• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
ষোলো আনাই মিছে

মি. বয়ি

ছবি : বাংলাদেশের খবর

ফিচার

ষোলো আনাই মিছে

  • প্রকাশিত ১৮ আগস্ট ২০১৮

নৌকাডুবির সময় সাঁতার না জানলে জীবনের ষোলো আনাই মিছে মনে হয়। তেমনি বিদেশ বিভুঁইয়ে ভাষার যোগাযোগ করতে না পারলেও দম আটকে আসে। চীন থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন এক পর্যটক। যিনি একটাও ইংরেজি শব্দ বলতে পারেন না। তার সঙ্গে ইশারায় যোগাযোগ করেছেন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

ফোনের ওপাশ থেকে কথা বললেন রিকশাওয়ালা, ‘হ্যালো ভাই, এক বিদেশি ভদ্দরলোক আইছে। বোকা টাইপের। আবোল-তাবোল কয়। আপনার নাম্বার দেখায়।’

আপনারা এখন কোথায়?

‘শাহবাগে। জাদুঘরের সামনে।’

ওখানেই থাকতে বলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে জাতীয় জাদুঘরের সামনে হাজির হলেন এই প্রতিবেদক। সেখানে দেখা হলো বয়ি নামের চীন দেশের ওই লোকটার সঙ্গে। তাকে ঘিরে উৎসুক জনতার জটলা বেধে গেছে। পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক জনতা সামাল দিচ্ছেন। তিনি অনুযোগ করলেন, ‘একটাও ইংরেজি বলতে পারেন না। শুধু আপনার ফোন নাম্বারটি দেখায়।’  একই অনুযোগ রিকশাওয়ালার।

প্রতিবেদকের সঙ্গে তখন ছিলেন কাজী জিয়া শামস নামের এক লেখক। তার সহযোগিতায় বয়িকে জনতার জটলা ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। বাংলাদেশে আসার আগে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে ইন্টারনেটে যোগাযোগ করেছিলেন বয়ি। জানিয়েছিলেন, তিনি বাংলাদেশে আসবেন। এসে দেখা করবেন, ব্যস এতটুকুই।

কিন্তু আসার পর তাকে নিয়ে এতটা ঝক্কি পোহাতে হবে, ধারণার বাইরে ছিল। বয়ি কেবল ইশারায় বলতে পারেন। হাত তুলে পাঁচ আঙুল এলোমেলো করে জানান, কিছুই বুঝতে পারছেন না। ইশারায় তাকে জানানো হলো, তার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি দুই হাত পেটে চালান করেন। ডানে-বাঁয়ে নেড়ে জানান, ক্ষিধে নেই।

রাস্তা পার হয়ে বয়িকে নিয়ে যাওয়া হলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সেখানে শান্ত হয়ে বসলেন। বাদামওয়ালা, চাওয়ালা এলো। এরাও কৌতূহলী। বয়িকে বাদাম খেতে দেওয়া হলো। চাও খেলেন। আরো একটু সহজ হয়ে এলেন। ততক্ষণে ইশারার ভাষাটা জমে উঠেছে। বয়ি বোঝাচ্ছেন, উদ্যানটা ভালো লেগেছে তার। তিনিও এমন গাছপালার মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন। মোবাইল খুলে নিজের বাড়ির ছবি দেখালেন। মানচিত্র দেখে বোঝা গেল তিনি থাকেন দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের গুইঝো প্রদেশের রাজধানী গুইয়াং শহরে। ইশারায় বোঝালেন, তার পেশা ছিল শিক্ষকতা। সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন।

বয়ির ব্যাপারে কাজী জিয়া শামস বললেন, ‘চীনারা নিজেদের ভাষা নিয়ে গোঁড়া, সেটা জানতাম। তাই বলে ভিনদেশে যাওয়ার আগে একটাও ইংরেজি শব্দ শিখে নেবে না, এটা অবাক করার মতো।’

বয়িকে ইশারায় জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করা হলো, এমন বিদঘুটে পরিস্থিতিতে এর আগে তাকে কখনো পড়তে হয়েছে কি-না। জবাবে তিনি হাত নাড়লেন। প্রশ্নটা ঠিকভাবে বুঝেছেন কি-না, সেটাও স্পষ্ট নয়। তবে মুখ ও ঠোঁটের দিকে ইঙ্গিত করে যা বোঝাতে চাইলেন, তার সরল অনুবাদ করলে দাঁড়ায়- ‘কখনো কখনো ভাষার যোগাযোগ করতে না পারলে তার কাছে জীবনের ষোলো আনাই মিছে মনে হয়।’

আলাপের একপর্যায়ে বয়ি ইশারা করলেন, তার ওয়াইফাই সংযোগ প্রয়োজন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ত্যাগ করে তার জন্য নিরাপদ আশ্রয় এবং ওয়াইফাই সংযোগের ব্যবস্থা করা হলো। পরে তার সঙ্গে যোগাযোগটা আরো সহজ হয়ে গেল। বয়ি লিখলেন, চীনা ভাষায়। সেটাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করল গুগল।

বয়ি জানালেন, তিনি পেশায় শিক্ষক ছিলেন। কিছুদিন আগে অবসর নিয়েছেন। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, অবসরের পর বিশ্ব ঘুরে বেড়াবেন। এক্ষেত্রে ভাষা একটি সমস্যা। কিন্তু তার সাহস অফুরন্ত। বললেন, ‘ভাষাগত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় আমাকে। তখন জীবনকে মিছে মনে হয়। কিন্তু তারপরও আমি সাহস করি ভ্রমণের। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করি। অবসর সময়টায় অভিজ্ঞতা অর্জনের কাজে নেমেছি।’

বয়ি জানালেন, তিনি একা মানুষ। সংসারে কেউ নেই। সহজ জীবন ভালোবাসেন। ভ্রমণ এবং ছবি তোলা শখ। ক্যামেরা খুলে অনেকগুলো ছবিও দেখালেন। তাকে একরকম বলা যায় সুখী মানুষ। বললেন, ‘প্রতিদিন নিজের রান্না নিজেই করি। ফুল গাছ লাগাই। বাগানের যত্ন করি। বিড়াল-কুকুর পুষি। মুরগির খোঁয়াড় দেখি। পুকুরে মাছ চাষ করি। অফুরন্ত অবসরে এক কাপ কফি অথবা এক কাপ চা খাই। গান শুনি। এই তো, চলে যাচ্ছে জীবন।’

বয়ি বাংলাদেশে থেকেছিলেন বেশ কিছুদিন। প্রথমে দেশের উত্তর এলাকা ঘুরেছেন। পরে গেছেন দক্ষিণে। শেষদিকে ঢাকায় ফিরে আরো কিছুদিন ছিলেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads