• মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫
ads
সন্তান যখন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার্থী

ঢাবি’র ভর্তি পরীক্ষা চলছে...

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

সন্তান যখন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার্থী

  • মেহেদী হাসান গালিব
  • প্রকাশিত ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ছোটবেলায় আকাশের মেঘ কাটিয়ে এরোপ্লেন উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে পাইলট হওয়ার ইচ্ছে জাগেনি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আত্মীয়স্বজন কিংবা পাড়া-প্রতিবেশীদের কেউ যখন জিজ্ঞেস করত- ‘বাবু, বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও?’ বুকভরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর আসত, ‘পাইলট।’ কেউ আবার খারাপ লোকদের খতম করে শান্তির জন্য কাজ করে যাওয়া সিনেমার অ্যাকশন মুভির অ্যাডভেঞ্জারাস সেনা কর্মকর্তার মতো হতে চাইত। অনেকেই আবার সহজ-সরল উত্তরে বলে দিত, ‘আমি একজন ভালো মানুষ হতে চাই।’

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভেতরে জন্ম নেওয়া ইচ্ছেগুলো পাল্টাতে থাকে। সমাজ ও পরিবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। বড় হয়ে হতে হবে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার। ধীরে ধীরে ছোট্ট এই গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায় স্বপ্নালু মন। ভবিষ্যতে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে দিন-রাত কাটিয়ে দিই বইয়ের ভাঁজে মুখগুঁজে। তবে একটা পর্যায়ে এসে দেখা দেয় বিপত্তি। বাবা-মায়ের ইচ্ছের সঙ্গে দ্বিমত সৃষ্টি হয় সন্তানের স্বপ্নের। বাবা-মা চান তার আদরের সন্তান বড় হয়ে ডাক্তার হবে, মানুষের সেবা করবে। কিন্তু সন্তানের আগ্রহ ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি ও ম্যাথে।

বাবা-মায়ের ইচ্ছে ও সন্তানদের স্বপ্নের এই বিরোধে থমকে যায় অনেকের পড়াশোনা। হতাশ হয়ে পড়ে অনেকেই। পড়াশোনার প্রতি জন্ম নেয় এক ধরনের অনীহা। তাই তো আমাদের আশপাশে এমন অসংখ্য ভালো শিক্ষার্থীকে দেখতে পাওয়া যায়, যারা পড়াশোনার খেই হারিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে যায় প্রতিযোগিতার মঞ্চে।

স্বপ্ন দেখা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বাবা-মায়ের উচিত সন্তানদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া। কারণ একমাত্র আপনার সন্তানই বুঝতে পারবে সে কোন কোন বিষয়ে দক্ষ এবং তার কোন পথটিকে বেছে নেওয়া উচিত। তবে এক্ষেত্রে সন্তানরা ভুল সিদ্ধান্ত নিলে বাবা-মায়ের উচিত হবে সন্তানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা। জোর করে নিজেদের ইচ্ছা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ফল কখনই ভালো হয় না। তাই দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার আগে অনেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার এই সময়টায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো ধৈর্য। কোচিংয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার ফল শুনে অনেক অভিভাবকই সন্তানদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন, ভালো ফলের জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তীতে এর ফল হয় ঠিক উল্টো। নতুন শহরে এসে নিজেকে খাপখাইয়ে নেওয়া, পরিবার ছেড়ে একা দূরে থাকায় নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলা, পড়াশোনার বিশাল সিলেবাসে প্রথমদিকে অনেকেই হিমশিম খেয়ে যায়। এটা একেবারেই স্বাভাবিক একটি বিষয়। তাই বাবা-মায়েদের উচিত সন্তানকে খাপ-খাওয়ানোর জন্য সময় দেওয়া। তা না করে উল্টো ভালো ফল করার বোঝা চাপিয়ে দিলে সন্তান মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে একটা পর্যায়ে সে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অনেকেই আসেন রাজধানী ঢাকায়। বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস এই রঙিন শহরে যেমন রয়েছে জীবনে সফল হওয়ার যাবতীয় সরঞ্জাম ও প্রতিযোগিতার পরিবেশ, তেমনি রয়েছে বিপথে যাওয়ার অসংখ্য ফাঁদ। নতুন শহরে এসে অনেকের ঘোরাঘুরি করতেই কেটে যায় অনেকটা সময়। জাদুর শহরখ্যাত ঢাকার প্রাণচাঞ্চল্য অনেককেই আকর্ষণ করে। ফলস্বরূপ তারা বিচ্যুত হয়ে পড়ে নিজেদের মূল লক্ষ্য থেকে। তাই আপনার সন্তান কোন পথে হাঁটছে, কাদের সঙ্গে মিশছে, নিয়মিত পড়াশোনা করছে কি না এই বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিজের জীবনের একটা গল্প বলি। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার তখন মাত্র এক মাস বাকি। নিজের প্রস্তুতি যাচাই করার জন্য একটি কোচিং সেন্টারে পরীক্ষা দিলাম। দুদিন পর নাম্বার হাতে এলো। আমি পেয়েছি ৩২। ৫০ কিংবা ১০০ নাম্বারের মধ্যে নয়, একেবারে ৬০০ নাম্বারের মধ্যে। নাম্বার দেখে প্রচণ্ড হতাশ হয়ে গেলাম! ফোন করলাম আম্মুকে। আম্মু সব শুনে বললেন, ‘এসব নিয়ে তুমি একদম ভাববে না। এই পরীক্ষাগুলোতে যে ভুলগুলো হচ্ছে, যে টপিকগুলো তোমার আরেকটু পড়া দরকার, সেগুলো খুঁজে বের করে সেদিকে বেশি সময় দাও। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখ, এসব নাম্বারের ওপর নয়।’ আম্মুর বলা সেই কথাগুলো আশ্চর্যজনকভাবে আমার ভেতরে এক ধরনের শক্তির সঞ্চার করেছিল। কিছুক্ষণ আগেই যেই নাম্বার আমার আত্মবিশ্বাসকে তলানিতে নামিয়ে দিয়েছিল, সেখান থেকেই আমাকে সাহস জোগাতে শুরু করল নতুন করে পড়াশোনা শুরু করার।

অভিভাবক হিসেবে আপনাকে মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার এই সময়টা একজন শিক্ষার্থীর জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টায় শিক্ষার্থীদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে ভয়, চিন্তা, হতাশা আর উদ্বিগ্নতায়। তাই বাবা-মা হিসেবে আপনার উচিত সন্তানের দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। শুধু সন্তানের পড়াশোনাতেই নয়, সন্তানের মানসিক অবস্থার দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। আপনাদের হতে হবে বন্ধুসুলভ ও আন্তরিক। বিশ্বাস রাখতে হবে নিজের সন্তানের ওপর। তবেই না আপনার সন্তান আপনার বিশ্বাস ও সম্মান রক্ষার্থে চেষ্টা চালিয়ে যাবে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে।

লেখক : শিক্ষার্থী

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads