• রবিবার, ২৬ মে ২০১৯, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
বাংলাদেশের সামাজিক উদ্যোগ বিশ্বসেরা!

৬৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের যুব-নেতৃত্বের উদ্যোগ ‘সেভ পিরিয়ড’ প্রথম হয়েছে

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

বাংলাদেশের সামাজিক উদ্যোগ বিশ্বসেরা!

  • প্রকাশিত ২২ অক্টোবর ২০১৮

বিশ্বজুড়ে যুবদের গৃহীত বিভিন্ন জনপ্রিয় ও কার্যকর সামাজিক উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ব্রিটিশ কাউন্সিল। অ্যাকটিভ সিটিজেনস প্রোগ্রামের আওতায় বিশ্বের ৬৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের যুব-নেতৃত্বের উদ্যোগ ‘সেভ পিরিয়ড’ প্রথম হয়েছে। সাড়া জাগানো প্রকল্পটির অন্যতম উদ্যোক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান রবিন গত ২৪ অক্টোবর  লন্ডনে এ সম্মানজনক পুরস্কার গ্রহণ করেন। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সোহানুর রহমান


‘সেভ পিরিয়ড’ কী এবং কেন?

নারীদেহের একটি নিয়মিত ও স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ার নাম পিরিয়ড। প্রজনন সম্পর্কিত এ প্রক্রিয়াটি প্রতি মাসে ঘটে বলে বাংলায় সচরাচর এটিকে মাসিক বলে ডাকা হয়। বিষয়টি গর্বের হলেও পিরিয়ডের মতো একটা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক বিষয় নিয়ে সমাজে রয়েছে বিস্তর লুকোচুরি। পিরিয়ড, মেনস্টুয়েশন বা মাসিক- এই শব্দগুলো জনসম্মুখে উচ্চারণ করতে বেশিরভাগ মেয়েই এখনো লজ্জা আর সংকোচ বোধ করেন। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) তথ্যানুযায়ী, জীবনের প্রথম মাসিকের অভিজ্ঞতা অনেক  মেয়ের কাছেই ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা। কারণ এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো ধরনের তথ্য থাকে না। এবং মায়েরা পর্যন্ত নিজ কন্যাসন্তানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন না। পরিবারের অন্য সদস্য, বিদ্যালয় বা অন্য কেউ তো দূরের কথা, মায়েরা পর্যন্ত মাসিক নিয়ে কথা বলেন না মেয়ের সঙ্গে। কিন্তু এ সময়ে যে মেয়েদের পরিচর্যা, যত্ন, পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন সেটি পরিবার জানেও না। সমাজে এখনো বিষয়টি একটি অচ্ছ্যুৎ বিষয়। এই সামাজিক ট্যাবুটি পুষে না রেখে বিষয়টি নিয়ে গ্রামাঞ্চলের নুি-মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য ও কিশোরীদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা আর সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে কিশোরীদের সুরক্ষিত করতে একদল প্রশিক্ষিত তরুণের সামাজিক উদ্যোগের নাম ‘সেভ পিরিয়ড’। নীরবতা ভেঙে আওয়াজ তুলতে গৃহীত উদ্যোগটি যেমন দেশের ভেতর হয়েছে জনপ্রিয়, তেমনি জাতি-রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে জিতে নিয়েছে আন্তর্জাতিক সেরা উদ্যোগের স্বীকৃতি।

যেভাবে যাত্রা শুরু

শুরুর গল্পটা একটু বলা যাক। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় ঢাকায় অ্যাকটিভ সিটিজেনস ইয়ুথ লিডারশিপ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডেমোক্রেসি ওয়াচ। সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে স্বেচ্ছাসেবায় আগ্রহী তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের স্থানীয়ভাবে এসব কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত করার একটা সুযোগ করে দেওয়াই এ প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। চার দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের শেষ দিনে ৩২ জন অংশগ্রহণকারী সবাই একটি করে সমস্যা সমাধানে আইডিয়া তুলে ধরে এবং ভোটাভুটির মাধ্যমে অন্যতম সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে নির্বাচিত হয় ‘সেভ পিরিয়ড’। এই উদ্যোগটির মাধ্যমে ঢাকার দুটি স্কুলের ১ হাজার ৬৮২ কিশোরী এবং তাদের কাছেপিঠের মানুষজনকে সচেতন করা হয়েছে। ওয়ার্কশপের পাশাপাশি ছিল আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড বিতরণ কর্মসূচিও। মেয়েদের মাসিক বিষয়ে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে ট্যাবুটা ভাঙার উদ্যোক্তা ফাতেমা, জুঁই, ইমরুল, হাফিজা, তুহিন, নাজনীন আর রবিনরা তখনো কি জানত তাদের এই সেভ পিরিয়ড সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে একদিন বিশ্ব জয় করে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে! ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের হেড অব সোসাইটি তৌফিক হাসান জানান, অ্যাকটিভ সিটিজেনস প্রশিক্ষণ একজন তরুণের মাঝে আ্ত্তজিজ্ঞাসা ও আ্তোপলব্ধির সঞ্চার করে। যার প্রেষণাই তাকে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে সম্পৃক্ত এবং বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত করে থাকে। বিশ্বের ৬৮টি দেশে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় এই প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়ে আসছে।  ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ২৭ হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণী অ্যাকটিভ সিটিজেনস ইয়ুথ লিডারশিপ ট্রেনিংয়ে অংশ নিয়েছেন। 

বিশ্বসেরা উদ্যোগের স্বীকৃতি

প্রশিক্ষিত তরুণদের গৃহীত সেরা উদ্যোগগুলোকে স্বীকৃতি দিতে সম্প্রতি ব্রিটিশ কাউন্সিল অ্যাকটিভ সিটিজেনস সোশ্যাল অ্যাকশন প্রজেক্ট কম্পিটিশন ২০১৮ নামে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। যেখানে গোটা বিশ্ব থেকে জমা পড়া অসংখ্য আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে মাত্র পাঁচটি সামাজিক উদ্যোগ প্রকল্পকে বাছাই করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাইনাল ভোটাভুটির জন্য পাঠানো হয়। অ্যাকটিভ সিটিজেনের গ্লোবাল ফেসবুক পেজ থেকে প্রকাশিত পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, আলবেনিয়া ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের সামাজিক উদ্যোগ সেভ পিরিয়ড সর্বাধিক ভোট পেয়ে জয়লাভ করে। এই পুরস্কার অর্জনের অংশ হিসেবে প্রকল্পটির অন্যতম উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান রবিন লন্ডনে অবস্থিত ব্রিটিশ কাউন্সিল হেডকোয়ার্টারে অ্যাকটিভ সিটিজেনসের গ্লোবাল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ এবং বিশ্বমঞ্চে এ সামাজিক উদ্যোগটি উপস্থাপনের সুযোগ লাভ করেন। এরকম গ্লোবাল ইভেন্টগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, তরুণ স্বেচ্ছাব্রতীদের গৃহীত উদ্যোগের শিখন বিনিময় এবং নেটওয়ার্কিং তৈরি করা। কেমন ছিল সেই দিনটি? জানতে চাইলে রবিন বলেন, ‘গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে গিয়ে নিজের উদ্যোগ এবং দেশকে উপস্থাপন করতে পারা নিঃসন্দেহে আমার জন্য অনেক বড় একটি সুযোগ ও গর্বের বিষয়। প্রথমে তো বিশ্বাসই হচ্ছিল না পুরো ব্যাপারটা। এত দ্রুতই সবকিছু হয়ে গেল বুঝেই উঠতে পারিনি। স্বপ্নের মতো ঘটে যাচ্ছিল সব। তিনদিনের প্রোগ্রামে লন্ডনে গিয়েছিলাম, যেখানে আমি ছাড়াও আরো ১৫টি দেশ থেকে ৫০ জন তরুণ অংশ নিয়েছিল। প্রথম দুদিন আমাদের অরিয়েন্টেশন ও প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে কেটে গেল। তৃতীয় দিনে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ। যখন আমি আমাদের সামাজিক উদ্যোগ প্রকল্পটি (স্যাপ) উপস্থাপন করতে যাব, তখন পিনপতন নীরবতায় আমার খানিকটা ভয় ভয় লাগছিল।  মিথ্যে বলব না, পুরো হলরুম ভর্তি বিভিন্ন দেশের মানুষ দেখে বুক কিছুটা দুরু দুরু করছিল এই ভেবে যে, আমি পারব তো দেশের মান রাখতে? নিজেকেই নিজে সাহস দিয়ে মনে মনে বললাম, রবিন তুই পারবি, তুই-ই আজ বাংলাদেশ! নিজেকে নিজের দেওয়া সাহসে কাজ হলো কি-না জানি না তবে যখন আমার দেওয়া প্রেজেন্টেশনের পর সর্বাধিক সময় ধরে চলা মুহুর্মুহু করতালির শব্দ শুনে স্বস্তি পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, যাক দেশের মানটা ভালোভাবেই রাখতে পেরেছি। ওই সময়ের অনুভূতিটা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।’

রবিন আরো বলেন, ‘আমাদের  প্রেজেন্টেশনের পর পাশেই স্টলের ব্যবস্থা ছিল, যাতে আমরা বিশদভাবে একে অপরের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে পারি। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, মেক্সিকো, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা আমার স্টলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন আর আমাদের সফলতার খুঁটিনাটি বিষয়ে আগ্রহভরে জানতে চাচ্ছিলেন। আমাদের সেভ পিরিয়ড উদ্যোগটা যে কতটা কার্যকর, ঠিক তখন বুঝতে পারলাম যখন ইথিওপিয়ার একজন তরুণ প্রতিনিধি তার দেশে এ প্রকল্পটি চালু করতে আমার কাছে অনুমতি ও সাহায্য চাইলেন। কারণ ইথিওপিয়ায় এ সমস্যাটি  আমাদের দেশের চেয়ে নাকি আরো প্রকট। আমাদের একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ যা কি-না এখন দেশের গ্লি পেরিয়ে অন্য দেশের মানুষের উপকারে আসবে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে ভেবে আমার বুকটা গর্বে ভরে উঠেছিল। এই প্রজেক্টটি এখন আরো বড় পরিসরে করতে চাই, যাতে আমরা অনেকের কাছে পৌঁছে যেতে পারি।’ মেহেদী হাসান রবিন বলছিলেন, আমাদের দেশ এখন একটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সব প্রজন্ম সবকিছু পায় না। এক প্রজন্ম কষ্ট করে, অন্য প্রজন্ম তার ফল পায় এবং তা আরো ত্বরান্বিত করে। যেমন আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম তাদের জীবন দিয়ে এনেছেন আমাদের স্বাধীনতা। এখন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে এ দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার। পরবর্তী প্রজন্ম যা নিয়ে সুখে থাকবে এবং আরো এগিয়ে যাবে। আমাদের দেশের তরুণদের হাত ধরেই এই পরিবর্তন আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads