• শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
সুখীর এগিয়ে চলা...

নতুন বছরে নতুন পাঠ্য বই পাবে। কিন্তু এখনও বই পেতে অনেক দেরি। তাই পুরনো ভিজে যাওয়া বই, নোট সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে নিচ্ছে সুখী

ছবি : বাংলাদেশের খবর

ফিচার

সুখীর এগিয়ে চলা...

  • মিলন কর্মকার রাজু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
  • প্রকাশিত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮

বাড়ির উঠানে হোগলা বিছিয়ে রোদে শুকাচ্ছে পুরনো বইখাতা ও নোট। তার পাশে বসে বইয়ের একেকটি পৃষ্ঠা উল্টে মনোযোগ সহকারে তা দেখছে সুখী। কখনো বা খাতার শেষ পৃষ্ঠায় নোট নিচ্ছে। নতুন শিক্ষাবর্ষ, নতুন শিক্ষা-সংগ্রামে সে যাতে পিছিয়ে না পড়ে, তাই পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই সুখী শুরু করেছে পুরনো বই দিয়ে নতুন বছরের পাঠদান। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার তুলাতলী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এ বছর সপ্তম শ্রেণিতে বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েছে সুখী।

কলাপাড়ার রামনাবাদ নদীঘেঁষা প্রত্যন্ত চর বালিয়াতলী গ্রাম থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন কিলোমিটার পায়ে হেঁটে স্কুলে আসা যাওয়া করতে হয় সুখীকে। যে গ্রামে তার বয়সী ছেলেমেয়েরা সকাল হলেই কেউ মাছ ধরে, মাছ শুকোয়, কেউবা মাঠে ধান কুড়োয়। শিক্ষার আলোবঞ্চিত সুখীর পরিবারের মতো গোটা গ্রামে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে কৈশোরই উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখচ্ছে সুখী।

ক্ষুদ্র জেলে অহিদুল হাওলাদারের চার সন্তানের মধ্যে বড় সুখী (১৩)। মেজো ছেলে হামিদুল দ্বিতীয় শ্রেণিতে ও ছোট দুই ছেলে জুনায়েদ ও জিয়াদ শিশু শ্রেণির ছাত্র। আর্থিক দীনতায় তার লেখাপড়া না হলেও ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন এ স্বপ্ন সুখীর বাবার।

কলাপাড়া সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে বালিয়াতলী ইউনিয়নের রামনাবাদ নদীঘেঁষা গ্রাম চর বালিয়াতলী। এ গ্রামের পাশেই সাগর মোহনায় জেগে উঠেছে চর হাবিব। যেখানে শতশত ছেলে-মেয়ে সকাল হলেই কেউ মাছ ধরে, কেউবা ধান ক্ষেতে ধানের ছড়া কুড়োয়। সিডর ও আইলায় এ দুটি গ্রামই ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু সাগর, নদী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকা পরিবারগুলোর স্থায়ী কর্মসংস্থান না থাকায় শ্রমবিক্রি ও মাছ ধরেই সংসার চালাতে হয়। এ কারণে এসব পরিবারের সন্তানরা প্রাথমিকের গণ্ডি না পেরোতেই শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাই চরহাবিব ও চরবালিয়াতলী গ্রামে বাল্যবিয়ে ও শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেশি।

এ চরেরই কিশোরী সুখী। যেখানে তার বয়সী অনেক স্কুল-মাদরাসা ছাত্রীর বাল্যবিয়ের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে, সে গ্রামে তাকে একাই উচ্চশিক্ষার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। সুখী যখন বাড়ির উঠানে বই শুকাতে ব্যস্ত তখন তার সাথে কথা হয়। সুখীর ভাষ্য, ‘প্রাইমারিতে যখন পড়তাম, তখন কত ছেলেমেয়ে এক সাথে স্কুলে যেতাম। কিন্তু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে কমতে থাকে সহপাঠীর সংখ্যা। এখন তো এই গ্রাম থেকে আমাকে একাই স্কুলে যেতে হয়। আমার সাথে পড়ত অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। কারো বিয়ে ঠিক হওয়ায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ছেলেরা এখন কেউ রাজমিস্ত্রী, কৃষক, কেউ মাছ ধরে।’

সুখী জানায়, অনেক দূর থেকে ক্লাস এইটের পুরনো বই, নোটখাতা সংগ্রহ করেছি। গ্রামে থাহি। প্রাইভেট তো পড়তে পারি না। দূরে স্কুল হওয়ায় কোচিং ক্লাসেও যাই না। তাই এইটের বইখাতা এনে শুকিয়ে অংক, ইংরেজি বোঝার চেষ্টা করছি। আমাকে তো একা একাই পড়তে হয়, তাই পরীক্ষা শেষে দেরি না করে পড়া শুরু করেছি।

সুখীর আর্তি, যে গ্রামে থাহি এইহানে পড়াশোনার দাম নাই। কিন্তু আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই। বাবা গরিব। কিন্তু আমাকে পড়াশোনায় অনেক উৎসাহ দেয়। কিন্তু গ্রামে সামাজিক সমস্যা (অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা), পারিবারিক দীনতা সবসময় দরজায় কড়া নাড়ে। সেখান থেকে কতদূর যেতে পারব এটাই দুশ্চিন্তা।

সুখীর মা আসমা বেগম বলেন, ওতো (সুখী) পড়তে চায়। রোজ কতদূর হাইট্টা স্কুলে যায়। মাইয়া বড় হইছে। একা একা স্কুলে পাঠাইতে ভয়ও করে। কিন্তু মেয়ে পড়াশোনা ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। শুধু কি পড়া, অবসরে ঘরের বিভিন্ন ফেলনা উপকরণ যেমন (কলম, স্যালাইনের পাইপ, প্লাস্টিকের বোতল) ইত্যাদি জিনিস দিয়ে তৈরি করে গৃহসজ্জার বিভিন্ন উপকরণ। এছাড়া সুঁই-সুতোর নিপুণ কারুকাজে ঘর ও জানালার পর্দায় ফুটিয়ে তোলে নানা শিল্পকর্ম। মাইয়াডারে ঈদ-কোরবানিতে ভালো একটা জামা দিতে না পারলেও কষ্ট পায় না। পড়ালেখার বই-খাতা-কলম পেলেই সুখীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু অনেক সময় তাও দিতে পারি না।

সুখীর বাবা অহিদুল হাওলাদার বলেন, ইচ্ছা তো আছে মাইয়াডারে পড়ামু। আমরা স্কুলে যাইতে পারি নাই টাহার কারণে। গায়ে যতদিন শক্তি থাকবে সুখীরে পড়ামু। ওতো ছোডকাল হইতেই স্বপ্ন দ্যাখতো ডাক্তার হইব। ডাক্তার বানাইতে কয় টাহা লাগে জানি না, ল্যাহাপড়া শিইখ্যা যাতে গ্রামের নাম উজ্জ্বল করতে পারে এটাই এখন তার স্বপ্ন।

স্কুলশিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, সুখী ছোট থেকেই অনেক মেধাবী। সুখীর অনেক সহপাঠী বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দিলেও সুখী একাই সংগ্রাম করছে এখন। কিন্তু পারিবারিক দীনতায় কতদূর এগোতে পারবে এটাই এখন প্রশ্ন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads