• সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
সন্তানের জন্য পারিবারিক পরিচর্যার গুরুত্ব

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

সন্তানের জন্য পারিবারিক পরিচর্যার গুরুত্ব

  • গাজী শরিফুল হাসান
  • প্রকাশিত ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮

পরিবার হচ্ছে শিশুর প্রথম পাঠশালা। পরিবার শিশুর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সুস্থ জাতি গঠনে সুদূরপ্রসারী অবদান রাখে। পরিবারে শিশু শুধু মা-বাবার নিবিড় সান্নিধ্যই পায় না, আচার-আচরণ, নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ সম্পর্কে শিশু পরিবার থেকেও শিখতে পারে। শিশুর পারিবারিক ভিত্তি তার জীবনব্যাপী দিকনির্দেশনার নিয়ামক শক্তি। পরিবারের গণ্ডিতে অবোধ শিশু তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকেই অনেক কিছু আয়ত্ত করে। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়বোধ, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য এমনকি জীবন গড়ার নিশানাও সে নির্ধারণ করে এই সীমাবদ্ধ বলয় থেকেই। আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত সমাজের এই অকৃত্রিম প্রতিষ্ঠানটি দেশ ও একটি সমৃদ্ধ জাতি বিনির্মাণে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে আসছে। তাই শিশুর কাছে দেশ বা অন্য দেশ সবখানেই পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং সর্বজনবিদিত।

দেশকালের রকমভেদে পরিবারের ধরনও ভিন্ন রকম হয়। প্রাচীনকাল আর বর্তমান যুগের সমাজব্যবস্থা একরকম নয়। ফলে পরিবার একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হলেও নিয়তই পরিবর্তনশীল। যুগের সঙ্গে সব সময়ই তাল মিলিয়ে চলতে হয়। সেভাবে পরিবারের ক্ষুদে সদস্যদেরও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রজন্মের ব্যবধান।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগের শৈশব-কৈশোর আর বর্তমান প্রজন্মের শিশুর এই সময়টি এখন আকাশপাতাল তফাৎ। অভিভাবক আর সন্তানদের মধ্যে ব্যবধানও অনেক। একান্নবর্তী পরিবারে একজন শিশু বেড়ে ওঠে সর্বজনীন আদর্শিক বোধ নিয়ে। এটাই শিশুর পারিবারিক এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের থেকে প্রাপ্ত দীক্ষা। শিশুদের আলাদাভাবে প্রাধান্য দেওয়া তখন তেমনভাবে প্রচলিতও ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেবেলায়’ উল্লেখ আছে, তিনি অন্য দশটি সাধারণ শিশুর মতোই তিনি বেড়ে উঠেছেন, জমিদারের কনিষ্ঠ সন্তানের দাপট নিয়ে নয়। কড়া শাসন আর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অতি প্রয়োজনীয় প্রাপ্তি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যেত না। এখনকার অভিভাবকরাও সেভাবেই বড় হয়েছেন। পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে নিজের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবৃত্তি কখনো জাগেনি। আর শিক্ষার ব্যাপারটিও ছিল একেবারে পরিবারের কর্তা-কর্ত্রীর। অবশ্য তখনকার দিনের গৃহিণী মায়েরা অতখানি আধুনিক কিংবা অধিকার সচেতনও ছিলেন না। অল্পশিক্ষিত কিংবা প্রায় অশিক্ষিত মায়েরা সন্তানের লেখাপড়ার ব্যাপারে তেমন মাথা ঘামাতেন না। বাবা তার ইচ্ছা এবং আদর্শিক বোধ সন্তানদের সামনে তুলে ধরতেন। আর ছেলেমেয়েরা তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারত।

মাত্র দুই যুগ আগেও পারিবারিক পরিবেশ ছিল অন্যরকম। সন্তানদের যথার্থ পরিচর্যা কিংবা স্নেহযত্নের অভাব কোনো কালেই ছিল না। তবে তারাই যে সংসারের মূল এমনটি ভাবারও কোনো অবকাশ কখনো হয়নি। যিনি পরিবারের প্রধান তার মর্যাদা, সম্মান এবং স্থান ছিল সবার ওপরে। সেটা খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা সঙ্গত কারণে তার দিকেই যেত। সেটা যেমন বয়সের কারণে পাশাপাশি উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ার জন্যও। ছেলেমেয়েরা বুঝত বাবা কষ্ট করে আয় করছেন তাদের যথার্থভাবে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য।

পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে এক সময় সন্তানদের প্রবেশ করতে হতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তারও আগে ধর্মীয় শিক্ষাও পরিবার থেকেই দেওয়া হতো। যার জন্য কখনো মক্তব, মাদরাসা কিংবা কোনো উপসনালয় অবধি যেতে হয়নি। পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা আর অভিভাবকদের সজাগ দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতিতে আজ বর্তমান প্রজন্ম অপরাধ জগৎ কিংবা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এটাও পারিবারিক অসংহতি কিংবা চাকরিজীবী পিতামাতার সময়ের স্বল্পতায় সন্তানের প্রতি সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি নতুন প্রজন্মকে সর্বনাশা সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তৎকালীন অভিভাবকরা স্বাধীনচেতা হিসেবে সন্তানদের বড় করলেও সজাগ সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন যাতে কোনো অশনিসঙ্কেত জাতির ভবিষ্যৎদের জীবন বিপন্ন করতে না পারে।

শিক্ষাজীবনের অনুপ্রবেশ শিশুদের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এ সময় সবথেকে বেশি নজর রাখতে হয় শিশুদের। মানসম্মত শিক্ষা ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন গড়ার সত্যিকারের নির্ণায়ক। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। এমন একটি বাক্যের ভাবসম্প্রসারণ করতে করতেই ছাত্রজীবনের প্রাথমিক স্তর পার করতে হয়েছে। কোচিং শব্দটি তখন প্রায় অজানা। পারিবারিক আবহে শিশুরা শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে নিত। বাকি দায়িত্ব পালন করতেন স্কুলশিক্ষকরা। আর দুর্বল এবং কিছুটা অমনোযোগী ছাত্রের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিতেন গৃহশিক্ষক। তারা যথার্থভাবেই ছেলেমেয়ের সযত্ন পরিচর্যায় লেখাপড়ার পর্বটি সামলে নিতেন। আর বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোনোভাবেই তাদের দায়বদ্ধতাকে এড়িয়ে যেতেন না। স্কুলে এবং প্রায় প্রতিটি ঘরে পাঠ্যবই ছাড়াও জ্ঞানচর্চার হরেকরকম গ্রন্থ ছেলেমেয়েদের হাতের নাগালে থাকত। কারণ, তখন হাতের মুঠোয় সারাবিশ্ব ছিল না (স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ইত্যাদি)। তখন বই পড়ে কষ্ট করে সবকিছু জেনে নিতে হতো।

এখন শিশু-কিশোররা পরিবার থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না, সময়ই বা কোথায়? কোচিং আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত চাপের মুখে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা হয়, সেখানে ঠান্ডা মাথায় অন্য কোনো শিক্ষা তাদের আগ্রহী করে না। প্রতিযোগিতার যুগে অভিভাবকরা নিজেরাও চান না তার সন্তান শিক্ষার্জনের পেছনে ছুটে বেড়ানো ছাড়া অন্য কিছু করুক। পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তারা দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। কখনো অঙ্কের মাস্টার, কখনো ইংরেজি কোচিং। গোল্ডেন কিংবা জিপিএ-৫ পেতে তাদের যেভাবে এক কোচিং থেকে অন্য কোচিংয়ে ছুটতে হয় খাওয়া, ঘুম বিসর্জন দিয়ে। বিত্তবান অভিভাবকরা বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে সন্তানসহ মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে নেন। মায়েদেরই বা এত সময় কোথায় রান্নাবান্নার দিকে নজর দেওয়ার। ফলে যথার্থ পরিবার হয়ে যায় এক বিচ্ছিন্ন, অসংহত এবং অসঙ্গতির একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে সুস্থ স্বাভাবিক পথে শিশু-কিশোরদের মেধা ও মনন বিকাশের সুযোগ নেই বললেই চলে।

বাবা-মাকে শিক্ষার অসুস্থ প্রতিযোগিতা, কোচিং এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অশুভ কার্যক্রমের আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসাটা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষা কার্যক্রম একটি বিকাশমান ধারা, যা কোনো সীমাবদ্ধ আলয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।

শিক্ষার্জনের যথার্থ নিয়ম ও বিধি অনুসরণ করে শিশু-কিশোরদের মেধা ও মনন বিকাশে, মুক্ত পরিবেশে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত করাই একমাত্র ব্রত হওয়া উচিত।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম নিবন্ধ)

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads