• সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
আর দেখা যায় না হস্তচালিত তাঁত

ছবি : বাংলাদেশের খবর

ফিচার

আর দেখা যায় না হস্তচালিত তাঁত

  • প্রকাশিত ২৫ নভেম্বর ২০১৮

আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী অনেক কিছুই কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে। তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ হলো হস্তচালিত তাঁতশিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। এখন আর আগের মতো তাঁতের মাকুর খটখট শব্দে প্রতিবেশী কারো ঘুম ভাঙে না। আগের দিনে এসব অঞ্চলে তাঁতের মাকুর শব্দে মুখরিত থাকত এলাকা পাড়া গ্রাম। এখন আর সেই দিন নেই, তাঁতের শব্দে কারো ঘুম ভাঙে না। এখন সেসব পাড়া-এলাকা নীরব, নিঃশব্দে কাটে। এখানে আর আগের মতো তাঁতের মোটা কাপড় কেউ পরতে চায় না। এখন মিলের তৈরি চিকন কাপড় পরে অভ্যস্ত। এখন আর সেই আগের মতো প্রায় প্রতিটি বাড়িতে তাঁত নেই। বাড়ির প্রতিটি নারী-পুরুষ, ছেলেমেয়ে সবাই মিলে তাঁতের কাজে ব্যস্ত সময় পার করত। নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিন-রাত তাঁতের কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো। এখন আর বেশি সময় ধরে হস্তচালিত তাঁতে কাপড় বোনার কাজ অনেকেই ছেড়ে দিয়েছে। এখন মোটরচালিত তাঁতে কাপড় বুনে থাকে, অল্প সময়ে অনেক বেশি কাপড় বুনে থাকে। যে কারণে আগের মতো আর হস্তচালিত তাঁতের কাপড়ের তেমন চাহিদা নেই।
বাজারের সঙ্গে তালমেলাতে না পেরে হস্তচালিত তাঁতশিল্প বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে। যেখানে একসময় প্রায় প্রতিপাড়ায় একাধিক তাঁতি বাড়ি থাকত। রাত-দিন তাঁতের কারিগররা কাপড় বুনত, আর তাঁতের মাকুর শব্দে আশপাশের লোক ঘুমাতে পারত না। এখন কয়েক গ্রাম ঘুরেও একটা তাঁত বোনা, তাঁতি বাড়ি পাওয়া যায় না। জেলার সব কয়টি উপজেলাতেই কাপড় বোনা তাঁতি বাড়ি ছিল। অথচ কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে সেসব হস্তচালিত কাপড় বোনা তাঁতি বাড়ি।

এখনো অনেক গ্রামে অনেক পাড়ার নাম তাঁতিপাড়া, কিন্তু ওইসব পাড়ায় কেউ তাঁতের কাজ করে না। জেলায় একসময় শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, তোয়ালে, চাদর ইত্যাদি বুননে নাম ছিল। এ অঞ্চলের কাপড়চোপড় দেশের অনেক হাট-বাজারে বিক্রি হতো ভালো মানের হিসেবে। দেশ বিখ্যাত এসব কাপড়চোপড় এখন সেই আগের মতো নেই। এ ছাড়া আগের দিনের সেই হানা, চরকা, কাপড় বোনার কারিগর কিছুই নেই, আছে শুধু গল্প। একসময় জগৎ বিখ্যাত মসলিন কাপড় তৈরি হতো হস্তচালিত তাঁতে। মিহি সুতায় বুনন হতো শাড়ি কাপড়। জেলার প্রায় সব উপজেলাতেই কমবেশি হস্তচালিত তাঁত চালু রয়েছে। ফরিদপুর সদর উপজেলার তাঁতি মাহাবুব বলেন, বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে পারিনি, তাই বাধ্য হয়ে এই পেশায় এখনো জড়িয়ে আছি। এ ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। এমন কোনো পুঁজি নেই, যা দিয়ে অন্য ব্যবসা করে সংসার চালাব। তাই এই পেশায় জড়িয়ে আছি। তবে আগের মতো মোটা সুতার কাজ করি না। এখন সব উন্নতমানের সুতা, উন্নতমানের হানা, আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে ভালো মানের কাপড় তৈরি করি।

আড়তদার অর্ডার পাঠিয়ে নমুনা বললে আমরা সেই মোতাবেক শাড়ি-লুঙ্গি তৈরি করে পাঠাই। আমরা বর্তমানে অনেক উন্নত ধরনের কাপড় তৈরি করে থাকি। আমাদের তৈরি করা লুঙ্গি দেশ ছাড়িয়ে দিশেও যাচ্ছে। বিদেশে আমাদের তৈরি করা লুঙ্গির সমাদর ও চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া দেশের মধ্যেও আমাদের লুঙ্গির বেশ ভালো কদর রয়েছে।

আগের চেয়ে বেশ ভালো অবস্থানে আছি। ভাঙা উপজেলার মাইজাল গ্রামের তাঁতি সাইফুল বলেন, আগে আমার পুরনো একটা তাঁত ছিল, তা দিয়ে বর্তমানের চাহিদা মতো কাপড় তৈরি করা যেত না। কিন্তু আমার বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে পারছিলাম না, পরে ধারদেনা করে নতুন তাঁত ক্রয় করে চিকন সুতার কাজ শুরু করি। বর্তমানে ৪টি তাঁত চালু রয়েছে। এতে প্রায় ৭-৮ জন কারিগর কাজ করে থাকে। সব ধরনের সুতার শাড়ি-লুঙ্গি তৈরি হয়ে থাকে আমার তাঁতে। কর্মচারী নিয়ে কাজ করে আমি বেশ ভালো আছি। বর্তমানে আমার বোনা তাঁতের কাপড় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুনামের সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে। আমি বর্তমানে সংসার চালিয়েও বেশ ভালো আছি। তবে পুঁজি ও বাজারজাত সঠিকভাবে না হওয়ায় হস্তচালিত তাঁত শিল্প বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে। আগে প্রতি পাড়া-মহল্লায় হস্তচালিত তাঁত ছিল, এখন কয়েক গ্রাম ঘুরেও একটা তাঁতের দেখা মেলে না। হয়তো আরো কিছুদিন পরে হস্তচালিত তাঁত শুধুই কাগজে-কলমে জানা যাবে, বাস্তবে এর দেখা মেলা ভার হবে। তবে হস্তচালিত তাঁতের বোনা শাড়ি-লুঙ্গির বাজারে বেশ কদর রয়েছে এবং দাম ও বেশ ভালোই পাওয়া যায়। হাতের বোনা কাপড় খুবই মিহি ও মসৃৃণ থাকে, অনেকেই পছন্দ করে, যে জন্য দিন দিন হস্তচালিত তাঁতের শাড়ি-লুঙ্গি ও কাপড়ের কদর বাড়ছে।

এমএ হান্নান মিঞা, ফরিদপুর

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads