• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬
ads
পৃথিবীর সব সৌন্দর্য নিয়ে শীত আসে এই বাংলায়...

গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্তের পরেই আসে শীতকাল

সংগৃহীত ছীব

ফিচার

পৃথিবীর সব সৌন্দর্য নিয়ে শীত আসে এই বাংলায়...

  • প্রকাশিত ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮

ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদেশ। ছয়টি ঋতু এ দেশে ছয়টি আবহ নিয়ে আসে। গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্তের পরেই আসে শীতকাল। পৌষ-মাঘ শীতকাল হলেও হেমন্ত থেকেই শুরু হয় কনকনে হাওয়া। গায়ে চাপাতে হয় ভারী কাপড়। মাঠে মাঠে তখন ধানকাটা শুরু হয়। বাড়িতে বাড়িতে শুরু হয় পিঠাপুলির আয়োজন। শীত নানা কারণেই বাংলাদেশে এক অনন্য ঋতু। বেড়ানো, ঘোরাফেরা আর মজার মজার খাওয়া-দাওয়ার জন্য শীতের কোনো তুলনা নেই। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার আনন্দ-উৎসব-সংস্কৃতি আবর্তিত হয় শীতকে ঘিরেই। এখনো শীত মানেই যেন উৎসবের আমেজ। সে গ্রামে হোক আর শহরে। একসময় বাংলার গ্রামে গ্রামে শীতের সময় যেমন আয়োজন হতো যাত্রাপালা, বাউল গানের এখনো গ্রামে-শহরে রাতভর মানুষ মেতে থাকে সেরকম সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসবে। শীতের চাদর সারা বাংলাকে জড়িয়ে ধরে গভীর মায়ায়। শীতের কিছু দৃশ্য-ছবি-গল্প নিয়ে আমাদের এই আয়োজন বাংলার শীত। লিখেছেন কামরুল আহসান

আইল্যার ওম

শহুরে অনেকের কাছে আইল্যা শব্দটি পরিচিত নাও মনে হতে পারে। মাটির পাত্রে গরম ছাই কয়লা নিয়ে গ্রামের বুড়োবুড়িরা উত্তাপ নেন। উত্তাপকে বাংলাদেশের অনেক গ্রামে বলে ওম, মানে উষ্ণতা। সাধারণ মাটির মালশায় করে গরম ছাই-কয়লা নেওয়া হয়। সন্ধ্যার রান্না হয়ে গেলে মাটির চুলা থেকেই গরম ছাই-কয়লা তুলে মাটির পাত্রে রেখে দেওয়া হয়। বুড়োবুড়িরা সেই আইল্যা কোলের কাছে নিয়ে বসে থাকে। আঁতুরঘরেও আইল্যা রাখার নিয়ম আছে অনেক অঞ্চলে। একটু পরপর কাপড় গরম করে বাচ্চাকে ছ্যাঁক দেওয়া হয়। আগে ভারী কাপড়ের এত সহজলভ্যতা ছিল না বলেই হয়তো আইল্যার প্রচলন ছিল এত বেশি। এখন গ্রামের একেবারে গরিব লোকটিও কিছু ভারী কাপড় জোগাড় করতে পারে। আর শীতও তো পড়ে না এখন আগের মতো এত প্রচণ্ড। অনেক অঞ্চল থেকে আইল্যা হারিয়েই গেছে বলা যায়। শহরের অনেকে আইল্যা জীবনে হয়তো চোখেও দেখেনি। শীতের সন্ধ্যায় আইল্যা পোহানোর স্মৃতি যার আছে, সে-ই জানে এর মজা।

শীতে বেড়ানো

শীত এলেই চারদিকে পড়ে যায় বেড়ানোর ধুম। আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি থেকে দেশের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার জন্য দলবেঁধে ছুটে যান ভ্রমণপিপাসুরা। শীতে স্কুল-কলেজও ছুটি থাকে, তাই পরিবারসহ আত্মীয়ের বাড়ি বেড়ানো যায় অনায়াসেই। শহুরে লোকজন ছুটে যান গ্রামে। দাদার বাড়ি, নানার বাড়ি নাতি-নাতনিদের পথচারণায় হেসে ওঠে শীতের কোমল রোদের মতোই। আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া মানেই তখন নানা পিঠাপুলির আয়োজন। তার সঙ্গে শীতের হরেকরকম সবজি তো আছেই। শীতের আতিথেয়তার পেছনে আছে বাঙালির দীর্ঘকালীন ঐতিহ্য। অন্যদিকে যারা একটু শহুরে তরুণ, তারা ভালোবাসে শীতের সময় দূরে কোথাও ঘুরতে যেতে। সুন্দরবন, বান্দরবান, কক্সবাজার ঘুরতে যাওয়ার জন্য শীতই যেন উপযুক্ত সময়। শীত যেন এক ভ্রমণবিলাসী মাস। শীতের সময় কক্সবাজারসহ দেশের সব পর্যটন কেন্দ্র লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।

শীত মানেই যেন বিয়ের সময়

শীত ঋতুর সঙ্গে বাঙালির বিয়ের সময়টি যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এর কারণ সম্ভবত শীতের আগে নতুন ধান ওঠে তাই। তা ছাড়া শীতে যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো থাকে। হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টিতে বিয়ে পণ্ড হওয়ার আশঙ্কা নেই। শুধু গ্রামে নয়, এখন শহরাঞ্চলে শীতেই বেশি বিয়ে হয়। গায়ে হলুদের রাতভর উৎসবটি শীত ছাড়া যেন জমেই না। শহরে যেমন বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল খাটিয়ে গায়ে হলুদের আয়োজন করা হয়, গ্রামেও তেমনি বাড়ির উঠানে আয়োজন করা হয় নাচগানের। বিয়েকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকমের নাচগানের সংস্কৃতি চালু আছে। সিলেট অঞ্চলে ধামমাইল নাচ, কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চলে তেমনি বিয়ের গীত। বাড়ির বউ-ঝিরা দলবেঁধে বসে সেই গীত গায়।

শীতের প্রসাধনী

সাম্প্রতিক সময়ে শীতকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে অন্যরকম একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সেটি হচ্ছে শীত মানেই যেন নানারকম প্রসাধনীর সয়লাব। শীতে হাত-পা টানে, মুখের চামড়া শুকিয়ে যায়। গ্লিসারিন থেকে নানারকম ক্রিম এ সময় অনিবার্য হয়ে ওঠে। আগে শুধু তিব্বত স্নো মাখলেও এখন দেশি-বিদেশি নানারকম প্রসাধনীতে ভরে উঠেছে বাজার। শীত আসার আগেই বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা তাদের উপস্থিতি জানান দেয়। শীত ও বিয়েকে কেন্দ্র করে প্রসাধনীর দোকানগুলো নতুন করে সেজে ওঠে। 

শীতের পাখিরা

শীত এলেই সুদূর সাইবেরিয়া, ইংল্যান্ডের নর্থ হ্যাম্পশায়ার থেকে অতিথি পাখিরা উড়ে আসে আমাদের দেশে। আমাদের বিল-হাওর আর জলাভূমিগুলো মুখর হয়ে ওঠে পাখির কলকাকলিতে। তীব্র শীতের হাত থেকে বাঁচতেই তারা আমাদের অল্প শীতের দেশে চলে আসে। খাদ্যের সন্ধানে তারা পাড়ি দিয়ে আসে হাজার হাজার মাইল। কিছু পাখি অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে এলেও বেশিরভাগ পাখি আসে ডিসেম্বর-জানুয়ারির দিকে। প্রায় তিনশ প্রজাতির পাখি হিমালয় পাড়ি দিয়ে এ দেশে চলে আসে। খবর পাওয়া গেছে, এর মধ্যেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকে অতিথি পাখি এসে ভরে গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাড়াও মিরপুর চিড়িয়াখানার লেক, বরিশালের দুর্গাসাগর, নীলফামারীর নীল সাগর, সিরাজগঞ্জের হুরা আর সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এসব অতিথি পাখির প্রিয় অবকাশ কেন্দ্র। এসব অতিথি পাখি শুধু সৌন্দর্য নয়, আমাদের প্রাণচক্রের ভারসাম্যও বজায় রাখে। তাই এদের রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের সবারই সচেতন হতে হবে।

 

শীতের পোশাক

শীত এলেই গায়ে চাপে ভারী পোশাক। ছেলেদের যেমন পছন্দ জ্যাকেট, জাম্পার, ব্লেজার, মেয়েরাও তেমনি গায়ে চাপায় কার্ডিগান, চাদর। আজকাল আধুনিক মেয়েরাও জ্যাকেট, ব্লেজার পরতে পছন্দ করে। মুরব্বিদের জন্য এখনো বহাল আছে সেই আদি খাদি ভারী চাদর। শীতের পোশাক ভিন্নমাত্রা নিয়ে আসে নানারকম বাহারি রঙে। শীত আসার আগেই শপিং মলগুলো ভরে যায় নানারকম শীতের পোশাকে। শীতের পোশাক এখন শুধু আর শীত চাপা দেওয়ার জন্য না; বরং তার চেয়ে বেশি ফ্যাশন-সৌন্দর্য প্রকাশের জন্য। আধুনিক তরুণ-তরুণীরা এখন হুডি ভারী-টিশার্ট খুব পছন্দ করে। তার সঙ্গে অনেকে ব্যবহার করে মাফলার। শীত পুরো শরীরকেই মুড়িয়ে দেয় ভারী কাপড়ে। শীত উপলক্ষে ফ্যাশন হাউজগুলো প্রতি বছরই নিত্যনতুন ডিজাইনের পোশাকে সাজিয়ে তোলে দোকানগুলো।

 

শীতের পিঠা

শীত মানেই যেন পিঠা খাওয়ার ধুম। নবান্নে ওঠে নতুন ধান। আর হয় খেজুরের রস ও গুড়। শীতের সবচেয়ে প্রিয় ও জনপ্রিয় পিঠার নাম সম্ভবত ভাপা পিঠা। বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল নেই শীতের সময় যারা ভাপা পিঠা খায় না। এখন শহরাঞ্চলে রাস্তার পাশের দোকানগুলোতেও ভাপা পিঠা পাওয়া যায়। এর সঙ্গে পাটিসাপটা, ফুল পিঠা, তেলে ভাজা পিঠা তো আছেই। চাঁদপুলি, মালপোয়া, দুধচিতই, পাক্কন, নারকেল পুলি আরো কত রকমের পিঠা তো আছেই। রাজধানী ঢাকাসহ এখন দেশের প্রধান প্রধান শহরে শীতের সময় পিঠা উৎসব হয়। বিভিন্ন ধরনের পিঠা তখন একসঙ্গে খাওয়ার সুযোগ হয়। তবে পিঠা খাওয়ার সবচেয়ে মজা নিশ্চয়ই দাদার বাড়ি, নানার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে মাটির চুলার পাশে বসে গরম গরম খাওয়া। পিঠা বাঙালির এক নিজস্ব সংস্কৃতি। শীত ঋতুর সঙ্গে পিঠার স্মৃতি জড়িয়ে আছে হাজার বছরের ঐতিহ্য হয়ে।

 

খেজুরের রস

শীতের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ খেজুরের রস। যদিও আজকাল নিপা ভাইরাসের ভয়ে অনেকে খেজুরের রস খান না। বাদুরের কারণে এই নিপা ভাইরাস ছড়ায়। তা ছাড়া যারা গুড় তৈরির জন্য খেজুরের রস সংগ্রহ করেন, পোকামাকড়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য তারা গাছে নানারকম বিষাক্ত ওষুধ দিয়ে থাকেন। ফলে সেই খেজুরের রস খাওয়া যায় না। তারপরও শীত এলেই সবাই সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন কোথাও গিয়ে যদি একটু খেজুরের রস খাওয়া যেত। অনেক গ্রামে এখনো তা সুলভ। গ্রামের দুষ্টু ছেলেদের অভিজ্ঞতা আছে অন্যের গাছের রস রাতদুপুরে চুরি করে খাওয়ার। খেজুরের রস এক অপূর্ব প্রাকৃতিক শরবত বাংলার মানুষের জন্য। খেজুরের রস জাল দিয়ে অনেকে পায়েস তৈরি করেন। খেজুরের রস থেকে তৈরি মিঠাই, গুড় ব্যবহূত হয় নানারকম পিঠা বানাতে। বলা যায় খেজুরের রস বাংলার এক ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিরই অংশ এখন।

 

শীতবস্ত্র বিতরণ

এখনো বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে ভয়ঙ্কর ঠান্ডা পড়ে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে। বাংলাদেশের কিছু অঞ্চল এখনো গরিব। অনেকেই শীতের কাপড় পায় না। শহরের ধনী-মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত সচেতন সমাজসেবী তরুণ-তরুণীরা তখন এগিয়ে আসে স্বেচ্ছাসেবায়। মানুষের কাছ থেকে অর্থ ও শীতবস্ত্র সংগ্রহ করে তারা এগিয়ে যায় মানবতার সেবায়। কয়েক বছর ধরে এ এক অসামান্য মানবিক সংস্কৃতি শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। একটি মানুষও যেন শীতে কষ্ট না পায়, সে ব্যাপারে অনেকেই সচেতন। একসময় শীতে বাংলাদেশে অনেক মানুষ মারা যেত। বিশেষ করে গরিব শিশু ও বৃদ্ধরা। এখন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের অনেক অনেক উন্নতি হয়েছে।

41815383_303
সরিষা ক্ষেত

শীতের আরেক অপরূপ নিদর্শন মাঠভর্তি হলুদ গালিচা। রাশি রাশি হলুদ সরিষা ফুলে ছেয়ে যায় মাইলের পর মাইল ক্ষেত। ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, জামালপুর, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, বরিশাল, যশোর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, পাবনা, রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের বিস্তৃত বিলজুড়ে চাষ হয় সরিষার। সরিষার তেল বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। খাওয়া থেকে শুরু করে অনেকে তা গায়েও মাখে। আজকাল সরিষা ফুল থেকে অনেকে মধুও সংগ্রহ করে। সরিষা ক্ষেত দেখার জন্য অনেকে শহর থেকে ছুটে যায় গ্রামে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads