• বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২০, ১ শ্রাবণ ১৪২৭
ads
স্বাধীনতার আন্দোলন সাংস্কৃতিক আন্দোলন

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

জার্নাল জনান্তিকে

স্বাধীনতার আন্দোলন সাংস্কৃতিক আন্দোলন

  • মাসুদুজ্জামান
  • প্রকাশিত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

শুরু হয়েছিল সেই বায়ান্নতে। সমাপ্তি একাত্তরে। এই ডিসেম্বরে। এভাবেই বাংলাদেশ ভাষা আন্দোলন থেকে পৌঁছে গেছে স্বাধীনতায়। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তান আন্দোলনের প্রায় শুরু থেকেই নিজেদের স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এ প্রসঙ্গে যথার্থই বলেছেন প্রখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তক আবদুর রাজ্জাক, ‘বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশটি [বাংলাদেশের মানুষ] ... শেষ পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে নিজের মিলিত হওয়ার পক্ষে রায় দিল, তবে কিছু বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করেই। তার এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ভাষা আন্দোলনের জন্ম দিল যার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ।’ খুবই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে এই উক্তিটি। কিন্তু কীভাবে ঘটেছিল এই জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনা?

ঐতিহাসিক দিক থেকেই দেখা যায়, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে পূর্ববাংলার মানুষের সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল সার্বিকভাবে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক — শৃঙ্খল ছিল সবক্ষেত্রে। পরাধীন করে রাখার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ঘটেছিল এটা। সাতচল্লিশের ভারত বিভাগের আগে উনিশ শতকের শুরু থেকে যে বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তশ্রেণি বিকাশ লাভ করেছিল, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সৃষ্টিতে তারা উল্লসিত বোধ করে। কেননা, এর আগে বাংলাদেশের মানুষ সার্বিকভাবে কখনো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব লাভ করেনি। কিন্তু অবাঙালি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী, আমলা ও পুঁজিপতি শ্রেণি জন্মলগ্ন থেকেই নিয়ন্ত্রণ ও কুক্ষিগত করতে শুরু করল পূর্ববাংলার রাষ্ট্রক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক কাঠামো।

প্রাথমিক প্রয়াস হিসেবে ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র রচনার লক্ষ্যে পাকিস্তান গণপরিষদে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। তাতে উল্লেখ ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে ইসলাম এবং এর রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এরপর ঘটে সেই ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন। উপরিতল থেকে দেখলে ভাষা আন্দোলন ছিল সাংস্কৃতিক আন্দোলন, কিন্তু মর্মে ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক। আবদুর রাজ্জাকের ভাষ্য অনুসারে, ‘...ভাষা আন্দোলন, যা কিনা পরবর্তীকালে জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে, আমাদের সাহিত্যে বর্ণিত আশা-আকাঙ্ক্ষা তার পেছনে একটা চালিকাশক্তি হতে পারতো এবং হয়েছে।’ এই যে তুলনাসূত্র, এ থেকেই বোঝা যায়, ভাষার ওপর ভিত্তি করেই একাত্তরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু এখনো আগে মার্কসবাদী আর এখন মৌলবাদী কোনো কোনো তথাকথিত বুদ্ধিজীবীকে বলতে শোনা যায়, বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটেছিল ধর্মের ভিত্তিতে, ভাষার ভিত্তিতে নয়। এরা প্রকৃতপক্ষে প্রগতির মুখোশ পরা থাকলেও ভেতরে ভেতরে ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক এবং চরম প্রতিক্রিয়াশীল।

বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে এই বিভ্রান্তি পাকিস্তানি শাসনামলেও দেখা গেছে। এদের মূল লক্ষ্য ছিল আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ঐতিহ্য, প্রবহমানতা ও মানবিকতাকে অগ্রাহ্য করে ইসলামী বা পুঁথিসাহিত্যের আদলে ‘মুসলমানি সংস্কৃতি’র প্রবর্তন করা। ফলে বুর্জোয়া মানবতাবাদী এবং প্রগতিশীল চেতনায় দীক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি প্রতিক্রিয়াশীল ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল। এরই অনিবার্য পরিণতি হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষানীতির বিরুদ্ধে বায়ান্ন সালে সংঘটিত হলো রক্তক্ষয়ী সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলন। স্বাধীনতার বীজ সেই প্রথম রোপিত হয়ে যায়।

পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনপর্বে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সামনে তখন মূলত তিনটি পথ খোলা ছিল : প্রথমত, পাকিস্তানি শাসকচক্রের সঙ্গে আপস করে সাম্প্রদায়িক ও নিপীড়নমূলক সামন্ত শাসনকে বৈধতা দেওয়া; দ্বিতীয়ত, নব্য-ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে (গোপনে বা প্রকাশ্যে) পূর্ববাংলাকে স্বাধীন করা; তৃতীয়ত, সমকালীন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাত থেকে পালিয়ে গিয়ে আত্মবিবরে আশ্রয় নিয়ে নিরাপদ থাকা। বাংলাদেশের সমকালীন বুদ্ধিজীবীরা মূলত এভাবেই তিনটি ধারায় বিভক্ত ছিলেন। বিশেষ করে যেসব কবি, লেখক পাকিস্তান আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থন করেছিলেন, তারা ছিলেন ওই প্রথম ধারার বুদ্ধিজীবী। এদের কেউ কেউ এইসময়ে আত্মবিবরে গিয়ে নিরাপদ থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু দেশবিভাগের পর পূর্ববাংলায় শিক্ষিত বুদ্ধিদীপ্ত যেসব তরুণ লেখক-কবির আবির্ভাব ঘটছিল, তারা ওই দ্বিতীয় ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে তাদের লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কবল থেকে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মুক্ত করা। এই সময়ে মার্কসবাদী আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন অনেকটা একীভূত হয়ে যায়। শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত রাজনৈতিক ভাবনা, দূরদর্শিতা এবং নেতৃত্বের অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণে শুরু হয়ে যায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন।

রাষ্ট্রচিন্তক আবদুর রাজ্জাক ঠিকই বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ একটা জাতি আর তারা জাতি হতে চেয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় জাতি-পরিচয়ের মধ্যে বিলুপ্ত না হয়ে তারা পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিল। তার মতে, ‘এই জনগণেরই ব্যাপক অংশ আর পাকিস্তানি জাতিসত্তার ভেতর নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হতে দিতে রাজি হয়নি।’ শেখ মুজিবুর রহমানই ছিলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাজ্জাকের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ‘কেন্দ্রীয় চরিত্র’, অর্থাৎ নেতা। তিনি যে রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ সৃষ্টির কথা ভেবেছিলেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। এদিক থেকে ভাবলে, সর্বভারতীয় জাতিসত্তা নয়, পাকিস্তানের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার মধ্যে নয়, তিনি চেয়েছিলেন উগ্র ধর্মীয় ভাবাবেগমুক্ত, আধুনিক উদারনৈতিক একটা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে। ‘বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন সেই প্রতীক যার চারদিকে নিঃসহায় এক উদ্দেশ্যের সমর্থকেরা একসঙ্গে জড়ো হয়েছিল। কিন্তু এটা কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না। ওই অন্ধকার দিনগুলোতে, ওই অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোতে, যে কোটি কোটি জনতা, যারা ভবিষ্যতের জাতিকে সৃষ্টি করবে তাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা দ্বিধা ছিল না। বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন প্রতীক।’ রাষ্ট্রচিন্তক রাজ্জাকের এই অন্তর্ভেদী বিশ্লেষণে, শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও নেতৃত্ব যে কতটা গভীর আর যথাযথ ছিল, তারই প্রতিফলন ঘটেছে। বাংলাদেশের মানুষ আর শেখ মুজিবুর রহমান এভাবেই সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন, এই কথাগুলো বলেছেন রাষ্ট্রচিন্তক আবদুর রাজ্জাক।

তবে বাংলাদেশের তরুণ বুদ্ধিজীবীরা বুঝতে পেরেছিলেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া সাংস্কৃতিক মুক্তিও সম্ভব নয়। আর সাংস্কৃতিক মুক্তি না ঘটলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠাও সম্ভবপর হবে না। ফলে গত শতকের ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী পুনর্জাগরণ, সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার বীজ এই সময়ে রোপিত হয়ে যায়, যার পরিণাম হিসেবে ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি এবং তীব্রতা অনুসারে বায়ান্ন পরবর্তী এবং স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়কালটি দুটি স্তরে বিভক্ত ছিল : ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল; এবং ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল। প্রথম সময়কালটি ‘কালো দশক’ এবং দ্বিতীয় স্তরটি ‘গণআন্দোলন’-এর কাল হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলনের মাত্র তিন বছরের মাথায় পূর্ব বাংলার জনগণ পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি অনাস্থা দেখিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে (১৯৫৪) ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু জনগণের ইচ্ছাকে ভূলুণ্ঠিত করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ১৯৫৮ সালে জারি করা হয় সামরিক শাসন।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন। এই আন্দোলনে ভীত হয়ে শেখ মুজিব এবং জাতীয়তাবাদের সমর্থক সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্য এবং উচ্চপদস্থ প্রশাসকদের কয়েকজনকে জড়িয়ে শুরু হয় ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। অভিযোগ করা হয় বাঙালির এই নেতৃত্ব ‘স্বাধীন পূর্ববাংলা’ প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল। প্রকৃতপক্ষে এই অভিযোগ ছিল জাতিগত নিপীড়নের নতুন কৌশল। ফলে এর বিরুদ্ধে শুরু হয়ে যায় গণআন্দোলন। রাজনীতি থেকে বিদায় নেন জেনারেল আইয়ুব খান, ক্ষমতা গ্রহণ করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান। এরপর ১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ অভূতপূর্ব বিজয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পথে আরো একধাপ এগিয়ে যায়। পাকিস্তানের নেতৃত্ব শেখ মুজিবকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পূর্ববাংলা জুড়ে শুরু হয়ে যায় দুর্বার আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্সের প্রতিবাদী বিশাল জনসমাবেশে শেখ মুজিব ঘোষণা করলেন : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর পূর্ববাংলা অর্জন করে স্বাধীনতা। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটল বাংলাদেশের। সব মিলিয়ে এই স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক ছিল না, ছিল সাংস্কৃতিকও, বাঙালি এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর আত্মমুক্তির স্বাধীনতা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads