• রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬
ads
রেলের শহর রাজবাড়ী

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

রেলের শহর রাজবাড়ী

  • সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন
  • প্রকাশিত ১২ মার্চ ২০১৯

রাজবাড়ী জেলা প্রাচীন ইতিহাস ধারণ করে আছে। পদ্মা, চন্দনা, হড়াই, গড়াইয়ের সমূলে পলল মাটির উর্বর ভূমিতে আবহমানকালের প্রাচীন ঐতিহ্যের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে। রাজবাড়ী জেলার মানুষের জীবন-যাপন, খাদ্য, কাজকর্ম, চলাচল ও বাসভূমিতে বৈচিত্র্য আছে। এ ছাড়া ভাবপ্রকাশ, ব্যবহার রীতি, আদান-প্রদান এবং ভাষা ব্যবহারেও অঞ্চলভিত্তিক বিশেষত্ব আছে। মূলত এগুলো তাদের শত শত বছরের লোকজ ঐতিহ্যের প্রকাশ। রাজবাড়ীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মাটি ও মানুষের কথা নিয়ে আজকের আয়োজন গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেছেন সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন

 

রাজবাড়ী জেলা ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত। এর আয়তন ১ হাজার ২০৪ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে পাবনা জেলা, দক্ষিণে ফরিদপুর ও মাগুরা জেলা, পূর্বে মানিকগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলা। নদীবিধৌত পদ্মার পলিমাটি দিয়ে এই জেলার অধিকাংশ ভূমি গঠিত। রাজবাড়ী ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গের এলাকা। বঙ্গ ছিল ভাটির দেশ। বঙ্গ বলতে বর্তমান রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও যশোরকে বোঝানো হয়। এই জেলার প্রধান নদী পদ্মা, গড়াই, হড়াই ও চন্দনা। রাজবাড়ী যে কোনো রাজার বাড়ির নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কখন থেকে ও কোন রাজার নামানুসারে রাজবাড়ী নামটি এসেছে, তার সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বাংলার রেল ভ্রমণ পুস্তকের (এলএন মিশ্র প্রকাশিত ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে ক্যালকাটা ১৯৩৫) ১০৯ পৃষ্ঠায় রাজবাড়ী সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে নবাব শায়েস্তা খান ঢাকায় সুবাদার নিযুক্ত হয়ে আসেন। এ সময় এ অঞ্চলে পর্তুগিজ জলদস্যুদের দমনের জন্যে তিনি সংগ্রাম শাহকে নাওয়ারা প্রধান করে পাঠান। তিনি বানিবহতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন এবং লালগোলা নামক স্থানে দুর্গ নির্মাণ করেন। এ লালগোলা দুর্গই রাজবাড়ী শহরের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে বর্তমানে লালগোলা গ্রাম নামে পরিচিত। সংগ্রাম শাহ ও তার পরিবার পরবর্তী সময়ে বানিবহের নাওয়ারা চৌধুরী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এলএন মিশ্র ওই পুস্তকে উল্লেখ করেন যে, রাজা সংগ্রাম শাহের রাজদরবার বা রাজকাচারী ও প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী অফিস বর্তমান রাজবাড়ী এলাকাকে কাগজে-কলমে রাজবাড়ী লিখতেন (লোকমুখে প্রচলিত)। ওই পুস্তকের শেষের পাতায় রেলওয়ে স্টেশন হিসেবে রাজবাড়ী নামটি লিখিত পাওয়া যায়।

রাজবাড়ী রেলস্টেশনটি ১৮৯০ সালে স্থাপিত হয়। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায় ফরিদপুরের ইতিহাস পুস্তকে বানিবহের বর্ণনায় লিখেছেন- নাওয়ারা চৌধুরীরা পাঁচথুপি থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে বানিবহে এসে বসবাস শুরু করেন। বানিবহ তখন ছিল জনাকীর্ণ স্থান। বিদ্যাবাগীশ পাড়া, আচার্য পাড়া, ভট্টাচার্য পাড়া, শেনহাটিপাড়া, বসুপাড়া, বেনেপাড়া, নুনেপাড়া নিয়ে ছিল বানিবহ এলাকা। নাওয়ারা চৌধুরীদের বাড়ি স্বদেশীদের কাছে রাজবাড়ী নামে অভিহিত ছিল। মতান্তরে রাজা সূর্যকুমারের নামানুসারে রাজবাড়ীর নামকরণ হয়। রাজা সূর্যকুমারের পিতামহ প্রভুরাম নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজকর্মচারী থাকাকালীন কোনো কারণে ইংরেজদের বিরাগভাজন হলে পলাশীর যুদ্ধের পর লক্ষ্মীকোলে এসে আত্মগোপন করেন। পরে তার পুত্র দ্বিগেন্দ্র প্রসাদ এ অঞ্চলে জমিদারি গড়ে তোলেন। তারই পুত্র রাজা সূর্যকুমার ১৮৮৫ সালে জনহিতকর কাজের জন্য রাজা উপাধিপ্রাপ্ত হন। রাজবাড়ী রেলস্টেশনের নামকরণ করা হয় ১৮৯০ সালে।

জানা যায়, রাজবাড়ী রেলস্টেশনের নামকরণ রাজা সূর্যকুমারের নামানুসারে করার দাবি তোলা হলে বানিবহের জমিদাররা প্রবল আপত্তি তোলেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে যে স্থানটিতে রাজবাড়ী রেলস্টেশন অবস্থিত, ওই জমির মালিকানা ছিল বানিবহের জমিদারদের। তাদের প্রতিবাদের কারণেই স্টেশনের নাম রাজবাড়ীই থেকে যায়। এসব বিশ্লেষণ থেকে ধারণা করা হয়, রাজবাড়ী নামটি বহু আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। এলাকার নাওয়ারা প্রধান, জমিদার, প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিরা রাজা বলে অভিহিত হতেন। তবে রাজা সূর্যকুমার ও তার পূর্বপুরুষদের লক্ষ্মীকোলের বাড়িটি লোকমুখে রাজার বাড়ি বলে সমধিক পরিচিত ছিল। এভাবেই আজকের রাজবাড়ী।

বর্তমান রাজবাড়ী জেলা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৭৬৫ সালে ইংরেজরা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের পর উত্তর-পশ্চিম ফরিদপুর (বর্তমান রাজবাড়ী জেলার কিয়দংশ) অঞ্চল রাজশাহীর জমিদারির অন্তর্ভুক্ত ছিল। নাটোর রাজার জমিদারি চিহ্ন হিসেবে রাজবাড়ী জেলার বেলগাছিতে রয়েছে স্নানমঞ্চ, দোলমঞ্চ। পরবর্তীকালে এ জেলা একসময় যশোর জেলার অংশ ছিল। ১৮১১ সালে ফরিদপুর জেলা সৃষ্টি হলে রাজবাড়ীকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া রাজবাড়ী জেলার বর্তমান উপজেলাগুলো অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাংশা থানা একসময় পাবনা জেলার অংশ ছিল। ১৮৫৯ সালে পাংশা ও বালিয়াকান্দিকে নবগঠিত কুমারখালী মহকুমার অধীনে নেওয়া হয়। ১৮৭১ সালে গোয়ালন্দ মহকুমা গঠিত হলে পাংশা ও রাজবাড়ী এ নতুন মহকুমার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং রাজবাড়ীতে মহকুমা সদর দফতর স্থাপিত হয়। ১৮০৭ সালে ঢাকা জালালপুরের হেড কোয়ার্টার ফরিদপুরে স্থানান্তর করা হয় এবং পাংশা থানা ফরিদপুরের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৫০ সালে লর্ড ডালহৌসির সময় ঢাকা জালালপুর ভেঙে ফরিদপুর জেলা গঠিত হলে গোয়ালন্দ তখন ফরিদপুরের অধীনে চলে যায়। তখন পাংশা, বালিয়াকান্দি পাবনা জেলাধীন ছিল। ১৯৮৩ সালে সরকার প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে প্রতিটি থানাকে মান উন্নীত থানায় রূপান্তরিত করলে রাজবাড়ীকে মান উন্নীত থানা ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৩ সালের ১৮ জুলাই থেকে সরকার অধ্যাদেশ জারি করে সব মান উন্নীত থানাকে উপজেলায় রূপান্তরিত করার ফলে রাজবাড়ী উপজেলা হয়। গোয়ালন্দ মহকুমার প্রশাসনিক দফতর রাজবাড়ীতে থাকায় অবশেষে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ সব মহকুমাকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে রাজবাড়ী জেলায় রূপান্তরিত হয়।

 

ভাষা ও সংস্কৃতি

রাজবাড়ী জেলার মানুষের জীবন-যাপন, খাদ্য, কাজকর্ম, চলাচল, বাসভূমিতে বৈচিত্র্য আছে। এ ছাড়া ভাবপ্রকাশ, ব্যবহার রীতি, আদান-প্রদান এবং ভাষা ব্যবহারেও অঞ্চলভিত্তিক বিশেষত্ব আছে। মূলত এগুলো তাদের শত শত বছরের লোকজ ঐতিহ্যের প্রকাশ। রাজবাড়ী জেলার ভৌগোলিক অবস্থানে কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর, পাবনা ও মানিকগঞ্জের প্রভাবে প্রভাবিত। এসব জেলা থেকে কমবেশি মানুষের রাজবাড়ী জেলায় অভিবাসিত হলেও বেশ পরিমাণ অভিবাসন রয়েছে পাবনা জেলা থেকে। বঙ্গের মানুষের সাধারণ জীবনচারিতা এরা সহজ সরল আড়ম্বরহীন জীবনে অভ্যস্ত। ইষ্টিকুটুম বাড়িতে এলে সবাই আনন্দিত হয়। চালের রুটির সঙ্গে মুরগির গোশত, সেই সঙ্গে চিতই পিঠা, ধুপি পিঠা, কুশলী পিঠা তৈরি করে। ইলিশ, কৈ, মাগুর, শোল, বোয়াল এসব গ্রামীণ মানুষের প্রিয় খাবার। এককালে এলাকাটি হিন্দুপ্রধান এলাকা ছিল। ভাষা ব্যবহারে রাজবাড়ীর মানুষের বিশেষত্ব রয়েছে। এরা ভাইকে বাই, উঠানকে উঠোন, কেমন করে অর্থাৎ ক্যাম্বা, যেমনকে অর্থাৎ য্যাম্বা, খাওয়াকে বলে খাবনে, যাওয়াকে বলে যাবনে, যাওনা কেন বলবে যাসনে কেন, আসিসনে কেন, হওয়াকে বলে হয়া, যাওয়াকে বলে যাওয়া, বেগুনকে বলে বাগুন, লাউকে কদু, কুকুরকে কুত্তো, কুমড়াকে কুমড়ো, তেলেকে তেলো বলে।

গ্রাম্য মেলা, সার্কাস, সাপের খেলা, নাগর দোলা, পুতুল নাচ, পালা গান, লাঠি খেলা, নৌকাবাইচ, পুনাহ, নববর্ষ, হালখাতা, মহররম, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বিয়ে, খাৎনা, খাদ্য আনুষ্ঠানিকতা, ঈদ উৎসব- এসব জাঁকজমকের সঙ্গে রাজবাড়ীতে পালন করা হয়। এর মধ্যে মেলা, পার্বণ, মহররম, ঈদ, বিয়ে, খাৎনা প্রধান উৎসব হিসেবে পালন করা হয়। এ ছাড়া ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানাদি উৎসব আনন্দে রূপ নেয়। এ জেলায় প্রচলিত লোকনৃত্যের মধ্যে রয়েছে ঢেঁকিনাচ, জারি নাচ, সারি নাচ, ছোকরা নাচ, কীর্তন নাচ, বৃষ্টি নামানোর নাচ, লাঠি নাচ ও ঘেঁটুনাচ।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads