• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬
ads
ডিগবাজি

ডিগবাজি

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

ডিগবাজি

  • প্রকাশিত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

মোহাম্মদ অয়েজুল হক

ছোটবেলা থেকেই ডিগবাজি প্রিয় কালু। শিশুকালে বিছানায়। একটু বড় হয়ে মাটিতে। তারপর পানিতে। পরিণত বয়সে রাস্তাঘাটে! পরে বুঝেশুনে ডিগবাজি ছাড়লেও ডিগবাজি তাকে ছাড়েনি। যুবক বয়সে নির্বাচনী শোডাউন দিতে গিয়ে বাইক নিয়ে দুই তিন ডিগবাজি খেয়ে হাত পা ভাঙা, মাথা ফাটা। তবু ডিগবাজি তার ক্ষতির চেয়ে উপকারই করেছে বেশি। হসপিটালে বড় বড় নেতার উপস্থিতি। দিনে দিনে আস্থাভাজন, প্রিয়জন। রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ। নেতা হয়ে দু-চার বছরে খাল বিল নিজের করে নেয়া। ব্রিজ কালভার্টের বড় অংশ খেয়ে ফেলা। কালুর কালু সাহেব হতে সময় লাগেনি। সাহেব হয়েই প্রথম নির্বাচন। সে এক বিরাট ইতিহাস। নেতা অবস্থায় অনেক রাস্তা, ব্রিজ, ইট, সিমেন্ট, বালু খেয়ে ফেলায় দল তাকে নমিনেশন দিতে নারাজ। শেষে না পুরো দলটাই খেয়ে ফেলে। কালুও নারাজ। ডিগবাজিতেই তার শেষ  ভরসা। শেষমেশ তার প্রিয় ডিগবাজি। পাঁচ বছর চোখে পানি নিয়ে, মুখ নেতিয়ে থেতিয়ে যে আদর্শের কথা বলা। যে দলের কথা বলে মানুষের কান ঝালাফালা করে তোলা সে দল ছেড়ে অন্যদলে যোগদান। ফুলের মালা পরিধান! জোয়ার, ভাগ্য জোর,কিছু পেশিশক্তি ক্ষয়ে সাফল্য আসে। এমপি। দেখতে দেখতে পাঁচ বছর চলে যায়। আবার নির্বাচন। অবশ্য পাঁচ বছর দেদারসে গিলেছেন।  গুলশানে  আলীশান, বনানীতে বাপের দোয়া, বারিধারায় বারির বাড়ি নামক বড় বড় ভবন গড়ে তুললেও মনের খাই খাই ভাবটা দিনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে। একবার পিএস প্রশ্ন করেছিল, স্যার আপনার হজম হয়!

কালু সাহেব হেসেই জবাব দেন, পাগলা। পাহাড়ও হজম হয়ে যাবে। আমার নাম কালু।

দলের অবস্থা ভালো না। কালু সাহেব আপন মনে ভাবেন- কেন যে দলে এত দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ! দিন এগিয়ে আসে। দলের লোকজন কালুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মিছিল হয়, বিক্ষোভ হয়। এগুলো হতেই পারে কিন্তু দল যখন তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তখন কালুর ডিগবাজি দিতেই হয়। ডিগবাজিতে দশ তলা, কুড়ি তলা বিল্ডিং হয়েছে। এবারের ডিগবাজিতে পাহাড়চূড়া ছুয়ে ফেলবে। দল পাল্টে, ভোল পাল্টে - পাল্টিবাজি। নতুন দল পেতে কষ্ট হয় না। নমিনেশন পেপারে কালু সাহেব কী লিখবেন!

সম্পদ বৈধ না হলে কিছু সমস্যা হতেই পারে। হঠাৎ করে মাথায় বুদ্ধি আসে- আসলে তার কি! সবই তো মানুষের। গণমানুষের। তিনি লেখেন- তার বাড়ি নেই। আসবাবপত্র নেই। ক্ষেপে ওঠে গণমাধ্যমকর্মীরা। কত প্রশ্ন-

- বাড়ি নেই!

- না।

- থাকেন কই?

- আমি জনগণের নেতা। মানুষের ঘরবাড়িই আমার ঘরবাড়ি।

- আপনার একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি আছে।

- আমার না। স্ত্রী, ছেলেমেয়ের।

- তারা কোথায় পেয়েছেন?

কালু রাগন্বিত হন। তারা ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। জনগণ। যার যার বিষয়। আমি জবাব দেব কীভাবে!

- আপনি পাঁচ বছর পর পর ডিগবাজি দেন কারণ কী?

- আমি ছোটবেলা থেকেই ডিগবাজিপ্রিয় মানুষ। এখানে কারণ খোঁজা বোকামি।

কয়েকদিন বেশ হাসাহাসি চলে। কালু মিয়ার তাতে কিছু আসে যায় না। সব চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ডিগবাজি দিতে দিতে সামনে এগিয়ে যায় সে।

পাঁচ বছর পরপর ইহাদের এক মাস বা পনেরো দিনের জন্য বড় বিনয়ী হতে দেখা যায়। হাত-পা ছুঁয়ে ধুয়ে পারলে চেটেপুটে পরিষ্কার করে দেন। গাড়ি বাড়ি ছেড়ে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। কালু হাক দেয়, কবির চাচা বাড়ি আছেন?

একটু পরে একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে আসেন। নেতা এগিয়ে যায়। বুকে জড়িয়ে বলে, কেমন আছেন চাচা?

- দুদিন ঘরে বাজার নাই। শীতের কাপড় নাই।

কালু ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। চোখ মোছে। হারুন সাব।

- জি স্যার।

- আমার ট্রাকগুলো রেডি রাখেন। এবার এমপি হলে নির্ঘাত মন্ত্রী। মন্ত্রী হলে বাজার ওঠায় এনে বাড়ি বাড়ি বসায় দেব। সারা গ্রাম লেপ কম্বল দিয়ে ঘিরে ফেলব। দেখি শীত কোনদিক দিয়ে আসে।

খুশিতে বৃদ্ধ মানুষের মুখটা জ্বলজ্বল করে। কালুর একটা ডিগবাজি দিতে ইচ্ছা করে। সবার সামনে। শূন্যে দেহটা উড়িয়ে একটা ঘুরপাক!

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads