• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬
ads

ফিচার

বাংলা টাকার ইতিহাস

  • কামরুল আহসান
  • প্রকাশিত ১১ নভেম্বর ২০১৮

‘মুদ্রা বা টাকা নির্বাক নয়, তা ইতিহাসের কথা বলে। টাকা কেবল বিনিময়ের মাধ্যম নয়, এটি ইতিহাস সংরক্ষণেরও একটি মাধ্যম।’ মুদ্রা এক আশ্চর্য সৃষ্টি মানবসভ্যতার। বিনিময়ের সহজ মাধ্যম। মুদ্রা সৃষ্টির আগে পণ্যই ছিল বিনিময়ের মাধ্যম। একটি পণ্য দিয়ে আরেকটি পণ্য নেওয়া হতো। মুদ্রা হলো দুটি পণ্যের মধ্যে সেতুবন্ধ, সঞ্চালক। কালের বিবর্তনে ধাতব মুদ্রা রূপান্তরিত হয়েছে কাগুজে টাকায়। মুদ্রার মধ্যে খোদিত আছে কালের ইতিহাস। মুদ্রার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ধাতব বিশুদ্ধি (মেটালিক পিওরিটি) এবং নির্দিষ্ট তৌলরীতি (ওয়েট স্ট্যান্ডার্ড) থাকে। নির্দিষ্ট তৌলরীতির ভিত্তিতে এবং নির্দিষ্ট ধাতব বিশুদ্ধির ওপর নির্মিত এই ধাতবখণ্ড বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত ও ব্যবহূত হয়। অনেক দেশেরই প্রাচীন কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায়। এখন সেসব দেশের ইতিহাস জানতে হলে আমাদের আশ্রয় নিতে হবে তৎকালীন মুদ্রা ব্যবস্থায়। কারণ মুদ্রা বহন করে পুরাতাত্ত্বিক সাক্ষ্য। মুদ্রায় অঙ্কিত প্রতীক, নকশা ও লেখায় সংযুক্ত ছিল সেই সময়ের রাজবংশের ইতিহাস।

মুদ্রার দুই পিঠের মধ্যে যেটিতে শাসকের পরিচিতি ও ক্ষেত্র বিশেষে প্রতিকৃতি দেখা যায়, সেটি মুখ্য দিক (অবভার্স) বলে স্বীকৃত। তার অপর পিঠে বহুক্ষেত্রেই খোদিত থাকে ওই রাজা বা তার বংশের উপাস্য দেবদেবীর প্রতিকৃতি; এই পিঠটি মুদ্রার গৌণ দিক (রিভার্স) বলে উল্লেখিত হয়। মুদ্রার মুখ্য ও গৌণ দিক থেকে কোনো শাসক বা কোনো রাজবংশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিবিধ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব। মুদ্রার আলোকে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং শিল্পকলা সংক্রান্ত তথ্যও বের করা সম্ভব। ভারতবর্ষের প্রাচীন সভ্যতায় প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের পুরনো মুদ্রা পাওয়া গেছে। তক্ষশিলার ঢিবি অঞ্চল ও কাবুলের নিকটবর্তী চমান-ই-হুজুরীর মুদ্রাভান্ডার আবিষ্কৃত হওয়ায় প্রমাণ পাওয়া যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকে উত্তর ভারতে ধাতব মুদ্রার প্রচলন হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম-চতুর্থ শতকে মুদ্রার ব্যবহার নিয়মিত হয়ে যায়। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ও ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে দেখা যায় শ্রেষ্ঠীরা বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যে যেতেন। শ্রেষ্ঠী বলতে বোঝানো হতো তৎকালীন বণিক শ্রেণি। তারা বিভিন্ন রকম সোনা ও রুপার ধাতব মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। তাতে ধরে নেওয়া যায়, সমগ্র ভারতবর্ষে তখন একটা স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপত্য, পুরাতত্ত্ব নিদর্শন থেকে অসংখ্য ধাতব মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। যেমন- মহাস্থানগড়, ময়নামতি শালবন বিহার এবং উয়ারী-বটেশ্বর থেকে। উয়ারী-বটেশ্বর থেকে যেসব মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে তাতে স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় প্রায় আড়াই হাজার বছর আছে এই বাংলায় মুদ্রার বহুল ব্যবহার ছিল। তবে তখন স্বর্ণমুদ্রা বা রৌপ্যমুদ্রার চেয়ে তাম্রমুদ্রার ব্যবহারই অধিক ছিল। বাংলায় মুদ্রার অধিক প্রচলন শুরু হয় মূলত সুলতানি আমলে। পরবর্তী সময়ে মুঘল আমলে তার ব্যাপকতা বাড়ে। বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শন থেকে সেই সময়ের ছাঁচে ঢালা মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। ইংরেজরা এসেই এ অঞ্চলে প্রথম আধুনিক মুদ্রার প্রচলন করে এবং একই মুদ্রায় সারা ভারতর্ষ একীভূত করে। এর আগে বিভিন্ন রাজা-বাদশার জন্য প্রচলিত ছিল আলাদা আলাদা মুদ্রা ব্যবস্থা। তবে স্বর্ণমুদ্রা বা রৌপ্যমুদ্রার ব্যবহার রাজা-বাদশাহর দেনদরবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বিনিময় প্রথায় নির্ধারিত ছিল কড়ির ব্যবহার। শুনলে আশ্চর্য লাগতে পারে যে, বাংলাদেশের অসংখ্য গ্রামাঞ্চলে পাকিস্তান আমলেও কড়ির ব্যবহার প্রচলন ছিল। এমনকি এখানকার অনেক পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সরাসরি পণ্য বিনিময় করেছে, কোনো মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যম ছাড়া। এর কারণ মুদ্রার অপ্রতুলতা। কড়ির মাধ্যমে তারা তাদের নিজস্ব একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা উদ্ভাবন করে নিয়েছিল। এই দিয়ে স্থানীয় ছোট ছোট দৈনন্দিন লেনদেন চলত। দূরপাল্লার বাণিজ্যের জন্য এ ছিল এক বিরাট প্রতিবন্ধকতা। কারণ এক অঞ্চলের কড়ি অন্য অঞ্চলে অচল ছিল। অন্য অঞ্চলে একক মাধ্যম ছিল স্বর্ণ বা রৌপ্যমুদ্রা। কিন্তু স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার অপ্রতুলতার কারণে বাণিজ্যও সম্প্রসারিত হতে পারছিল না, আবার বাণিজ্য বাড়ছিল না বলে স্বর্ণমুদ্রা বা রৌপ্যমুদ্রারও প্রচলন বাড়ছিল না। এই নিয়ে বাংলা অঞ্চল দীর্ঘকালব্যাপী এক বাণিজ্যমন্দায় কাটিয়েছে। ভারতবর্ষে স্বর্ণমুদ্রার ব্যাপক প্রচলন নেই কেন- এই নিয়ে কার্ল মার্কস তার বিখ্যাত গ্রন্থ পুঁজিতে কোনো একজন লেখকের উদ্ধৃতি ধার করে বলেছিলেন, কারণ, এ দেশের সম্রাটরা তাদের স্বর্ণ মাটিতে পুঁতে ফেলে! সে যাই হোক, তখনো বাণিজ্য এত সুদূরপ্রসারী হয়নি।

মানুষ ছিল মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। মোটামুটি নিজ পরিমণ্ডলে, নিজ অঞ্চলে, দুই চারটি গ্রামে, হাটে-বাজারে-গঞ্জের মধ্যেই তাদের বিনিময় ব্যবস্থা আবর্তিত ছিল। আর পণ্যেরও এত সমাহার ছিল না। একেবারে আধুনিক সময়ে এসে কাগুজে টাকা আবিষ্কারের পর বিনিময়প্রথা সহজ হয়েছে। যতদূর জানা যায়, ১৮৬১ সালে ইংরেজরা প্রথম ভারতবর্ষে কাগুজে টাকার প্রচলন করে।

বাংলাদেশে টাকার প্রচলন শুরু হয় স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ থেকে, এক টাকার নোট ছাপানোর মধ্য দিয়ে। ১৯৭৪ সালের ৩০ মার্চ পর্যন্ত চালু থাকা বাংলাদেশি নোট ছাপা হতো ইন্ডিয়ান সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে। প্রথম দিকে সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশের ব্যাংক নোট মুদ্রণ করা হয়। ১৯৮৯ সালে গাজীপুরে প্রথম টাকশাল তৈরি হয়। এখান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের ব্যাংক নোট মুদ্রিত হতে থাকে।

ভাষাবিদগণের মতানুসারে বাংলা টাকা শব্দটি সংস্কৃত ‘টঙ্ক’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ রৌপ্যমুদ্রা। বঙ্গরাজ্যে সবসময় টাকা শব্দটি যেকোনো মুদ্রা বা ধাতব মুদ্রাকে বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। ১৪ শতাব্দীতে ইবনে বতুতা লক্ষ্য করেছিলেন যে, বাংলা সালতানাতের লোকজন, সোনা এবং রুপার ধাতবকে দিনার না বলে ‘টাকা’ বলত।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads