• শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
বিদায়ী বছর ২০১৮-এর নারীচিত্র

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

বিদায়ী বছর ২০১৮-এর নারীচিত্র

  • মনিরা তাবাস্সুম
  • প্রকাশিত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮

আর একদিন বাদেই চলতি বছরের শেষ সূর্যাস্ত দেখব আমরা। সূর্যোদয় হবে আরো একটি নতুন বছরের। কেমন ছিল ২০১৮ সালটি। নানা রকম প্রাপ্তি, ঘটনা আর দুর্ঘটনার মিশেলে বছরটি বিদায় নিচ্ছে। বছরজুড়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা যেমন রেখেছেন তাদের অবদান, বিশ্ব দরবারে হয়েছেন পুরস্কৃত ও সমাদৃত, তেমনি নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রাও ছিল ভয়াবহ।

হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে অহরহ। তিন বছর বয়সী কন্যাশিশুটি থেকে শুরু করে বাদ পড়েনি ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক মহিলাটিও। শিশু ধর্ষণ বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের প্রথম তিন মাসেই ধর্ষিত হয়েছে মোট ১৭৬টি শিশু। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৫৫টি করে এবং মার্চে ৬৬টি শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। এই পরিসংখ্যান অতীতের যে কোনো রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। ধর্ষিত ১৭৬ জন শিশুর মধ্যে এক থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ১৫ জন, ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ৩৭ জন এবং ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে রয়েছে ৫৭ জন। সারা দেশে ২০১৮ সালের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮৭ নারী। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৯ জনকে আর আত্মহত্যা করেছেন দুজন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বছর শেষে এর সংখ্যা কতখানি বেড়েছে তা সহজেই অনুমেয়।

এছাড়া বছরের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত নারীরা চরম বর্বরতার শিকার হয়ে নিস্ব হাতে ফিরে আসতে হয়েছে দেশে।

প্রাপ্তির খাতাটি যে একেবারেই শূন্য ছিল তা কিন্তু নয়। খেলাধুলায় নারীদের জন্য বছরটি ছিল উল্লেখযোগ্য। নারী এশিয়া কাপে গত ছয়বারের চ্যাম্পিয়ান অপ্রতিরোধ্য ভারতকে হারিয়ে এশিয়া কাপ জয়ের গৌরব অর্জন করে। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে ভারতকে দুবার ও পাকিস্তানকে একবার পরাজিত করেছে তারা। এছাড়া জয় তুলে নিয়েছে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার বিপক্ষেও। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত নারী এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টির ফাইনালে ভারতের বিরুদ্ধে জয় নারী ক্রিকেটারদের জন্য ছিল এক অনন্য অর্জন। এশিয়া কাপ জয়, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জয়। জুলাইয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের চ্যাম্পিয়নও হয়েছেন।

প্রাপ্তিতে সমুজ্জ্বল ছিল প্রমীলা ফুটবল দলও। সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে নেপালকে ১-০ গোলে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৮ নারী দল। এই আসরে দুর্দান্ত শুরুটা হয়েছিল পাকিস্তানকে ১৭-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে। পুরো টুর্নামেন্ট চমৎকার খেলে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশের নারীরা। ‘বি’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেমিফাইনালে ওঠার পথেও এর আগে নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর সেমিতে স্বাগতিক ভুটানকে ৪-০ গোলে হারিয়ে টিকিট পায় ফাইনালের। আর জমজমাট লড়াইয়ে নেপালের বিপক্ষে ১-০ গোলে জিতে পেল মর্যাদার শিরোপার স্বাদ।

এ ছাড়া হংকং এ জকি ক্লাব অনূর্ধ্ব-১৫ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দল অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এ বছর রাজনীতিতে নারীর আগ্রহ এবং অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রতিনিধিসহ যেকোনো নির্বাচনেই নারীরা অংশগ্রহণ করেছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এরই ধারাবাহিকতায় নগর পরিচালনার গুরুদায়িত্বে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র এবং কাউন্সিলর পদে এবার নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।

দেশীয় রাজনীতিতে তো বটেই, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে নিজেকে তুলে ধরেছেন স্বমহিমায়। বিশ্বের গণতন্ত্রের সূতিকাগার যুক্তরাজ্যের হাউজ অব কমন্স। সাতাশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ সংসদ আলোকিত করে আছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিন নারী ুরুশনারা আলি, টিউলিপ সিদ্দিক ও রুপা হক। এ বছর জুনে কানাডার প্রাদেশিক নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন। টরন্টো ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে উন্নয়ন, প্রশাসন ও পরিকল্পনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। পড়ালেখা শেষ করার পর সিটি অব টরন্টোতে প্রায় দশ মাস কাজ করেন। এ ছাড়া স্কারবরোর হেলথ কোয়ালিশন এবং ওয়ার্ডেন উডস কমিউনিটি সেন্টারের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করছেন। ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট ইউনিয়নেরও প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন অন্টারিও ভলান্টিয়ার সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড, সিটি অব টরন্টো স্পটলাইট, সাউথ এশিয়ান ইয়ুথসহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার। ৭ জুন অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ডলি বেগম  প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী গ্রে এলিয়েসকে প্রায় ৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী ডলির প্রাপ্ত ভোট ১৯ হাজার ৭৫১। 

এ ছাড়া এ বছর রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আখ্যায়িত হন মাদার অব হিউম্যানিটি হিসেবে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানে মানবিক ও দায়িত্বশীল নীতির জন্য অনন্য নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মর্যাদাপূর্ণ ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘২০১৮ স্পেশাল ডিস্টিঙ্কশন অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাচিভমেন্ট’ দেওয়া হয়। বৈশ্বিক সংবাদ সংস্থা ইন্টার প্রেস সার্ভিস (আইপিএস) প্রধানমন্ত্রীকে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড এবং নিউইয়র্ক, জুরিখ ও হংকংভিত্তিক একটি অলাভজনক ফাউন্ডেশনের নেটওয়ার্ক গ্লোবাল হোপ কোয়ালিশন ‘২০১৮ স্পেশাল ডিস্টিঙ্কশন অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাচিভমেন্ট’ সম্মাননা দেয়। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে দাতব্য সংগঠন ‘গ্লোবাল হোপ কোয়ালিশন’ (Global Hope Coalition) -এর পরিচালনা পর্ষদ শেখ হাসিনাকে ‘স্পেশাল রিকগনিশন ফর আউটস্ট্যান্ডিং লিডারশিপ’ অ্যাওয়ার্ড’ (Special Recognition for Outstanding Leadership award) প্রদান করেন। এ বছর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল সামিট অব উইমেন-এর পক্ষ থেকে নারী নেতৃত্বের সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে ‘গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কার প্রদান করে। ফোর্বসের পর্যবেক্ষণে বিশ্বের ক্ষমতাধর ১০০ নারীর তালিকায় শেখ হাসিনার অবস্থান ২৭তম। এ ছাড়া ২০১৮ সালে টাইম ম্যাগাজিনে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় লিডার্স ক্যাটাগরিতে ২৭ জন ব্যক্তির মধ্যে শেখ হাসিনা ২১তম স্থানে রয়েছেন।

৩৬৫ দিনের দীর্ঘ পরিক্রমা শেষে বন্ধ হতে যাচ্ছে ২০১৮ সালের বর্ষপুঞ্জি। আসছে বছরে নারীর প্রতি সকল প্রকার অত্যাচারনিপীড়ন  যেন শেষ হয় সে প্রত্যাশাই সকলের। নারীর জন্য ভয়হীন এক সমাজিক পরিবেশ যেন আসছে বছরে তৈরি হয় সেই আশায় বুক বাঁধি। নারীর সাফল্যে আলোকিত হোক বাংলাদেশ।   

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads