• শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
সুবিধাবঞ্চিত নারীদের নিরাপদ কর্মস্থল `বাসন্তী'

ছবি : বাংলাদেশের খবর

ফিচার

সুবিধাবঞ্চিত নারীদের নিরাপদ কর্মস্থল `বাসন্তী'

  • মনিরা তাবাস্সুম
  • প্রকাশিত ২৫ নভেম্বর ২০১৮

একটি গার্মেন্টে কাজ করতেন সূচনা। কদিন আগেই মা হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই ছোট শিশুকে রেখে তার কাজে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু পারিবারিক অসচ্ছলতা ওর পিছু ছাড়ছে না। যে গার্মেন্টে কাজ করেন, সেখানে শিশুসন্তান নিয়ে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। দুধের শিশুকে বাড়িতে রেখে কাজ করতে যাওয়াও সম্ভব নয়। সূচনার মতো এমন অনেক শ্রমজীবী নারীকেই শুধু সন্তান লালন-পালনের জন্য কাজ ছেড়ে দিতে হয়। হঠাৎ আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারটিকেও পড়তে হয় আর্থিক সঙ্কটে, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। সূচনার মতো এমন আরো শ্রমজীবী মায়ের জন্য বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে কাজ শুরু করেছে বাসন্তী মিনি গার্মেন্ট, যেখানে শুধু তিন মাস থেকে এক বছর বয়সী সন্তানের মায়েরা কাজ করার সুয়োগ পান। এ ছাড়া প্রতিবন্ধীদের জন্যও রয়েছে কাজের সুযোগ। নিজের অক্ষমতাকে জয় করে স্বাবলম্বী করার জন্য সর্বোপরি তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলার জন্যই বাসন্তীতে রাখা হয়েছে প্রতিবন্ধীদের কাজের সুযোগ। সেক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী কর্মীটিকে কাজ শিখিয়ে তৈরি করে নেওয়া হয় বাসন্তীর জন্য।

শুধু মায়েরাই নয়, বাসন্তী গার্মেন্টে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ আছে শিক্ষার্থীদের জন্যও। সপ্তাহে দুদিন চার ঘণ্টা করে কাজের সুযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। কথা হয় তেমনই খণ্ডকালীন কাজ করতে আসা দুই বোন  মিতু ও ঋতুর সঙ্গে। দুজনই পড়াশোনা করেন মিরপুর হজরত শাহ্ আলী মহিলা কলেজে। কলেজে ক্লাসের ফাঁকে সপ্তাহে দুদিন কাজ করেন বাসন্তীতে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবেও যুক্ত আছেন বিদ্যানন্দের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে। কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে সপ্তাহে মাত্র দুদিন সময় দিলে তেমন অসুবিধা হয় না আর কিছু হাতখরচের টাকাও আসে বলে জানান মিতু।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন পরিচালিত বাসন্তী গার্মেন্টে বাণিজ্যিকভাবে কোনো পোশাক তৈরি করা হয় না। বাসন্তীতে তৈরি পোশাক বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন বিভিন্ন সময় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে বিতরণ করে। নানা উৎসব-পার্বণে বিদ্যানন্দের এই গার্মেন্টেই শিশু-কিশোরদের জন্য তৈরি হয় নতুন সব পোশাক। স্বেচ্ছাসেবীরা সে পোশাক নিয়ে ছুটে যান প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এবার যেমন দূর্গাপূজায় ২০০ ছেলেমেয়ের জন্য বাসন্তীর কর্মীরা তৈরি করেছেন পোশাক। দুর্গাপূজায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে বাসন্তীর কর্মীরা লাল জমিনের সার্টিনে জরির কাপড়ে ডিজাইন করে তৈরি করেছে বিভিন্ন বয়সী মেয়েদের জন্য ফ্রক। ছেলেরাও বাদ পড়েনি। তাদের জন্য তৈরি হয়েছে সুন্দর সব ফতুয়া। পূজার দিনগুলোতে বাসন্তীর কর্মীদের পরম যত্নে বানানো এসব পোশাক পরে শিশুরা মেতে উঠেছিল পূজার আনন্দে। নতুন জামা গায়ে চাপিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে মণ্ডপে মণ্ডপে। পূজার পরপরই বাসন্তীর কর্মীদের ব্যস্ততা ছিল প্রবারণা পূর্ণিমায় বিদ্যানন্দের অনাথালয়ের বাচ্চাদের কাপড় তৈরি নিয়ে। সেখানেও সফল বাসন্তীর কর্মীরা। আসছে শীতে ঢাকাসহ ঢাকার বাইরের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে শিশুরা যাতে শীতে কষ্ট না পায় সে লক্ষে বাসন্তীর কর্মীদের বর্তমান ব্যস্ততা শিশুদের জন্য শীতের পোশাক তৈরিতে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ২ হাজার শিশুর মধ্যে শীতবস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বাসন্তীর সব কর্মীর কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। উষ্ণতা ছড়াতে এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে বেশকিছু পোশাক। বিভিন্ন বয়সভেদে তৈরি পোশাকগুলো রাখা হচ্ছে আলাদা আলাদা ব্যাগে। বছরের শেষ দিনটিতে বিভিন্ন অঞ্চলের দুই হাজার শিশুর হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে এই শীতবস্ত্র।     

বাসন্তী যেন আপন গৃহ

বাসন্তী গামেন্টকে অন্যসব গার্মেন্ট থেকে আলাদা করেছে এর ভিন্নধর্মী পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনা। মায়েরা যেন কাজের পাশাপাশি পরিবার ও সন্তানকে সময় দিতে পারে, সে কথা চিন্তা করে দৈনিক কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে চার ঘণ্টা। প্রতিদিন চার ঘণ্টা করে দুটি শিফটে কাজ করেন প্রায় ২৫ জন মা। বিদ্যানন্দের পক্ষ থেকে বাসন্তীর মায়েদের দুপুরের খাবার দেওয়া হয় এবং শিশুদের জন্য দেওয়া হয় পুষ্টিকর খিচুড়ি।

রোজিনা, খাদিজা, মুক্তা, মাকসুদা, সুরমা- সবাই বাসন্তীর কর্মী। এখানে কাজ করতে কেমন লাগছে জানতে চাইলে বাসন্তীর কর্মী রোজিনা বলেন, এখানকার কাজের পরিবেশ অনেক ভালো, অন্য গার্মেন্টের সঙ্গে কোনো মিল নেই। আমরা এখানে নিশ্চিন্তে কাজ করি। আর আপারাও অনেক ভালো।

রয়েছে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র

বাসন্তী গার্মেন্টে কর্মরত মায়েদের তিন মাস থেকে এক বছর বয়সী বাচ্চাদের দেখভালের জন্য রয়েছে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র। প্রতিটি মা সঙ্গে করে তাদের সন্তানদের নিয়ে আসেন। শিশুদের জন্য রান্না করা হয় খিচুড়ি। খেলাধুলার জন্য রয়েছে নানা ধরনের খেলনা। এ ছাড়া বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবীরা নিয়মিত শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করেন। নয়টি দোলনা আর নানা ধরনের খেলনায় সজ্জিত রুমটিতে শিশুরা বেশ আনন্দেই সময় কাটায়। 

বাসন্তীতে কাজ করতে আসা এমন কয়েকজন মায়েদের সঙ্গে আলাপ জমে ওঠে শিশুদের ডে কেয়ার রুমে। দুপুরের শিফটে কাজ করা মায়েদের কেউ শিশুকে ঘুম পাড়াচ্ছেন, কেউ বাচ্চাকে খিচুড়ি খাওয়াচ্ছেন। সঙ্গে চলছে টুকটাক পারিবারিক আলাপ। ছয় মাস বয়স পেরুনো হোসাইনের মা সুরমা। এখনো যেন তার বিশ্বাসই হতে চায় না এমনও হতে পারে! বাচ্চা নিয়ে কাজে আসা, যখন-তখন কাজ থেকে উঠে বাচ্চার দেখভালের সুযোগ, দুপুরে নিজের আর বাচ্চার খাবার! সবই তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। আগে গার্মেন্টে কাজের তেমন কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় এখানে তিনি প্রথমে কাজ শিখে নিচ্ছেন। সুরমা জানান, বাচ্চাটা হওয়ার মাস তিনেক পর ভাবছিলাম যদি কোনো কাজ করা যাইত! আশ্চর্যের বিষয়, এর কয়েক মাস পরই পাশের এক ভাবি বললেন এই গার্মেন্টের কথা। পরে তার সঙ্গে এখানে আসি। এখন কাজ শিখছি। বাচ্চাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারেন। তাই এখানে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারেন বলেই মনে করেন এখানকার কর্মীরা। এখানে সবার সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক আর সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ এবং নিরাপত্তার কারণে বাসন্তীকে গার্মেন্ট নয়, আপন গৃহই ভাবেন বাসন্তীর কর্মীরা। 

বিদ্যানন্দের এসব প্রচেষ্টা আশপাশের মানুষকে উৎসাহিত করবে এবং একসময় তাদের মতো আরো অনেকে এগিয়ে আসবেন, নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন পাশের মানুষটির জন্য- এমনটিই আশা করেন বিদ্যানন্দ পরিবার।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads