• সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬
ads
আইনি সীমাবদ্ধতা আর অবকাঠামো জালে শিল্পায়ন

শিল্পায়নে মূল চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ। আর বিদ্যুতের সংযোগ পেতেই সময় লাগে ১৫০ দিন। ছবিটি রূপপুর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

আইনি সীমাবদ্ধতা আর অবকাঠামো জালে শিল্পায়ন

  • জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ১১ নভেম্বর ২০১৮

শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত বিদ্যুৎশক্তি। আর বিদ্যুতের সংযোগ পেতেই বাংলাদেশে চলে যায় ১৫০ দিন। এজন্য প্রায় ৯ দফায় বিদ্যুতের অফিসে গিয়ে ধরনা দিতে হয় সংযোগপ্রার্থীর। বিদ্যুৎ সংযোগ সুবিধায় বাংলাদেশের অর্জন ১০০ পয়েন্টে ৩১-এর কম। আর নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতে ৮ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে শূন্য। ১৯০ দেশের মধ্যে বিদ্যুতে ১৭৯তম অবস্থান নিয়েই মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। ব্যাংকের ঋণ প্রাপ্তিতেও বাংলাদেশের অবস্থান সমসংখ্যক দেশে ১৬১তম। আইনি সীমাবদ্ধতা ও অবকাঠামো সঙ্কটের কারণে বিদেশে বাণিজ্য পরিচালনা করতে সময় লাগে বাংলাদেশের ৩৮ দিন। এ অবস্থায় বাংলাদেশের শিল্পায়নের চাকা চালু রেখে বিদেশ বাণিজ্য সহজীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে অবকাঠামো খাতের বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

সম্প্রতি ব্যবসা সহজীকরণ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ খাতে চরম অব্যবস্থাপনা ছাড়াও নতুন ভবন নির্মাণের অনুমতি পেতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে নতুন ব্যবসা শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে। নতুন ব্যবসায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জমির নিবন্ধন প্রক্রিয়া। ব্যবসায়িক চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সামনে আছে মাত্র একটি দেশের। আর্থিক অসমর্থ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার সূচকেও শেষ দিকে রয়েছে বাংলাদেশ। এসব কারণে ১৯০ দেশের মধ্যে ব্যবসা সহজীকরণে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬তম। বাংলাদেশের চাইতে খারাপ করছে মাত্র ১৫টি দেশ।

কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। গত এক দশকের গড় প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি। অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগও করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণে অর্থ। এরপরও ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি না হওয়ার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সরকারের শীর্ষ মহলকে।

অবশ্য ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ব্যবসা সহজীকরণে শীর্ষ ১০০ দেশের মধ্যে নিয়ে আসার ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ১৫ সদস্যের ন্যাশনাল কমিটি ফর মনিটরিং ইমপ্লিমেন্টেশন অব ডুয়িং বিজনেস রিফর্মস (এনসিএমআইডি) নামে জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। এক ছাতার নিচে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস বিল’ পাস হয় জাতীয় সংসদে। বিদ্যুতের সরবরাহ বৃদ্ধি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি, ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ, যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। ধারাবাহিক উদ্যোগ সত্ত্বেও এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মুখ না দেখায় সফলতা আসছে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্বব্যাংকের তৈরি করা ২০১৯ সালের ডুয়িং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬তম। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৭তম। বহুমুখী উদ্যোগে এক বছরে উন্নতি হয়েছে মাত্র ১ ধাপ। এর আগের কয়েক বছর ধরে ১৭৭ থেকে ১৭৮তম অবস্থানে ওঠা-নামা করেছে বাংলাদেশ।

কারণ জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এবার বিদ্যুৎ প্রাপ্তি, জমির নিবন্ধন ও কর প্রদানের সূচকে বাংলাদেশ কয়েক ধাপ এগিয়েছে। এরপরও এই তিন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তালিকার শেষের দিকে। বড় ধরনের অবনতি হয়েছে নতুন ব্যবসা শুরুর সূচকে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ভিশন ও উদ্যোগের তুলনায় এক ধাপ অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। আইন হলেও ওয়ানস্টপ সার্ভিস কার্যকর হয়নি। ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চলও এখনো আলোচনার টেবিলে আছে। কিছুটা উন্নতি হলেও বিদ্যুতের সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তরিকতা বাড়লে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও তিনি মনে করেন।

বিশ্বব্যাংক জানায়, ১০০ পয়েন্টের মধ্যে ৪১ দশমিক ৯৭ পেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬তম। এ অঞ্চলের শীর্ষে থাকা ভারত ১৯০ দেশের মধ্যে ৭৭তম অবস্থানে আছে। এ অঞ্চলের ভুটান ৮১তম ও শ্রীলঙ্কা ১০০তম অবস্থানে আছে। এ ছাড়া নেপাল ১১০তম, পাকিস্তান ১৩৬তম, মালদ্বীপ ১৩৯তম অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে। সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে একমাত্র মিয়ানমার ১৭১তম অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের পেছনে আছে।

ব্যবসায়িক চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় বাংলাদেশে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯০ দেশের মধ্যে ১৮৯তম। এ সূচকে মাত্র একটি দেশ রয়েছে বাংলাদেশের পেছনে।

১০০ পয়েন্টের মধ্যে এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ২২ দশমিক ২২। পাওনা টাকা আদায় করতে বিভিন্ন দেনদরবারে মোট পাওনার ৬৬ দশমিক ৮০ শতাংশ অর্থ চলে যায়। এতে সময় লাগে ১ হাজার ৪৪২ দিন। আর পাওনা আদায়ে আইনি সক্ষমতার সূচকে ১৮ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশের অর্জন মাত্র সাড়ে ৭। নতুন ব্যবসা শুরু করার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তালিকায় ১৩৮তম। ১০০ পয়েন্টের মধ্যে এ সূচকে অর্জন প্রায় ৮১। ৯টি প্রক্রিয়া পেরুয়ে বাংলাদেশে গড়ে ২০ দিনে নতুন ব্যবসা শুরু করা যায়। ঋণ প্রাপ্তির সুবিধা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬১তম। ১০০ পয়েন্টের মধ্যে এ সূচকে বাংলাদেশের অর্জন মাত্র ২৫। এ খাতে আইনি সক্ষমতা সূচকে ১২ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ৫ পয়েন্ট। ঋণ তথ্যের গভীরতা সূচকে ৮ পয়েন্টের মধ্যে অর্জন শূন্য।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads