়তো দেখা পেয়েছেন কোনো কৃষিমেয়ের। মুহূর্তে তিনি বলেন— ‘স্বপ্নে আমি কত কি যে দেখি তার কোন শেষ নেই/ প্রতি বাঁকে বাঁকে আসে তারা অজস্র ধারায়/ কখনও গাছ কখনও মাছ কখনও ক্ষিপ্র বিদ্যুৎ চমকের মতন।

পঞ্চাশের দশকে সাপ্তাহিক ইত্তেহাদে কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে কবিতাঙ্গনে তার যাত্রা শুরু। ১৯৬৩-তে কলকাতায় নোঙর ফেলার মধ্য দিয়ে লেখালেখিতে যে আত্মনিয়োগ তা পিক্তর পরে পিক্তর ভারে আজ অশ্রুনদীতে টইটম্বুর। তার বয়ানে— কলকাতায় ঢুকেই পড়ে গেলাম আমি আইডেন্টি ক্রাইসিসে। মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ওখানেই ছিলাম। কলকাতার হেন জায়গা নেই যে আমি পা দিইনি। শক্তি, সুনীল, কমলকুমার তিন প্রিয়’র মধ্যে বেস্ট বলতে কমলকুমারকেই বেছে নিয়েছেন বারবার। ইচ্ছে ছিল কলকাতাতেই থেকে যাওয়ার। কিন্তু বাবার অসুস্থতা তাকে টেনে এনেছে এ-বাংলায়। বাবার মৃত্যুতে মায়ের দিব্যিতে আটকে গেলেন। বিয়েও করলেন। কতকটা ওয়ারিশহীন মৃতদেহের মতো তার সহজ, সরল, সোজাসাপ্টা বয়ান এই জোনাকি সমাজের কাছে। কাহিনীকে ফেনাতে নয়; জ্যোৎস্নাহীন, বৃষ্টিহীন ধূসর ধারায় তিনি বলে যান— কুলাঙ্গার ছেলেদের যা হয় আর কী? আমার বইভাগ্য আর বউভাগ্য দুটোই খুব খারাপ। তিন সন্তানের পর স্ত্রীবিয়োগ। এরপর সেই আবার যাযাবর। জগৎটা তিনি দেখে গেলেন একটা কালস্রোতের মধ্যে। এই স্রোতে কখনো তিনি ভেসেছেন উদাসীনভাবে। যাচ্ছেতাই, বঙ্কিম আর বাহাসের ধার না ধেরে। আবার কখনো এই তিনিই বর্তমান বা ভবিষ্যতের আলাদা ঘরে স্থাণু হয়েছেন।

জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও কীভাবে মূল্যায়ন করেন ফেলে আসা দিনগুলোকে? এই যেমন, কলকাতা গিয়ে শ্মশানে ঘর ভাড়া করে থাকা, মাছ ধরার ট্রলারে চেপে দেশান্তরি হওয়া, দিনের পর দিন নিছক আড্ডা দিয়ে সময় পার করে দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। বেলাল চৌধুরীর টীকাভাষ্যে সরল উত্তর : ‘জীবনে যা যা করেছি, সব-ই ঠিক ছিল। জীবন নিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নেই।’ এ থেকে বোঝা যায়— এ তার অভিমান নয়, নয় না-পাওয়ার ক্ষেদ। আমরা যে যা-ই ভাবি, যত মিথ-ই তৈরি করি তাকে নিয়ে, তিনি নিশ্চিত জানেন গোলাপের সুরভিত সূক্ষ্ম পথ পেরিয়ে এসেছেন তিনি। জাস্ট ঝাড়লণ্ঠনটা নিভে যাবে আর তিনি পৌঁছে যাবেন জলে ঘেরা জলসার দেশে। তার সরল উক্তি- ‘এ বাড়িটায় কেউ থাকে না শুধু হাওয়ায় কুহক/জড়িয়ে আছে পাকে পাকে আইভি লতার আলিফ/লালচে ইটে পড়ন্ত রোদ আর হাহাকার/কেউ থাকে না ও-বাড়িটায় শুধু হাওয়ার কুহক/ও-বাড়িটায় আনাচ কানাচ অলিগলি কোথাও কেউ থাকে না বাড়িটা বেবাক বাউণ্ডুলে/তত্ত্ব তালাশ কেউ করে না শুধু হাওয়ায় কুহক/একটি দুটি গোলাপ চারা দেয় পাহারা রাত্রি দিন/ও-বাড়িটা আমার বুকের গভীর হাওয়া মহল।’

মূলত কুহক-ই তৈরি করতে চেয়েছেন তিনি। কখনো কল্পনার কুহক, কখনো আশার কুহক। মায়ার মাত্রা লেগে আছে তাঁর জীবনের, তথা সাহিত্যের পরতে পরতে। অক্ষরের পর অক্ষর দিয়ে সাজানো তার কাব্যভাষা কখনো অভেদের, ব্যাপকতার। আমাদের হাড়ের ভেতরে তিলতিল করে চুয়ে পড়ে তার সংবেদনশীল রস। মানুষ মরে যায়, কবির মরণ সহসা নয়। সে হানা দেয় উত্তর থেকে দক্ষিণে। কবিতায় চূড়ান্ত বলে কিছু নেই, নেই প্রান্তিক। কাজেই আমরা বিষয়হীন কিন্তু সম্ভাবনাময় দূরের এক মেঘে-চৌকিতে বসে এ কথা বলতেই পারি— জীবিতের চাহিদায় এতদিন যা কিছু পারিনি আমরা মরণের পর মৃতের চাহিদায় চিরজীবী হোক বেলাল চৌধুরী।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads