• শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫
ads
সাঁইজিকে নিয়ে ব্যক্তিগত অনুভবের কথা

সাঁইজি

সংরক্ষিত ছবি

ফিচার

সাঁইজিকে নিয়ে ব্যক্তিগত অনুভবের কথা

  • অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
  • প্রকাশিত ২২ মার্চ ২০১৯

‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।/ লালন ভাবে জাতের কী রূপ/ দেখলাম না তা নজরে।’ জাত-পাত, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র প্রভৃতির ঊর্ধ্বে গিয়ে যিনি মানুষ ও মানবধর্মকে বড় করে দেখেছেন এবং জীবনভর যিনি মানবতাবাদের কথা বলেছেন, তিনি ফকির লালন সাঁই। (শিষ্যরা তাকে ডাকেন ‘সাঁইজি’ নামে। এ ছাড়াও লালন শাহ, মহাত্মা লালন, বাউল সম্রাট, মরমি সাধকসহ একাধিক নাম ও পরিচয় রয়েছে তার। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম ‘মহাত্মা’ উপাধি পেয়েছিলেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বাউল গানের স্রষ্টা ও শ্রেষ্ঠ রচয়িতার মুকুটও শোভা পায় লালনের নামের পাশে। বাংলা ভাষা, বাংলার সংস্কৃতি যেমনিভাবে আমাদের নিজস্ব বিষয়; বাউল সম্প্রদায়, বাউল গান ঠিক একইভাবে প্রতিটি বাঙালির নিজস্ব সম্পদ, নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিষয়। আর সেই ইতিহাসের গোড়াপত্তন করেছেন ফকির লালন সাঁই।

বিদগ্ধ ও পণ্ডিতজনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে চাই আগেই। তাদের মতো লালন বিষয়ে পড়াশোনা, তত্ত্বতালাশ এবং সাঁইজির জন্ম-মৃত্যু, জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে গবেষণা আমার নেই। সাঁইজির গান আগেও শুনেছি, এখনো শুনি একান্ত মনোযোগী শ্রোতা হয়ে। সাঁইজির পড়শি হিসেবে তার ধামে আসা-যাওয়াও কম নয়। পড়তে পড়তে ও সাঁইজির ধামে আসা-যাওয়ায় আমি যা অনুভব করি, তা শোনার চেয়ে অনেক গভীর, বলা যায় অতলান্ত। বিশিষ্ট গবেষকদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মানবতার প্রাণপুরুষ ফকির লালন সাঁইজিকে নিয়ে আমি আমার অনুভবের কথা লিখছি।

যৌবনের সূচনালগ্নে পুণ্যলাভের জন্য নিজ গ্রামের সঙ্গী-সাথীসহ গঙ্গাস্নানে যাত্রা করেন লালন। স্নানকর্ম সেরে ফেরার পথে লালন সহসাই বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। একসময় জ্ঞান হারালে সঙ্গীরা তাকে মৃত ভেবে মুখাগ্নি করে নদীতে ফেলে যান। লালনের মা ও স্ত্রী তার মৃত্যুসংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে তারা এটাকে ভাগ্যের লিখন মনে করে ধর্মমতে সমাজকে নিয়েই গায়েবি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন। এদিকে নদীতে ভেসে লালনের দেহ পাড়ে পৌঁছালে মুসলিম কারিগর পরিবারের এক নারী তাকে দেখতে পেয়ে নদী থেকে তুলে নিয়ে তার সেবা করেন। রোগমুক্তি ঘটলেও লালন তার এক চোখ হারান। সুস্থ হয়ে লালন বাড়ি ফেরেন। পরিবারের মা-স্ত্রী তাকে ফিরে পেয়ে যখন আবেগে ভাসছেন, তখনই শুরু হয় ঘটনার ঘনঘটা। ধর্মীয় কুসংস্কারের রূঢ় প্রথা ফুটে ওঠে। লালন বাড়ি ফিরেছেন শুনে এলাকার লোকজনের সঙ্গে স্থানীয় সমাজপতিরাও দেখতে আসেন তাকে। তারা দৃঢ়ভাবে জানায়, ধর্মমতে লালনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া তিনি মুসলিম বাড়ির জল-খাবার খেয়েছেন, তাই তাকে আর এ সমাজে আশ্রয় দেওয়া যাবে না। ফলে ঘর-সংসার, মা, স্ত্রী ছেড়ে লালন গৃহত্যাগী হতে বাধ্য হন। ধর্মীয় গোঁড়ামির ফাঁদে পড়ে সমাজচ্যুত হন তিনি। তার মা, স্ত্রী সহযোগী হতে চাইলেও সমাজপ্রথা তাদের আবদ্ধ করে রাখে। পতিব্রতা লালনের স্ত্রী এই শোক সইতে না পেরে কিছুকাল পরেই পরপারে পাড়ি জমান।

যে ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি দেখানোর অভিপ্রায়ে লালন গঙ্গা স্নানে গিয়ে নিজের জীবন হারাতে বসেছিলেন, পরবর্তীকালে সেই ধর্মই যখন তাকে গৃহত্যাগে বাধ্য করল তখনই লালনের মানব আত্মা ধর্মের নামে সৃষ্টিকর্তার মহান সৃষ্টি মানুষকে ক্রীতদাস করে রাখার ঘৃণ্য প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করে উঠল। বলা যায়, এই ঘটনাই লালনকে ‘মানবতাবাদী মহাত্মা’ করে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। সময়ের বিবর্তনে সমাজচ্যুত লালনের পরিচয় হয় মরমি সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সঙ্গে। এ থেকেই শুরু হয় লালনের বাউল গানের যাত্রা। সিরাজ সাঁইকে ‘গুরু, তুমি তন্ত্রের মন্ত্রী’ মেনে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলাধীন ছেঁউড়িয়া গ্রামে আখড়া করে অধ্যাত্ম চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েন। সমাজে প্রচলিত ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাত-পাতের বিরুদ্ধে তিনি গানের মাধ্যমে তার মানবধর্মের মতবাদ প্রচার করতে থাকেন। ধীরে ধীরে তার সেই অহিংসবাদী মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে দেশে-বিদেশে। লালন গানের মাধ্যমে শুরু হয় নতুন এক মানবধর্মের চর্চা। জাত-পাতহীন, ধর্ম-বর্ণহীন সমাজের কথাগুলো লালনের গানের মূলকথা হওয়ায় মানুষ তার গানের মাধ্যমে মানবমুক্তির আশ্রয় খুঁজে পায়। লালন তার গানে বলেন- ‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।/ যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান/ জাতি গোত্র নাহি রবে।’ তিনি অন্য গানে বলেন- ‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়,/ তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়।/ লালন বলে জাত কারে কয়/ এ ভ্রম তো গেল না।’

প্রকৃতপক্ষে লালন সাঁই তার গানের মাধ্যমে কোনো ধর্মকে কটাক্ষ করেননি। আবার সুনির্দিষ্টভাবে তিনি কোনো ধর্মের অনুসারীও ছিলেন না। তবে ধর্মের নামে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিবদ্ধ করে রাখা, মানবতাবর্জিত কাজকেও ধর্মীয় অনুষঙ্গ মনে করা- এসব বিষয়ের প্রতিবাদী কণ্ঠ উচ্চারিত হয়েছে তার গানগুলোতে। লালনের গান শুনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন- আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।’ এটি মূলত তিনি তৎকালীন ধর্মভিত্তিক সমাজব্যবস্থার অচলাবস্থা ও তা থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে সবার আগে মানবধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত- এই বোধ থেকেই বলেছিলেন।

লালন সাঁই তার গানে মানুষ এবং মানুষকেই বড় করে দেখিয়েছেন। লালন মনে করতেন মানুষের মাঝেই এক ‘মনের মানুষ’র বসবাস, যার প্রকৃত রূপ সৃষ্টিকর্তা। তাই তো তিনি জীবনভর সেই মনের মানুষকে খুঁজে বেড়িয়েছেন, যেটি তার গানে উঠে এসেছে- ‘মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষের সনে।’ এক্ষেত্রে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সঙ্গে লালনের কিছুটা সাদৃশ্য পাই, যিনি বলেছিলেন, ‘নো দাইসেলফ’; অর্থাৎ সবার আগে নিজেকে জানো। নিজেকে জানার প্রবল আগ্রহ থেকেই লালন সাঁই তার বিভিন্ন গানে মনের মানুষের বিভিন্ন রূপ তুলে ধরেছেন। ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ গানে তিনি মানুষের মনের সত্তাকে তুলনা করেছেন অচিন পাখির সঙ্গে যা সহজেই মানুষরূপী খাঁচায় আসা-যাওয়া করলেও তাকে বন্দি করে রাখা যায় না।

আগেই বলেছি, লালন তার গানে মানবতাবাদের জয়গান গেয়েছেন। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রকরণ নয়; বরং সময়ের চাহিদাই ছিল। প্রথমত, লালনের গানগুলোতে তার ব্যক্তিজীবনের বাস্তব প্রভাব ছিল। দ্বিতীয়ত, যে সময় লালন তার গানগুলো রচনা করেন, ওই সময়টিতে ভারতীয় উপমহাদেশ একের পর এক আগ্রাসনে জর্জরিত ছিল। ব্রিটিশদের ক্ষমতা দখল, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, সিপাহি বিদ্রোহ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, সামন্তবাদের উত্থান- সবকিছু মিলিয়ে উপমহাদেশে একটি ভাঙনের অধ্যায় চলছিল। আর সেই ভাঙনে ‘আগুনে ঘি ঢালা’র মতো তাতানোর অন্যতম উপাদান ছিল ধর্মান্ধতা। জাতিভেদ, বর্ণপ্রথা ইত্যাদি বিষয় প্রকট আকার ধারণ করেছিল সমাজব্যবস্থায়। ঠিক তখনই কিছু শিক্ষিত, বোধসম্পন্ন ও মানবদরদি মহৎ মানুষ মানবতার জয়গান গেয়ে মানুষকে এই সমূহ বিপদ থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলামসহ কিছু কলমসৈনিক। উল্লেখিত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ ভাববাদী ছিলেন, অন্যরা ছিলেন বিদ্রোহী। ফকির লালন সাঁই ছিলেন সেই বিদ্রোহীদের পক্ষে। তিনি সবসময় চেয়েছেন যেন মানুষ নিজের সত্তাকে চিনে ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় বাড়াবাড়িকে উপেক্ষা করে মানবধর্মের পথে হাঁটতে পারে। তার চাওয়াটা সত্য হোক। জয় হোক মানবতার।

 

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads