• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬
ads
বাংলাদেশের বনাঞ্চল

সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

বাংলাদেশের বনাঞ্চল

  • প্রকাশিত ২৮ অক্টোবর ২০১৮

বন বলতে আমরা বুঝি প্রাকৃতিক উপায়ে সংরক্ষিত বৃক্ষরাজি, পশুপাখি, প্রাণচক্রের এক অবারিত লীলাভূমি। একদিন এ পৃথিবী আচ্ছাদিত ছিল ঘন অরণ্যে। মানুষ ও প্রকৃতির সহ-অবস্থান ছিল এ ভূমিতে। আজ মানুষ প্রকৃতি থেকে আলাদা হয়ে গেছে, প্রকৃতিকে শাসন-শোষণ করে একেবারে ছিবড়ে বানিয়ে ফেলছে। এ কথা সত্য, মানুষকে টিকে থাকতে হলে প্রকৃতির ওপর নির্ভর করতেই হয়। প্রকৃতি থেকেই আহরণ করে সে যাবতীয় সম্পদ, খাদ্য, বাসস্থানের সরঞ্জাম। কিন্তু মানুষকে এও বুঝতে হবে প্রকৃতি না থাকলে সেও থাকবে না। লোভ-আকাঙ্ক্ষায় মানুষ প্রকৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বনভূমি কেটে সাফ করে ফেলছে। উজাড় হয়ে গেছে অসংখ্য বন। ফলে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণী। পর্যাপ্ত বন যদি না থাকে, একদিন মানুষও বিলুপ্ত হয়ে যাবে এ সভ্যতা থেকে। গাছের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক একেবারেই নিবিড়। গাছ যে শ্বাস ছাড়ে আমরা সেই শ্বাস নিই; আমরা যে শ্বাস ছাড়ি গাছ সেই শ্বাস নেয়।

প্রতিদিন বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা, কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না গ্রিনহাউস কার্বন নিঃসরণ। গলে যাচ্ছে হিমবাহ, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। আমাদের মতো সমুদ্রতীরবর্তী নিম্নভূমির জন্য এ বড় বিপজ্জনক খবর। একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার, আমাদের আছে মাত্র ১৭ শতাংশ। কোনোভাবেই বনভূমি বাড়ানো যাচ্ছে না; বরং দিন দিন কমছে বনের সংখ্যা। জনসংখ্যা বাড়ছে, মানুষ হানা দিচ্ছে প্রকৃতির দুর্গম অঞ্চলে। যে সুন্দরবন ছিল সুরক্ষিত, সেই সুন্দরবনও এখন মানুষের অধিক ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বনভূমি। সেখানেও গড়ে উঠছে ঘনবসতি। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে কক্সবাজারের বিশাল বনভূমির ক্ষতি হয়েছে। এর সঙ্গে বনদস্যুরা তো আছেই, যারা চুরি করে গাছ কেটে বিক্রি করছে দেদার। আশার কথা, এতসব প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বাংলাদেশ সরকার বন সংরক্ষণে বিশাল বিপুল কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে। গড়ে তোলা হচ্ছে অনেক জাতীয় উদ্যান। জাতীয় উদ্যানগুলো পরিচর্যা করা হচ্ছে নিবিড় পর্যবেক্ষণে। শুধু বন নয়, বন্যপ্রাণী রক্ষার ব্যাপারেও বন মন্ত্রণালয় এখন তৎপর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বৃক্ষরোপণ মৌসুমে ৩০ লাখ শহীদের জন্য ৩০ লাখ গাছ রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। পাশাপাশি আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে গাছ ও পরিবেশ সম্পর্কে। গড়ে তোলা হচ্ছে গ্রামীণ ও সামাজিক বনাঞ্চল। অন্যরা যেমন বলে- প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, আমাদের বলতে হবে— বন বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। বন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, তা প্রাণের আধার। বন ও পরিবেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যেন বিকেন্দ্রীকরণ না হয়, বরং হোক আত্তীকরণ। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য, লও হে নগর...। বাংলাদেশের বনাঞ্চলের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, বন সংরক্ষণ ও পরিচর্যায় আমাদের করণীয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজনটি সাজিয়েছেন সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন ও কামরুল আহসান

বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন

সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি, যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলির অন্যতম। গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দুই জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনাজুড়ে বিস্তৃত। বিশ্বের সর্ববৃহৎ তিনটি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের একটি হিসেবে গঙ্গা অববাহিকায় অবস্থিত সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান যথেষ্ট জটিল। বর্তমানে মোট ভূমির আয়তন ৪ হাজার ১৪৩ বর্গ কিলোমিটার (বালুতটসহ) এবং নদী, খাঁড়ি ও খালসহ বাকি জলধারার আয়তন ১ হাজার ৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে পড়ে, যা বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং সমগ্র বনভূমির প্রায় ৪৪ শতাংশ। সুন্দরবনের ওপর প্রথম বন ব্যবস্থাপনা বিভাগের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে। ১৯৬৫ সালের বন আইন (ধারা ৮) মোতাবেক সুন্দরবনের একটি বড় অংশকে ১৮৭৫-৭৬ সালে সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। পরবর্তী বছরে বাকি অংশও সংরক্ষিত বনভূমির স্বীকৃতি পায়। ১৯৯৭ সালে সুন্দরবন ইউনেস্কোর ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

বাংলায় সুন্দরবনের আক্ষরিক অর্থ সুন্দর জঙ্গল বা সুন্দর বনভূমি। সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে, যা সেখানে প্রচুর জন্মায়। আবার এমন ব্যাখ্যাও হতে পারে যে, এর নামকরণ হয়েছে ‘সমুদ্র বন’ বা ‘চন্দ্র-বান্ধে’ থেকে। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। এ বনভূমির প্রায় ৩২ হাজার ৪০০ হেক্টর এলাকাকে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সুন্দরবনে দুই ধরনের জীবমণ্ডলের অস্তিত্ব দেখা যায়— স্বাদুপানি জলাভূমির বনাঞ্চল এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। উদ্ভিজ্জ  সুন্দরবনের গাছপালার অধিকাংশই ম্যানগ্রোভ ধরনের এবং এখানে রয়েছে বৃক্ষ, লতাগুল্ম, ঘাস, পরগাছা এবং আরোহী উদ্ভিদসহ নানা ধরনের উদ্ভিজ্জ। বিশ্বের প্রায় ৫০টি প্রকৃত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে কেবল সুন্দরবনেই আছে ৩৫টি প্রজাতি। সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার লবণাক্ত পানির বনভূমিতে গেওয়া, গরান, কেওড়া, ওড়া, পশুর, ধুন্দুল, বাইন এবং অন্যান্য ঠৈসমূলবাহী উদ্ভিদ প্রধান।

সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আবাস। এ ছাড়া এখানে প্রায় ৫০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩২০ প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখি, ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর এবং প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ আছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়া সুন্দরবনের উল্লেখযোগ্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে রয়েছে চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, রেসাস বানর, বন বিড়াল, লিওপার্ড, সজারু, উদ ও বন্য শূকর। এ বনের অধিকাংশ পাখিই স্থানীয়। পাখিসম্পদে উৎকর্ষ সুন্দরবনে কাঠঠোকরা, ভগীরথ, পেঁচা, মধুপায়ী, বুলবুল, শালিক, ফিঙে, বাবুই, ঘুঘু, বেনে বৌ, হাঁড়িচাঁচা, ফুলঝুরি, মুনিয়া, টুনটুনি বক, সারস, হাড়গিলা, কাদা-খোঁচা, লেনজা ও দোয়েলসহ রয়েছে নানা ধরনের ছোট ছোট গায়ক পাখি। সুন্দরবন এলাকায় দিন দিন জেলে বেড়ে যাওয়ায় মৎস্যসম্পদ দ্রুত কমে যাচ্ছে। তবে বিষপ্রয়োগে মাছ শিকারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। মধু সংগ্রাহক মৌয়ালরা সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে বনের গভীরে ঢুকে মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করে।

বাংলাদেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৫১ শতাংশজুড়ে সুন্দরবন। এই বন থেকে আসা মোট আয়ের অবদান প্রায় ৪১ শতাংশ এবং কাঠ ও জ্বালানি উৎপাদনে অবদান প্রায় ৪৫ শতাংশ। অনেক শিল্প (যেমন— নিউজপ্রিন্ট, দিয়াশলাই, হার্ডবোর্ড, নৌকা, আসবাবপত্র) সুন্দরবন থেকে আহরিত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন অ-কাঠজাত সম্পদ এবং বনায়ন উপকূলবর্তী কমপক্ষে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার জন্য উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। উৎপাদনমুখী ভূমিকার পাশাপাশি সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড়প্রবণ বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জনসংখ্যা ও তাদের সম্পদের প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ভূমিকা রাখে।

সুন্দরবন প্রমোদ ভ্রমণের জন্য পর্যটকদের এক আকর্ষণীয় স্থান। এখানকার কটকা, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর এবং টাইগার পয়েন্টে প্রতি বছর প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটে। কটকার অনবদ্য প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং বন্যপ্রাণী ভ্রমণকারীদের জন্য খুবই আকর্ষণীয়। এখানে বন বিভাগ পরিচালিত একটি ডাকবাংলো এবং একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে। হিরণ পয়েন্টেও আছে পর্যটকদের জন্য অতিথি ভবন এবং একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। দুবলার চর একটি ছোট দ্বীপ হলেও এর সমুদ্রসৈকত অতি মনোরম।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads