• শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ডাকসুর ধাক্কা বিএনপির হুঁশ ফেরাবে কি

ডাকসু ভবন

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

ডাকসুর ধাক্কা বিএনপির হুঁশ ফেরাবে কি

  • মহিউদ্দিন খান মোহন
  • প্রকাশিত ২৩ মার্চ ২০১৯

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু নির্বাচনে বিএনপির ছাত্রফ্রন্ট জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শোচনীয় পরাজয় এখনো রাজনীতি সচেতন মহলে আলোচনার বিষয়বস্তু। একসময়ের দেশের বৃহৎ এ ছাত্র সংগঠনটির কেন এ বেহালদশা তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সর্বত্র। ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যে করুণ চিত্র ভেসে ওঠে তা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কারো কারো মতে অবিশ্বাস্য। ঐতিহ্যবাহী একটি ছাত্র সংগঠন এমন বিপর্যয়কর ফলাফল করতে পারে তা ছিল সবার ধারণার বাইরে। ফলাফলে দেখা যায়, ভিপি পদে ছাত্রদল মনোনীত প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান পেয়েছেন ২৪৫ ভোট। আর বিজয়ী প্রার্থী নুরুল হক নুর পেয়েছেন ১১ হাজার ৬২ ভোট। জিএস পদে ছাত্রদলের প্রার্থী খন্দকার আনিসুর রহমান অনিক পেয়েছেন ৪৬৩ ভোট, আর বিজয়ী ছাত্রলীগ প্রার্থী গোলাম রব্বানী পেয়েছে ১০ হাজার ৪৮৪ ভোট। এজিএস পদে বিজয়ী ছাত্রলীগের প্রার্থী সাদ্দাম হোসেন পেয়েছেন ১৫ হাজার ৩০১ ভোট, আর ছাত্রদলের প্রার্থী খোরশেদ আলম সোহেল পেয়েছেন সাকুল্যে ২৯৪ ভোট। অন্যান্য পদের কথা আর না বলাই ভালো। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, কোনো পদেই তারা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকতে পারেননি। ব্যতিক্রম কানাতা ইয়া-লাম লাম নামের মেয়েটি। ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে তিনি ৭ হাজার ১১৯ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। তা ছাড়া ডাকসুর সব পদে প্রার্থীও দিতে পারেনি ছাত্রদল। ২৫টি পদের বিপরীতে তারা মনোনয়ন দিতে পেরেছিলেন ২১টিতে। এ ছাড়া হল সংসদগুলোর ১৩টি পদের বিপরীতে ছাত্রদল তিন থেকে ছয়জন করে প্রার্থী দিতে পেরেছিল। পাঁচটি ছাত্রী হলের মধ্যে একমাত্র শামসুন্নাহার হলে ভিপি পদে মনোনয়ন দিতে পেরেছিল সংগঠনটি। 

একসময় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল দেশের সুসংগঠিত বৃহৎ ছাত্র সংগঠন ছিল। ১৯৯০ সালে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে এ ছাত্র সংগঠনটি পূর্ণ প্যানেলে জিতেছিল। সে নির্বাচনের ২৮ বছর পরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সেই ছাত্রদলের এমন মর্মান্তিক পরাজয় সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। একটি প্রশ্নই ঘুরেফিরে সামনে আসছে- এ আঠাশ বছরে কী এমন ঘটল যে, সংগঠনটির অবস্থা লেজেগোবরে হয়ে গেল! ছাত্রদল ও বিএনপি নেতারা অবশ্য বলছেন, ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হয়নি। এটা ঠিক, গত দশ-বারো বছর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরেই অবস্থান করতে হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের প্রবল দাপটে তারা ছিল ক্যাম্পাসছাড়া। কিন্তু ছাত্রলীগকে মোকাবেলা করে ক্যাম্পাসে অবস্থান তৈরি করার কতটুকু চেষ্টা তারা করেছে, সেটাও একটি প্রশ্ন। রাজনৈতিক সচেতন মহল এজন্য ছাত্রদল তথা বিএনপির অদূরদর্শী সিদ্ধান্তকেই দায়ী করছেন। তাদের মতে, সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে অছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় একধরনের স্থবিরতার কবলে পড়েছে। অছাত্ররা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকায় ক্যাম্পাসে তারা পা রাখতে পারেননি। আর ছাত্রলীগের মতো একটি শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনকে মোকাবেলা করে অবস্থান সৃষ্টির চেষ্টাও ছাত্রদলকে করতে দেখা যায়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চল্লিশ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংগঠনটির তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না।

বিএনপির শুভানুধ্যায়ীরা বহু আগে থেকেই বলে আসছিলেন, অছাত্রদের কবল থেকে ছাত্রদলকে মুক্ত করতে না পারলে এর খেসারত দলটিকে দিতে হবে। এবারের ডাকসু নির্বাচিনে সে ভবিষ্যদ্বাণীরই প্রতিফলন ঘটেছে। অবস্থা এমনই পর্যায়ে গেছে যে, ডাকসুতে ক্যাম্পাসের পরিচিত কোনো মুখকে তারা মনোনয়ন দিতে পারেনি। হল কমিটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতাদের মনোনয়ন দিতে হয়েছে অনেকটা যেন মুখরক্ষার জন্যই। ফলে সম্পূর্ণ অপরিচিত এসব প্রার্থী সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো ধরনের প্রভাব সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনের পর ছাত্রদলের ভরাডুবির কারণ হিসেবে অনেকেই সংগঠনটির দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা এবং নির্বাচনের ন্যূনতম প্রস্তুতি না থাকার কথা বলেছেন। অপরদিকে ছাত্রদল ও বিএনপি নেতারা তাদের প্যানেলের ভরাডুবির জন্য নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনলেও তা ধর্তব্যের মধ্যে নিচ্ছে না রাজনীতি সচেতন মহল। তারা বলছেন, কারচুপির অভিযোগ তখনই গ্রহণযোগ্য হয় যখন নির্বাচনে পরাজিত নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা প্যানেল তা উত্থাপন করে। লক্ষণীয় হলো, এবারের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্রার্থীরা নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া দূরে থাক, চতুর্থ-পঞ্চম স্থানে অবস্থান করেছেন। আর তাদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা পাঁচ-ছয়শ’র বেশি নয়। এদিকে ডাকসুতে ছাত্রদলের লজ্জাকর পরাজয়ের পর সংগঠনটির অভিভাবক দল বিএনপি নড়েচড়ে বসেছে। পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের যে দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। গত ১৬ মার্চ আমাদের সময় এ-সংক্রান্ত এক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ছাত্রদলের আগের সে শক্ত ভিত যে দেশের কোথাও নেই, তা দলটির হাই কমান্ডের চোখে ধরা পড়েছে। গত ১৩ মার্চ অনুষ্ঠিত বিএনপি স্থায়ী কমিটির সভায় এ নিয়ে কথা হয়েছে। ওই সভায় স্কাইপিতে যুক্ত হওয়া দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ছাত্রদলের দুরবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পত্রিকাটি লিখেছে, স্থায়ী কমিটির নেতাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে- বর্তমানে যারা ছাত্রদলের নেতৃত্বে আছেন, তাদের সঙ্গে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। এ অবস্থায় ছাত্রদলকে ঢেলে সাজানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে ওই সভায়।

সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তায় ছাত্রদলই ছিল দেশের অপর ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। সংগঠনটি ডাকসুতে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৯৮০ সালে।  সে নির্বাচনে ছাত্রদল পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু ভোট প্রাপ্তির হার এমন লজ্জাজনক ছিল না। মাত্র দেড় বছর বয়সী ছাত্রদলের সে পরাজয়কে কেউ নেতিবাচক হিসেবেও দেখেননি। কিন্তু বয়স যখন ঊনচল্লিশ বছর, তখন এমন নিদারুণ পরাজয় কী মেনে নেওয়ার মতো? আবার এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত কয়েকটি নির্বাচনে তারা বেশ ভালো ফলাফলও করেছিল। ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে তাই এটা বলা নিশ্চয় অত্যুক্তি হবে না যে, আঠাশ বছরে ছাত্রদল এগোনোর পরিবর্তে লজ্জাজনকভাবে পিছিয়েছে। তাহলে এ সংগঠনের নেতারা কী করেছেন এতদিন? ছাত্রদলের রয়েছে টাইটানিক জাহাজ সদৃশ একটি কেন্দ্রীয় কমিটি; যার সদস্য সংখ্যা ৭৩৬। সে কমিটিরও মেয়াদ পেরিয়ে গেছে তিন বছর আগে। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির নেতারা ছাত্রত্ব ও কুমারত্ব হারিয়েছেন এরই মধ্যে। কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন শাখা কমিটিতে নেতার ছড়াছড়ি থাকলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছাড়া কোথাও তাদের কোনো কার্যক্রম দৃষ্টিগোচর হয় না। এমন স্থবিরতা কেন গ্রাস করেছে ছাত্রদলকে- এ নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই। সচেতন ব্যক্তিদের অভিমত, ছাত্রদলের শীর্ষ পদগুলো দখল করে আছে বয়স্ক ও অছাত্ররা। তাদের বেশিরভাগ ইতোমধ্যে সংসারজীবনেও প্রবেশ করে ফেলেছে।  সংসারজীবনে প্রবেশ করা এসব কথিত ছাত্রনেতার পক্ষে অল্পবয়সী নিয়মিত ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও সখ্য গড়ে তোলা কঠিন। সম্পর্কের এই যে গ্যাপ, বলা যায় জেনারেশন গ্যাপ, তাকে কভার করার কোনোই পথ নেই। কেউ কেউ টিপ্পনী কেটে বলেন, যাদের ছেলেমেয়েদের ছাত্রদলের নেতা হওয়ার কথা, তারাই এখনো নেতার পদ দখল করে আছেন। ফলে নবীনরা বাবা-চাচার বয়সী ছাত্রনেতাদের সহযাত্রী হতে পারছেন না।

অবশ্য বিএনপি ও ছাত্রদল তাদের এ পরিণতির জন্য সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনের ক্যাম্পাস দখল, ছাত্রদলের কর্মী-সমর্থকদের হল থেকে বিতাড়ন, গত দশ বছরে ছাত্রদলকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেওয়া ইত্যাদিকে দায়ী করছেন। তাদের এসব অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের আধিপত্য কায়েমের এক অসুস্থ প্রক্রিয়া শুরু হয়; যার প্রধান শিকার হয় ছাত্রদল। কিন্তু ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি ছাত্রদল। এটা যে সংগঠনটির নেতৃত্বের ব্যর্থতা তা না বললেও চলে। স্মরণযোগ্য যে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও একইভাবে ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দখল করতে চেয়েছিল। তখন ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন বর্তমানে বিএনপির জাতীয়  নির্বাহী কমিটির প্রচার সম্পাদক শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। ছাত্রলীগের হল দখল প্রতিরোধ করতে গিয়ে তিনি পুলিশের টিয়ারশেলের আঘাতে মারাত্মক আহত হয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য, ছাত্রদলের সে প্রতিরোধক্ষমতা যেন আজ আর নেই। এজন্য বিএনপির শুভানুধ্যায়ীরা দলটির নেতৃত্বের অদূরদর্শিতাকেই দায়ী করেন। তারা মনে করেন, ছাত্রদলের কমিটি গঠনের দায়িত্ব যারা পান, তারা ব্যক্তিস্বার্থের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন না। তাই নিজেদের ছেলেদের পদায়ন করতে গিয়ে তারা দলের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেন। তাছাড়া যেসব ঢাউস কমিটি রয়েছে ছাত্রদলের, সেগুলোর কয়টি কার্যকর রয়েছে তাও ভেবে দেখা দরকার। উল্লেখ্য, বর্তমানে যে কমিটি বহাল রয়েছে তাতে ঠাঁই না পাওয়া বিক্ষুব্ধ কর্মীরা নয়াপল্টনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় অফিস ভাঙচুর ও আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। সে ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করে বিএনপির এক শুভানুধ্যায়ী ক্ষুব্ধকণ্ঠে মন্তব্য করেছিলেন- ‘বোঝা গেল তোদের শক্তি সাহস আছে। মারামারি ভাঙচুর করতে পারিস। এমনকি আগুনও জ্বালাতে পারিস। তাহলে সে শক্তির মহড়া রাজপথে দেখা, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গিয়ে দেখিয়ে আয়। নিজের ঘরে আগুন দিতে তো সবাই পারে। শত্রু শিবিরে যে হামলা করতে পারে সে-ই না বীর।’

বিএনপি বলুন আর ছাত্রদল-যুবদল, সবখানে একই চিত্র। এরা নিজেদের মধ্যে পদ-পদবি নিয়ে মারামারি হানাহানি করতে পারে। ভাঙচুর-আগুন দিতে পারে নিজেদের অফিসে; কিন্তু আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগকে দেখলেই তাদের লেজ গুটিয়ে যায়। ছাত্রদলের এ পর্যুদস্ত অবস্থা যে বিএনপির জন্য অশনিসঙ্কেত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যে ধাক্কা ডাকসু নির্বাচনে বিএনপি তথা ছাত্রদল এবার খেয়েছে, তাতেও যদি তাদের হুঁশ না ফেরে, তাহলে সংগঠনটির অস্তিত্বসঙ্কটের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক   

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads