• শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ৪ বৈশাখ ১৪২৮
স্বাধীনতার অমোঘ বাণী

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

বন্দী শিবির থেকে

স্বাধীনতার অমোঘ বাণী

  • মামুন মুস্তাফা
  • প্রকাশিত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

১৯৪৭-এর দেশভাগের অব্যবহিত পরে সর্বপ্রথম ভাষার প্রশ্নটি বাঙালির নিজস্ব স্বকীয়তার ক্ষেত্রে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীকালে এটি কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনেই গণতান্ত্রিক চেতনার ও অধিকার অর্জনের পথ প্রশস্ত করেনি বরং সেই সঙ্গে সমকালীন বাঙালি সংস্কৃতি এবং বাংলা কবিতার আধুনিক ও প্রগতিবাদী ধারার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করেছিল। সামন্ততান্ত্রিক ঔপনিবেশিক শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রথম প্রতিরোধ ছিল ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন। এরপর ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, যার পরিসমাপ্তি ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ঘটেছিল। এক্ষেত্রে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগরিক কবি হিশেবে বাঙালির সত্তা সন্ধানের ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া প্রতিটি পর্বেই তাঁর শ্লেষ, দাহ, বিষণ্নতা তুলে ধরেন ‘নিজ বাসভূমে’ ও ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যদ্বয়ে।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের দ্বিধান্বিত অভিযাত্রা শুরু হয় বিশ শতকের তৃতীয় দশকে। আর্থসামাজিক জীবনপ্যাটার্ন তখনো মূলত সামন্তরীতি ও মূল্যবোধ দ্বারা শাসিত। ’৪৭-এর দেশভাগ নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে গেঁথে দিল নয়া-ঔপনিবেশিক শাসন, যার আদর্শিক ভিত্তি সামন্ততন্ত্র এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শোষণ ও দমনমূলক। এই সামাজিক-রাষ্ট্রিক পরিবেশে মধ্যবিত্তের বিকাশ ও স্বাধীনতা হলো বিপন্ন। সংগত কারণেই সেই প্রতিকূল পরিবেশে মধ্যবিত্তের ব্যক্তিমানস ছিল অবক্ষয়গ্রস্ত, নৈঃসঙ্গ্যতাড়িত, স্মৃতিকাতর এবং সমাজ ও সমষ্টি বিচ্ছিন্ন আত্মরতি ভারাক্রান্ত। এই সময়ের কবিতায় রাহমান স্বদেশের যে ছবি এঁকেছিলেন, তা ছিল বাংলাদেশ ভূখ্লে বসবাসকারী জনমানুষের যাপিত জীবনের ক্রান্তিকাল। বাংলাদেশের কবিতার প্রধান পুরুষ হিশেবে কবি শামসুর রাহমানের পক্ষেই সম্ভব ছিল সেই নিষ্পেষিত জীবনের মর্মমূলে প্রবেশ করে তাকে কবিতার বিষয়বস্তু করে তোলা।
ভাষা আন্দোলনের সাফল্য ও ভাষার অধিকার সংক্রান্ত বিজয়ের পথ ধরেই বাঙালি জাতিসত্তার ও বাংলা ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটতে থাকে। যার ফলে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার যে চেতনা জন্ম নেয় জনসাধারণের মধ্যে, ক্রমশ তার বিস্তার ঘটে জাতীয় মুক্তির চেতনা রূপে। তারই ধারাবাহিকতায় একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন, গৃহযুদ্ধ এবং সবশেষে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। ঠিক সে সময়েই বাংলাদেশের কবিতাও গণআন্দোলনের আলোকিত আভায় পথ চলতে শুরু করেছিল। মিছিল, ঘেরাও, আগুন আর বারুদের মতন শব্দাবলি শুধু অনুষঙ্গ তৈরি করে শেষ হয় না, এগুলোর শব্দচিত্রে বা প্রতীকে কবিতা চেতনায় উত্তাপ ছড়াতে থাকে। সেই বিরুদ্ধ পরিবেশে বন্দিদশাসই অবস্থা যখন বাঙালির, তখনো একজন কবি শামসুর রাহমান নিটোল অথচ ঋজু ভাষায় কবিতায় প্রতিবাদের শব্দ সাজালেন তাঁর ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায়। যেখানে কবি স্বাধনিতাকে রবিঠাকুরের অজর কবিতা, কাজী নজরুলের ঝাঁকড়া চুল; আবার কখনো শহীদ মিনারের উজ্জ্বল সভা কিংবা পতাকা-শোভিত স্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এবং সবশেষে কবির স্বাধীনতা হয়ে ওঠে তাঁর যেমন ইচ্ছে লেখার কবিতার খাতা। মূলত এর মাধ্যমে তিনি পরাধীনতার নাগপাশ ছিঁড়ে নিজের মতো করে স্বাধীনতাকে ছুঁতে চেয়েছেন, যা ছিল বাঙালির দীর্ঘদিনের মনোবাঞ্ছা।

জাতিসত্তার প্রশ্নে বাঙালির রাষ্ট্রীয় জীবনের এই জটিল ক্ষত ও অন্তর্দাহ কবিতার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে কবির প্রতিদিনের কার্যাবলির ভেতরে। এ যেন তাঁর দৈনন্দিন জীবনপ্রণালীর অংশ। যেখানে জীবনের তাৎপর্য কবির কাছে বিস্তৃত এবং ব্যাপকতা লাভ করে। কবির সে উপলব্ধি বাঙালির জীবনপ্রবাহেরই গাথায় পরিণত হয়। পরবর্তীকালে আমরা দেখি কবি শামসুর রাহমানের সেই সব আশ্চর্য পিক্তমালা জনপ্রিয়তার পাশাপাশি খ্যাতির শিখর স্পর্শ করে— ‘দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার।/ পুড়ছে দোকান-পাট, কাঠ,/ লোহালক্কড়ের স্তূপ, মসজিদ এবং মন্দির।/ দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার।/ ...তুমি বলেছিলে,/ আমাকে বাঁচাও।/ অসহায় আমি তাও বলতে পারিনি।’ কবিতাটির শিরোনাম ‘তুমি বলেছিলে’। এ কবিতায় নয় মাসের যুদ্ধবন্দি জনজীবনের আকুতি টের পাওয়া যায়।

পলাশীর বিপর্যয়, সিপাহী বিপ্লব, কংগ্রেস-মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিভেদের রাজনীতি, পাকিস্তান প্রস্তাব এবং অসংগত রাজনৈতিক মীমাংসা, ভাষা আন্দোলন— এ সবই ছিল একটি ঐতিহাসিক ধারা। ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ বাঙালির জাতীয় জীবনে সেই ঐতিহাসিক নিয়ামক। সেখানে জীবনের অভিঘাত, আন্দোলন, প্রতিবাদ, রক্তক্ষরণ ও প্রতিরোধ সবই ছিল। আর এগুলোকে একজন সচেতন সমাজমানুষ হিশেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কবির পক্ষে কখনই সম্ভব ছিল না। বাংলাদেশের কবিতার জগতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিব্যক্তিত্ব শামসুর রাহমানের কাছে স্বাধীনতার আবেদন হলো শব্দময়, শিল্পময়। তাঁর কবিতায় অভিজ্ঞতা ও জীবনের দৈনন্দিনতার বিচিত্র অনুষঙ্গের মধ্যে ‘স্বাধীনতা’ এই শব্দটির ব্যাপকতা অনুরণিত হতে দেখি।

শামসুর রাহমান বেশ বুঝতে পারেন নৈঃসঙ্গ্য, একাকিত্ব ও বেদনাবিধুর জগতে ক্রমাগত জমা হতে থাকে রক্তচিহ্ন, জীবনের বিদীর্ণ বেলাভূমিতে ভিড় করতে থাকে হারানো স্বজন, ক্রোধ ও প্রতিশোধের পুঞ্জীভূত বারুদ। আপন সত্তাসন্ধানে নিবিষ্ট কবি দেখেন বাঙালির জীবনে কেবলই রক্তপাত, যুদ্ধ, নিপীড়ন, নির্যাতন। ‘বন্দী শিবির থেকে’ কবিতাগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় স্বপ্নবিলাসী মধ্যবিত্তের আত্মস্বরূপ অভিব্যক্ত হয়েছে। কবি নিজেও সেই জিজ্ঞাসা, আত্মবিস্তার, আত্মশুদ্ধি এবং আত্মশুদ্ধির পর একটা আস্থার পটভূমি খুঁজে পান। এ কাব্যের গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতায় সেই বিভিষীকাময় সময়ের মর্মন্তুদ চেহারা ফুটে উঠেছে। যেখানে রক্তগঙ্গা, খাণ্ডবদাহন, পোড়ো ভিটের পাশাপাশি জ্বলন্ত ঘোষণা আর নতুন নিশানার ভেতরে ভোরের সূর্যের মতো উঁকি দেয় ‘স্বাধীনতা’ এই অমোঘ সত্য।

‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যের কবিতাগুলো ’৭০ থেকে ’৭২ সময়পর্বে লিখিত। নামকরণ ও কবিতার বিষয়বস্তু থেকে এটা স্পষ্ট যে, এই কাব্যটি বাঙালি জাতির জাতীয়তাবোধের অসামান্য দলিল, একই সাথে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফসল। সাতচল্লিশের স্বপ্নভঙ্গের পরে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন ক্রমশ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পথ ধরে স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষেত্রটিকে প্রস্তুত করে দেয়। ইতিহাসের এ স্বাক্ষরচিহ্নিত পাতাগুলো চমৎকার শব্দশৈলীর দ্যোতনায় ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে শামসুর রাহমানের ‘বন্দী শিবির থেকে’ কবিতাগ্রন্থে।

স্বীকার করতে হবে শামসুর রাহমানের কবিতায় স্বদেশ একটি মুখ্য বিষয়। বাঙালি জাতি যখন একটি অস্তিত্বের বিভাজন রেখার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, সেই প্রাক একাত্তরের মাতৃভাষা ও স্বাধিকার আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ সময়ে কবির ভাবনা এবং জাতি যখন স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই দুর্জয় চেতনাকে কবি কীভাবে দেখেছেন তার সাক্ষ্য বহন করছে রাহমানের ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্য। জীবনের যোগাযোগে গভীরতর সঞ্চালনে শামসুর রাহমান নিজেকে পুরোমাত্রায় সক্রিয় রেখেছিলেন। ফলে বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা সংগ্রামকে নিয়ে কবি শামসুর রাহমান রচনা করেছেন সম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্র কাব্য। আর স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যটি বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, অমোঘ মুক্তির বারতা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads