• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
এই ভিজে বরষায়...

অঝোর বৃষ্টি ছুঁয়ে যায় তারুণ্যের উচ্ছ্বাসকেও। ছবিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তোলা

ছবি : তারেক মাহমুদ

ফিচার

এই ভিজে বরষায়...

  • প্রকাশিত ২২ জুলাই ২০১৮

আন্দালিব আয়ান

‘তুমি যদি না দেখা দাও, কর আমায় হেলা, 

কেমন করে কাটে আমার এমন বাদল বেলা।’ 

বিশ্বকবির ভাবনায় বর্ষা এমনই আবেগ বিরহের কাল। যদিও ‘বর্ষার চিঠি’তে বিশেষ এই ঋতুটিকে বাল্যকালের সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। তার মতে, যৌবনের যেমন বসন্ত, বার্ধক্যের যেমন শরৎ, বাল্যকালের তেমনি বর্ষা। 

ছেলেবেলায় ঘরের প্রতি টান থাকে মানুষের। বর্ষাকালও তেমনি ঘরে থাকার, কল্পনা করার, গল্প শোনার আর ভাইবোন মিলে খেলা করার কাল। কবি বলেছেন, ‘বর্ষার অন্ধকারের মধ্যে অসম্ভব উপকথাগুলোও কেমন যেন সত্যি হয়ে দাঁড়ায়।’ 

অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে অবসরের আমেজ থাকে বাঙালির মনে। যেন কোথাও তার যাওয়ার নেই, যেন কিছুই তার করার নেই। তাই স্মৃতিকাতরতায় ডুবে যায় মানুষ, ভাবে প্রিয় বন্ধু কিংবা মনের মানুষের কথা, কেউ কাঁথা মুড়ি দিয়ে চিন্তার ভেলায় চড়ে বেড়ায় দিনমান, কেউ আবার গল্পগুজবে প্রাণ ফিরে পায়, জমায় তুমুল আড্ডা। বৃষ্টির জলে গা ভিজিয়ে কেউ আবার খুঁজে বেড়ায় শুদ্ধতা। 

বর্ষার জলে ভরে যায় নদী নালা পুকুর, ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয় আম-কাঁঠালের বাগান, ভিজে যায় কাক, কাকবৃষ্টিতে জমে ওঠে আষাঢ়ের গল্প। সবুজ প্রকৃতির মতো এই সময়ে শিশুসুলভ আর কোমল হয়ে ওঠে মানুষের মন। বর্ষার আবরণে বদলে যায় মানুষের জীবন যাপনের ধরনও। 

শহরে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় সবুজ প্রকৃতি কিংবা বর্ষার আসল রূপ দেখা না গেলেও মানুষের জীবনযাত্রায় ঠিকই প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় বর্ষাকাল। দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে কেউ কেউ মেতে ওঠেন খিচুড়ি ইলিশের রসনায়। কেউ যেমন গান শুনেই পার করে দেয় সকাল-সন্ধ্যা, হাল জামানায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও হয়ে উঠেছে সময় কাটানোর অন্যতম অনুষঙ্গ। বিশেষ করে বাদল দিনে ফেসবুকে মানুষের আবেগমাখা স্ট্যাটাসগুলোতে বর্ষার রেশ দেখা যায়। এসব ছাড়াও বিশেষ এই ঋতুতে মানুষের চলাফেরা, পোশাক, ফ্যাশন এবং খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসে। কারো কারো মতে, ঝরঝর বৃষ্টি আর সবুজ প্রকৃতিতে নীল রঙের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ বাড়ে মানুষের। এমন অনেকেই আছেন বৃষ্টির দিনেও যাদের অবসর মেলে না। অবসর আর কর্মব্যস্ততা যা-ই থাকুক, বর্ষাকালে বৃষ্টির মন বুঝেই চলতে হয় সব মানুষকে। তা না হলে এই ভিজে বরষা উপভোগ্য হবে কী করে? 

বর্ষায় সাজ : বর্ষা মানে শুধু ভালো লাগা, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কেননা বর্ষাকালের আর্দ্র পরিবেশ শুধু শারীরিক অস্বস্তিই বাড়ায় না, সাজগোজেরও বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে। এর জন্য নিতে হয় কিছু বিশেষ সতর্কতা। এই সতর্কতা আপনাকে বর্ষায়ও রাখতে পারে স্বতঃস্ফূর্ত আর প্রাণচঞ্চল। 

আর্দ্র এই সময়ে মেকআপ নিয়ে বেশিক্ষণ ফ্রেশ থাকা মুশকিল। তবে ত্বকে আর্দ্রতার মাত্রা স্বাভাবিক রেখেই সাজাতে হবে নিজেকে। অস্বস্তি এড়াতে ওয়াটার বেসড মেকআপ ব্যবহার করাই ভালো। মেকআপে অতিরিক্ত ফাউন্ডেশন ও কনসিল এড়িয়ে যাওয়া ভালো। তবে বেস মেকআপের জন্য অবশ্যই নামি কোম্পানির প্রাইমার ব্যবহার করা নিরাপদ। আর্দ্র আবহাওয়ায় পাউডারের বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। অনুষ্ঠানে গেলে হ্যান্ডব্যাগে পাউডার রাখুন। মাঝে মাঝে একবার পাফ বুলিয়ে নিলেই সাজগোজে ক্লান্তির ছাপ উধাও হবে নিমেষে। 

বর্ষাকালে ওয়াটারপ্রুফ লাইনার ও মাশকারা ব্যবহার করা উচিত। এতে বৃষ্টির পানি লেগে বিপত্তির সম্ভাবনা থাকে না। তবে কাজল ব্যবহার করলে তা ক্রিম বেসড হওয়াই ভালো। রঙের ক্ষেত্রে একটু চুজি হলে বাদামি বা সাদা কাজল পেন্সিল আপনার মাশকারা ও লাইনারকে আরো উজ্জ্বল করবে। বর্ষার মাদকতা নামবে চোখে। একই সঙ্গে আইশ্যাডো অবশ্যই ক্রিম বেসড হবে। হালকা বাদামি, ক্রিমি পিংক, প্যাস্টেল, বেজ রঙের আইশ্যাডো এবারের বর্ষায় ইন ফ্যাশন। অন্যদিকে ব্লাশার রাখুন পাউডার বেজড। তাতে লেপটে যাওয়ার ভয় সবসময় তাড়া করবে না। 

পোশাক : বর্ষার দিনে সুন্দর জামাকাপড় পরবেন না, তা কি হয়? বর্ষায় প্রকৃতির যে মোহময় রূপ ফুটে ওঠে, সেটা তুলে ধরতে পারেন বর্ষার পোশাকে। ফ্যাশন হাউসগুলোও বর্ষার সাজপোশাক কেমন হবে তার নিয়মিত চর্চা করে আসছে গত এক দশক ধরে। বর্ষায় পোশাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে লতাপাতা, ফুল আর প্রকৃতি। বর্ষায় শাড়ি পরার প্রতি অনেকেরই আগ্রহ দেখা যায়। শখের শাড়ি কিংবা নিত্যদিনের শাড়িতে বেছে নিতে পারেন প্রকৃতির রঙ নকশা। সালোয়ার-কামিজেও থাকতে পারে এ ধরনের নকশা। সুতি আরামদায়ক হলেও বৃষ্টিবাদলায় সুবিধাজনক হবে শিফন, জর্জেট, সিল্কের পোশাক। কারণ এ ধরনের কাপড়ে কাদাপানি লাগলেও চট করে শুকিয়ে যায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভালো লাগবে সিল্ক, হাফসিল্ক ধরনের শাড়ি। শাড়ির সঙ্গে হাতাকাটা অথবা ছোট হাতার ব্লাউজ স্টাইলিশ এবং আরামদায়ক হবে। অন্য পোশাকের মধ্যে মানাবে জর্জেটের টপস, কুর্তি, সালোয়ার-কামিজ প্রভৃতি। 

পোশাক গায়ে জড়িয়ে অনুভব করতে পারেন ঋতুটাকেও। নীলের পাশাপাশি সবুজ, কমলা, ধূসর রঙও এখন অহরহ দেখা যায় পোশাকে। 

বর্ষায় জুতা, ব্যাগ হওয়া প্রয়োজন পানি নিরোধক। তা হলে বিড়ম্বনা কিছু মাত্রায় এড়ানো সম্ভব হবে। ফুলবিক্রেতা শিশুর হাতের বেলি, কদম যেন শহরজুড়ে ছড়িয়ে দেয় বর্ষার বার্তা। এই ফুল জড়িয়ে নিতে পারেন আপনার চুলেও। খোলা কিংবা বাঁধা যে কোনো চুলের সাজেই ফুল আনবে বর্ষার আমেজ। হাতে কিংবা মাথায় শুধু বেলি ফুলের মালা পেঁচিয়েও হয়ে উঠতে পারেন নজরকাড়া। 

সাজপোশাকে বর্ষার ছোঁয়া আনার পাশাপাশি ঘরের কোণেও বর্ষাযাপনের আয়োজন করতে পারেন। এই ঋতুতে দরজার সঙ্গে ঝুলিয়ে দিন উইন্ড চাইম। ঝড়বাতাসে উইন্ড চাইমের শব্দ বাড়িতে আনবে বর্ষার আমেজ। বর্ষায় জানালার ধারে লতানো গাছ লাগিয়ে দিতে পারেন। বারান্দার ছোট ফুলবাগানে কিংবা জানালার সামনে দুটি চেয়ার বসিয়ে দিন। রিমঝিম বৃষ্টিতে সেই জানালার সামনে বসে পড়তে পারেন পছন্দের কোনো গল্পের বই কিংবা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শুনতে পারেন গান। বৃষ্টি আর খিচুড়ি যেন একে অপরের পরিপূরক। 

আর শুধু ঘরেই কেন, বর্ষাকে উপভোগ করতে পারেন প্রকৃতির সান্নিধ্যেও। ছুটির দিনে ঘুরে আসতে পারেন ঢাকার আশপাশের প্রকৃতিঘেরা কোনো জায়গা থেকে। বৃষ্টিভেজা বিকালে রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রকৃতির সান্নিধ্যেও জুড়িয়ে যাবে চোখ।

মডেল : কামরুন নাহার

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads