• রবিবার, ২৬ মে ২০১৯, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
বাল্যবিয়ে রোধে সরকারি উদ্যোগের সাফল্য

বাল্যবিয়ে রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

বাল্যবিয়ে রোধে সরকারি উদ্যোগের সাফল্য

  • প্রকাশিত ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮

শামীমা চৌধুরী

পঁয়ত্রিশ জন কিশোরী। কে বলবে ওরা স্বামী পরিত্যক্তা? কে বলবে ওরা নির্যাতনের শিকার? ওরা আজ দেশের শক্তি। ওদের প্রতিবাদ, মনোবল, ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রয়াস আজ আলো ছড়াচ্ছে, দিকনির্দেশনা দিচ্ছে দেশের বাল্যবিয়ের শিকার হাজারো কিশোরীকে। ওদের সবার মুখে একই কথা- ‘আমরা নিজির পায়ে দাঁড়াতি চাই’।

কোটচাঁদপুরের স্বামী পরিত্যক্তা ৩৫ কিশোরী-তরুণী। সবারই বয়স ১৪ থেকে ১৭’র মধ্যে। এরা সবাই বাল্যবিয়ের শিকার। সাথী খাতুন, হামিদা, নাসিমা বেগম, রেহেনা খাতুন, শোভা রানী, রুনা আক্তার, মমতাজ বেগম, সুরাইয়া খাতুন, কুলসুম আক্তার, সুমি আক্তার, নাসরিন আক্তার, শিরিন খাতুন, রোখসানা খাতুন, নূরজাহান বেগম, রিয়া খাতুন, বিলকিস আক্তার, জহুরা বেগম, সাগরী খাতুন, কবিতা খাতুনসহ সবাই অনেকটা একই কারণে বাল্যবিয়ের শিকার।

সংসারে দরিদ্র বাবার মৃত্যুর পর অভিভাবকহারা হওয়া, স্কুলে যাওয়ার পথে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া ইত্যাদি। এরা কেউই সংসার করতে পারেনি। ক্রমাগত যৌতুকের চাপ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ইত্যাদির শিকার হয়ে এদের ক’জন আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিল। এদের একজন কুলসুম আক্তার বলেন, ‘যখন সেভেনে পড়ি, চৌদ্দ বছর বয়স তখন পরিবারের চাপে বিয়ে করতি হয়। কী করব, আমরা তো গরিব। বিয়ে হতি না হতি যৌতুকের জন্যি চাপ দেলো তেনারা। যৌতুকের টাকা দিতে পারেনি আমার বাপ। তার জন্যি কত মারধর খেইছি। তারপর তো তেনারা আমারে ছেইড়েই দিল।’ এই ৩৫ কিশোরীর সবার জীবনেই আছে এমন বেদনাময় ঘটনা।

এসব কিশোরীকে আলোর পথে নিয়ে এসেছেন কোটচাঁদপুর উপজেলার মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি নারীদের নিয়ে কাজ করি। বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে নারীদের সমস্যার খোঁজখবর নিই। বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে আমি এই কিশোরীদের সন্ধান পাই। পরে ঢাকায় গিয়ে মহিলাবিষয়ক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। তিনি ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক, স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে এই কিশোরীদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেন। এরপর এডিবি থেকে বরাদ্দ পাওয়ার পর এই ৩৫ জনকে নিয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করি।

এই ৩৫ জনকে একত্র করে বিভিন্ন মেয়াদে ব্লক, বাটিক, বিভিন্ন কুটিরশিল্প, সেলাই ইত্যাদির ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এদের নিজেদের হাতে তৈরি পণ্য নিয়ে শিগগিরই একটি শোরুম উদ্বোধন করা হবে। এই ৩৫ জনই হবে শোরুমের মালিক। এরা সবাই এখন ব্যস্ত। তিনি আরো বলেন, এদের মধ্যে যারা লেখাপড়া করতে চান তাদের বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বাল্যবিয়ে রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ১০টি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত ‘গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ) এ ব্যাপারে নিয়েছে সময়োপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপ। এ কাজে জিআইইউ একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রণয়ন করেছে। এতে বাল্যবিয়ের বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিয়ের সহজ পদ্ধতি, বিয়ে হয়ে গেলে বয়সের কারণে তা কোনোভাবে বাতিল বা অবৈধ না হওয়া, বিয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ ও যাচাই না করা, বিয়ের একটি বড় অংশ নিবন্ধিত না হওয়া, এফিডেভিড ও কোর্ট ম্যারেজের বিষয়ে ভুল ধারণা, সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ছাড়া বিয়ে পড়ানোয় সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সচেতন না করা, গ্রামবাসী ও পরিবারের সদস্যদের ধারণা বিয়ে জীবনের একমাত্র সমাধান ইত্যাদি।

সাধারণত মসজিদের ইমাম, মাদরাসার শিক্ষক, ধর্মীয় শিক্ষক, মৌলভী, ঠাকুর, পুরোহিত, স্থানীয় মুরব্বি, বিবাহ নিবন্ধকের সহকারীরা বিয়ে পড়িয়ে থাকেন। এরা সবাই যদি উদ্যোগী হন তা হলে বাল্যবিয়ে রোধ করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের মাধ্যমে যারা বিয়ে পড়ানোর সঙ্গে জড়িত এমন ৬৪ হাজার ৭৬৪ ব্যক্তির ডাটাবেজ প্রস্তুত করা হয়েছে। বাল্যবিয়ের কুফল নিয়ে ইতোমধ্যে ২০ হাজার ইমামকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আরো ৩ লাখ ইমামকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে কাজিরা যাতে বিয়ে পড়ানোর সময় পাত্রীর জন্মনিবন্ধন  পরীক্ষা করে দেখেন, তার ওপরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কাবিননামায় বর-কনের ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংযোজন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের বিষয় নিয়ে ১৮টি জেলায় পরামর্শসভা এবং ৪৮০টি উপজেলায় প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। সেই সাথে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ‘এনাবেলিং চাইল্ড রাইট’ প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র ও বাল্যবিয়ের শিকার হতে পারে এমন কন্যাশিশুদের বিশেষ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এ প্রকল্পে ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সের ১০ হাজার ৪২৫ শিশুর প্রত্যেককে ৩৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

বাল্যবিয়ে রোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া নির্দেশনাগুলো ইতোমধ্যে আইন ও বিচার বিভাগ, সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, মহিলাবিষয়ক অধিদফতর, ধর্ম মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ১ হাজার ৮০০ মসজিদের ইমামকে বাল্যবিয়ে নিরোধে খুতবা-পূর্ব বক্তব্য দেওয়ার জন্য তথ্য দেওয়া হয়েছে। সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত পল্লী সমাজসেবা কার্যক্রম দেশের প্রতিটি  ইউনিয়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই কার্যক্রম বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কাজ করছে। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে হেল্প লাইন চালু হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ১ হাজার ১০০টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। বাল্যবিয়ের শিকার  কিশোরীদের নিরাপত্তার জন্য তাদের বয়স ১৮ বছর হওয়া পর্যন্ত শিশুকে পরিবারে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এভাবে গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট তাদের সব প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে।

কোটচাঁদপুরের যে ৩৫ কিশোরী আজ সাহসের সাথে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তাদের পেছনে আছে সরকারের নেওয়া সহযোগিতা। এ সহযোগিতা তাদের দেখিয়েছে আলোর পথ। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সরকারের এ উদ্যোগ অনন্য ভূমিকা রাখবে সন্দেহ নেই।

পিআইডি : শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads