• সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাস ও সমতলভূমির চায়ে সমৃদ্ধ জেলা পঞ্চগড়

চা বাগান

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাস ও সমতলভূমির চায়ে সমৃদ্ধ জেলা পঞ্চগড়

  • সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন
  • প্রকাশিত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সভ্যতার উষালগ্ন থেকে পঞ্চগড় জনপদে মানব বসতি শুরু হয়েছে। এ অঞ্চলে দীর্ঘকাল ব্যাপ্ত পুণ্ড্র, গুপ্ত, পাল, সেন ও মুসলিম শাসকদের সংস্পর্শে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য প্রত্ন নিদর্শন। এসবের মধ্যেই রয়ে গেছে অতীতের বহু গৌরব-গাথা, বহু দীর্ঘশ্বাস ও প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যের অগণিত স্মৃতিচিহ্ন। পঞ্চগড় একসময় অর্থকরী ফসল আখ ও আনারস চাষের জন্য বিখ্যাত ছিল। ১৯৯০ দশকের পর থেকে সমতল ভূমি খনন করে পাথর উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে সমতল ভূমিতে ব্যাপকভাবে চা চাষ হচ্ছে। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া দেশের তৃতীয় চা অঞ্চল হিসেবে স্থান দখল করে নিয়েছে। জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মাটি ও মানুষের কথা নিয়ে আজকের আয়োজন গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেছেন সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন

বহু আবর্তন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পঞ্চগড় জেলার অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে এই ভূখণ্ডের পাশেই ছিল মগধ, মিথিলা, গৌড়, নেপাল, ভুটান, সিকিম ও আসাম রাজ্যের সীমান্ত। আধুনিককালের মতো অতীতকালেও জনপদটি ছিল সীমান্ত অঞ্চল। এই ভূখণ্ডটি পর্যায়ক্রমে শাসিত হয়েছে প্রাগ-জ্যোতিষ, কামরূপ, কামতা, কোচবিহার ও গৌড় রাজ্যের রাজা, বাদশা, সুবাদার এবং বৈকুণ্ঠপুর অঙ্গরাজ্যের দেশীয় রাজা ও ভূস্বামীদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকের মধ্যে রাজা ‘শালিবাহন’, রাজা ‘পৃথু’ এবং রাজা ‘জল্লেশ’ পঞ্চগড়ের শালবাহান ও ভিতরগড় এলাকায় রাজ্য, নগর ও সমৃদ্ধ জনপদ গড়ে তুলেছিলেন। মৌর্য, গুপ্ত ও পাল (দেবপাল ধর্মপাল) রাজন্যবর্গও এই অঞ্চল শাসন করেছিলেন। মধ্যযুগের শুরুতেই প্রথম মুসলিম বঙ্গবিজয়ী সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন খলজি তার বহু বিতর্কিত তিব্বত অভিযানের একপর্যায়ে পঞ্চগড় জনপদের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন বলে জানা যায়। ষোড়শ শতকে কোচবিহার রাজ্য গঠিত হওয়ার পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত পঞ্চগড় অঞ্চল মূলত কোচ রাজন্যবর্গের দ্বারাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাসিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পঞ্চগড় থানাটি দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮০ সালে ঠাকুরগাঁও মহকুমার ৫টি থানা তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড় সদর, আটোয়ারী, বোদা ও দেবীগঞ্জ নিয়ে পঞ্চগড় মহকুমা সৃষ্টি হয়। মহকুমার সদর দফতর পঞ্চগড় থানায় স্থাপিত হয়। ১৯৮৪ সালে পঞ্চগড় মহকুমা জেলায় উন্নীত হয়।

একটি শহরকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যেসব উপাদান প্রয়োজন, তার সবই বিদ্যমান রয়েছে পঞ্চগড় জেলায়। পঞ্চগড়ের মানুষজন অতি সহজ-সরল এবং অতিথিপরায়ণ। পঞ্চগড়ে রয়েছে সমতল ভূমিতে চা বাগান। রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র রকস মিউজিয়াম। মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ডাকবাংলো, যেখান থেকে দুই বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। সুলতান হোসেন শাহ এবং কামতার রাজা নীলধ্বজ তেঁতুলিয়া থানার দেবনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে কোনো কোনো ঐতিহাসিক মত প্রকাশ করেন। সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেশাহ, সুলতান বারবক শাহ, শেরশাহ, খুররম খাঁ (শাহজাহান), মীরজুমলা, সুবাদার ইব্রাহীম খাঁ ফতে জং এবং অন্ত মধ্যযুগে দেবী চৌধুরাণী, ভবানী পাঠক, ফকির মজনুশাহ প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পঞ্চগড় জনপদের নাম ও স্মৃতি নিবিড়ভাবে জড়িত।

পঞ্চগড় জেলা উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলের ভূ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জনপদ। এ জেলা সংলগ্ন জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলায় টারসিয়ারি যুগের পাথর পাওয়া গেছে। এ সময়ের পাথরের মধ্যে রয়েছে বালি পাথর, চুনা পাথর, কাদা পাথর ইত্যাদি। এ ধরনের পাথর পাওয়া যায় পঞ্চগড় জেলার ভূ-ভাগে। বাংলার প্রাচীন জনপদগুলোতে ভৌগোলিক অবস্থিতি অনেকাংশে ভূ-প্রকৃতি এবং বিশেষ করে নদীর স্রোত দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। পঞ্চগড় জেলার প্রধান পাহাড়ি নদী করতোয়া, ডাহুক, চাওয়াই, মহানন্দা, বর্ষাকালে দুই কূল প্লাবিত করে নিয়ে আসে পাথরের বালি ও নুড়ি পাথর। পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় ৫-৬ ফুট মাটির নিচেই পাথর এবং পানিশাল কাঠের সন্ধান পাওয়া যায়।

 

ভাষা ও সংস্কৃতি

বর্তমানে পঞ্চগড় অঞ্চলে প্রচলিত শব্দাবলি মূলত প্রাকৃত ও প্রাচীন বাংলারই সামান্য পরিবর্তিত রূপ। পালি, প্রাকৃত, প্রাচীন মধ্য বাংলা এবং ব্রজবুলি- আসামি- হিন্দি- বিহারি ইত্যাদি শব্দগুচ্ছ এই অঞ্চলে অধিক প্রচলিত। মুণ্ডা ও সাঁওতালি ভাষার কয়েকটি শব্দ যেমন চাউলি, চুলা, জাইত, পাড়া, হাল, ডোঙ্গা, মেয়েছেলে, বেটাছেলে, মেয়েলোক ইত্যাদি এই অঞ্চলে প্রচলিত। স্বামী অর্থে ‘ভাতার’, বিবা অর্থে ‘বিহা’, যুবক-যুবতী অর্থে ‘গাভুর’, বিধবা অর্থে ‘আড়ি’, বাউণ্ডুলে অর্থে ‘বাউদিয়া’, স্ত্রী অর্থে ‘মাইয়া’, ঘরজামাই অর্থে ‘ডাঙ্গুয়া’, ব্যথা অর্থে ‘বিষ’ ইত্যাদি শব্দ পঞ্চগড়ের ভাষায় ব্যাপকভাবে প্রচলিত।

১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত নজরুল পাঠাগারকে কেন্দ্র করে পঞ্চগড়ে সাংস্কৃতিক চর্চা গতিশীল হয়ে ওঠে। অসংখ্য বই, মানচিত্র, বিশ্বকোষ, রচনাবলি ইত্যাদির সমৃদ্ধ সংগ্রহে এই পাঠাগারটি ছিল পঞ্চগড় অঞ্চলের জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার এক অমূল্য তীর্থক্ষেত্র। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাঠাগারের অনেক মূল্যবান বই ও এনসাইক্লোপিডিয়া জ্বালিয়ে দেয়। পঞ্চগড় অঞ্চলে আঞ্চলিক ও লোকাল সংস্কৃতির মধ্যে ‘হুলির গান’ সর্বাধিক প্রচলিত ও জনপ্রিয়। হিন্দুদের হুলি পূজা থেকে হুলির গান নামটির উৎপত্তি হলেও সমসাময়িক ঘটনা বা অসঙ্গতিপূর্ণ সামাজিক চিত্র, প্রেমকাহিনি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করেও ব্যঙ্গাত্মক ও রসাত্মকভাবে এই গান পরিবেশিত হয়। সাধারণত শীতকালে রাতের বেলায় এ গান পরিবেশিত হয়। হুলি পালা শ্রেণির গান। এই গানে কাহিনিকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য একজন ছোকরা (মেয়ের সাজে ছেলে অভিনেতা) এবং একজন সং (জোকার) উপস্থিত থাকে। এরাই দর্শক ও শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। হুলি পরিবেশনের সময় ঢোল, বাঁশি, কাসর, সারেঙ্গি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র এবং বর্ণিল পোশাক ব্যবহূত হয়।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads