• বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬
ads
কিংবদন্তি মরমি কবি ও বাউলদের জন্মস্থান

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

কিংবদন্তি মরমি কবি ও বাউলদের জন্মস্থান

  • প্রকাশিত ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সুনামগঞ্জের ইতিহাস অতি প্রাচীন। অসংখ্য কিংবদন্তি এবং ঐতিহাসিক ঘটনা ও তথ্যাবলিতে সমৃদ্ধ। সুনামগঞ্জের বিশাল ভূখণ্ড যে সাগরবক্ষ থেকে জেগে উঠেছে, সেই সাগরকে ‘কালিদহ’ সাগর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ কালিদহ সাগর সুনামগঞ্জ জেলার সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল। জেলার প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর। অথৈ পানি, জলাবন, নীল আকাশ, পাহাড় ও চোখজুড়ানো সবুজ এই হাওরকে অপরূপ সাজে সাজিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জের ইতিহাস খুব সমৃদ্ধ। মহান মুক্তিযুদ্ধে সীমান্তবর্তী ডলুরা ছিল সুনামগঞ্জের অন্যতম রণাঙ্গন। শহীদের স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ডলুরা শহীদ মাজার। এ জেলায় জন্মেছেন সাধক কবি, বৈষ্ণব বাউল, ধামালি নৃত্যের প্রবর্তক রাধারমণ দত্ত; মরমি কবি এবং বাউলশিল্পী হাসন রাজা ও বাউল গানের কিংবদন্তি শাহ আবদুল করিম। এ জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মাটি ও মানুষের তথ্য নিয়ে আজকের আয়োজন গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেছেন সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন

 

‘সুনামদি’ নামক জনৈক মোগল সিপাহির নামানুসারে সুনামগঞ্জের নামকরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ‘সুনামদি’ (সুনাম উদ্দিনের আঞ্চলিক রূপ) নামের ওই মোগল সৈন্যের কোনো এক যুদ্ধে বীরোচিত কৃতিত্বের জন্য সম্রাট কর্তৃক সুনামদিকে এখানে কিছু ভূমি পুরস্কার হিসেবে দান করা হয়। তার দানস্বরূপ প্রাপ্ত ভূমিতে তারই নামে সুনামগঞ্জ বাজারটি স্থাপিত হয়েছিল। এভাবে সুনামগঞ্জ নামের ও স্থানের উৎপত্তি হয়েছিল বলে মনে করা হয়ে থাকে।

সুনামগঞ্জের ইতিহাস অতি প্রাচীন। অসংখ্য কিংবদন্তি এবং ঐতিহাসিক ঘটনা ও তথ্যাবলিতে সমৃদ্ধ। প্রাচীন ইতিহাস থেকে অনুমান করা হয়, সুনামগঞ্জ জেলার সমগ্র অঞ্চল এককালে আসামের কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। সুনামগঞ্জের লাউড় পরগনায় এখনো প্রবাদ হিসেবে কথিত আছে লাউড় পাহাড়ের উপরই কামরূপের রাজা ‘ভগদত্তে’র রাজধানী ছিল। এই ভগদত্ত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন বলেও কিংবদন্তি রয়েছে। টাঙ্গাইলের মধুপুর বনেও ওই রাজবাড়ীর চিহ্ন ছিল বলে জানা যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, এই ভগদত্ত ও মহাভারতের ভগদত্ত এক ব্যক্তি নন; বরং কথিত ভগদত্ত মহাভারতের অনেক পরের কালের মানুষ। এটাই সত্য। কারণ কিংবদন্তি ও ইতিহাস যেখানে মিল হবে না, সেখানে ইতিহাসকে ভিত্তি ধরাই বিধেয়। বৃহত্তর সিলেট সুদূর অতীতে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এ রাজ্যগুলো হচ্ছে লাউড়, গৌড় ও জয়ন্তিয়া।

অনুমান করা হয়, লাউড় রাজ্যের সীমানা বর্তমান সমগ্র সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহ এবং হবিগঞ্জ জেলার কিয়দংশ নিয়ে গঠিত ছিল। এ রাজ্যের রাজধানী ছিল লাউড়। সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর থানার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের হলহলিয়া নামে পরিচিত গ্রামে লাউড়ের রাজা বিজয় সিংহের বাসস্থানের ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন এখনো বিদ্যমান। স্থানীয়ভাবে এটি হাবেলী (হাওলী) নামে পরিচিত। লাউড় রাজ্যের নৌঘাঁটি ছিল দিনারপুর নামক স্থানে। এটি বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। রাজধানী লাউড় থেকে নৌঘাঁটি পর্যন্ত সারা বছর চলাচল উপযোগী একটি ট্রাংক রোডের অস্তিত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের সমর্থন পাওয়া যায়। সুনামগঞ্জের তদানীন্তন ডেপুটি ইন্সপেক্টর অব স্কুলস মুহাম্মদ ওয়াসিল ট্রাংক রোডের ধ্বংসাবশেষ থেকে এ তথ্য উদঘাটন করেছিলেন।

মনে করা হয়, লাউড় অধিপতি কর্তৃক এ ট্রাংক রোডটি নৌঘাঁটিতে সংযোগ স্থাপনের জন্যই নির্মিত হয়েছিল। অনুমান করা হয়, সুনামগঞ্জ জেলার বেশিরভাগ অঞ্চল এককালে একটি সাগরের বুকে নিমজ্জিত ছিল যা কালে কালে পলি ভরাটের কারণে ও ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সূত্র ধরে ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। সুনামগঞ্জের ভূগর্ভে চুনাপাথরের খনি ও কয়লা আবিষ্কারের ফলে এ ধরনের চিন্তার সক্রিয় সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া এখানকার শত শত হাওরের গঠনপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করেও এ মতের সমর্থন দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জের টেকেরঘাটে প্রাপ্ত চুনাপাথর একধরনের ক্যালসিয়াম যা সামুদ্রিক প্রাচীন শামুক ও শৈবাল দ্বারা সৃষ্ট। এতেও পূর্বোক্ত ধারণার পেছনে বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। প্রায় সব ঐতিহাসিক সূত্রমতে, সুনামগঞ্জের বিশাল ভূখণ্ড যে সাগরবক্ষ থেকে জেগে উঠেছে, সেই সাগরকে ‘কালিদহ’ সাগর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ কালিদহ সাগর সুনামগঞ্জ জেলার সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল। হাসন রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র খান বাহাদুর দেওয়ান গনিউর রাজা চৌধুরীর আত্মজীবনীমূলক রোজনামচাতেও এর উল্লেখ রয়েছে; রয়েছে বিভিন্ন আঞ্চলিক গান, পালা-পার্বণের অনুষ্ঠানগুলোতেও। সিলেটের কালেক্টর লিন্ডসের অষ্টাদশ শতাব্দীতে লেখা বর্ণনা থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ‘In the pre-historic days the southern part of Sadar Subdivision and the northern part of Moulavibazar and Habiganj Subdivision and nearly the entire Sunamganj Subdivision were a part of Bay of Bengal.’

হাওর শব্দটি সায়র (সাগর) থেকে এসেছে। বর্ষাকালে সুনামগঞ্জের হাওরগুলো এখনো সে রূপই ধারণ করে। সুদূর অতীতে এই কালিদহ সাগর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যার ওপর দিয়ে ১০১১ খ্রিস্টাব্দে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং জাহাজে করে সরাসরি তাম্রলিপ্ত থেকে সিলেট পৌঁছেছিলেন বলে তার লেখা থেকে জানা যায়। তার মতে, নহরী আজরক নামে একটি নদী কামরূপের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে হাবাং শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ নদী দিয়ে বাংলা ও গৌড়ে যাওয়া যেত। এ নদীকে প্রাচীন সুরমা বলে ঐতিহাসিকরা মনে করে থাকেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads