• বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬
ads
বোঝা নয়, অটিস্টিক শিশুরা সম্ভাবনাময়

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস

বোঝা নয়, অটিস্টিক শিশুরা সম্ভাবনাময়

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ০৪ এপ্রিল ২০১৯

শিশুর বিকাশজনিত একটি সমস্যা অটিজম। অটিজম কোনো বংশগত বা মানসিক রোগ নয়। এটা একধরনের স্নায়ুগত বা মানসিক সমস্যা। এ সমস্যাকে ইংরেজিতে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার বলে। অটিজমকে সাধারণভাবে শিশুর মনোবিকাশগত জটিলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা সমাজের জন্য বোঝা নয়। তাদের ঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে তারাও সমাজের জন্য সম্পদে পরিণত হতে পারে। তাই সামাজিকভাবে আমাদের উচিত অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের ভালোবাসা এবং ভালো আচরণ করা। কেননা বেশিরভাগ অটিস্টিক শিশু অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। একজন অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশু অথবা বিশেষ শিশুর ভাবনার জগৎ কিংবা আচরণ অন্য শিশুদের থেকে কিছুটা আলাদা হলেও ওদেরও অধিকার সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের। তাই তাদের জন্য সহানুভূতির পাশাপাশি দরকার সহযোগিতার। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুরা সাধারণত অপরের সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারে না, তারা অতিরিক্ত জেদী হয়ে থাকে এবং নিজেকে বিচ্ছিন্ন ও গুটিয়ে রাখার মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে থাকে। অটিজমের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে গবেষকরা মনে করেন, জেনেটিক, নন-জেনেটিক ও পরিবেশগত প্রভাব সমন্বিতভাবে অটিজমের জন্য দায়ী। শিশুর বিকাশে প্রাথমিক পর্যায়ে এটি সৃষ্টি হয়। এ পর্যন্ত পরিচর্যাই এর একমাত্র বিকল্প।

সীমাবদ্ধতা নয়- সম্ভাবনা
অটিজমে আক্রান্তদের বলা হয় অটিস্টিক। অটিজমে আক্রান্ত কোনো কোনো শিশু বা অটিস্টিক শিশু কখনো কখনো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শিতা প্রদর্শন করতে পারে। অটিস্টিক শিশুরা অনেক জ্ঞানী হয়। অন্য শিশুর মত এদের জ্ঞান সব দিকে সমান থাকে না। এদের কারো থাকে গণিতের উপর অসাধারন জ্ঞান, কারো বিজ্ঞান, কেউ বা অসাধারণ সব ছবি আঁঁকতে পারে, কারো আবার মুখস্থ বিদ্যা বেশি থাকে। তাই অটিস্টিক শিশুর প্রতি সহানুভূতি ও সঠিক পরিচর্যায় উঠতে পারে একজন মহা জ্ঞানী। অনেকেই মনে করেন বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন ও আইনস্টাইন অটিস্টিক ছিলেন। পৃথিবীখ্যাত বিখ্যাত অনেক বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক অটিস্টিক ছিলেন। গবেষণা তথ্যে জানা গেছে, প্রতি ১০ জন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে একজনের ছবি আঁকা, গান, গণিত বা কম্পিউটারে দক্ষতা থাকে। অটিস্টিক শিশুকে ঠিকমতো পরিচর্যা করতে পারলে তারাও মেধার স্ফুরণে সমাজকে আলোকিত করতে পারবে। ‘অটিজম ইন রিয়েল লাইফ’ বইয়ের লেখক কিম্বারলি গ্রস রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অটিস্টিক শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা, চিকিৎসা, ইন্স্যুরেন্স ও তাদের উত্ত্যক্তকারীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। লেখক ও সাংবাদিক কিথ স্টুয়ারট দা গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত তার প্রবন্ধ ‘হাও টু হেল্প পিপল উইথ অটিজম? জাস্ট বি নাইস’ এ বলেছেন, ‘যখন আপনার একটি অটিস্টিক শিশু থাকে আপনি মানুষের অসহযোগিতায় অভ্যস্ত হয়ে যান, কিন্তু মানুষেরা যদি দয়ালু ও সহনশীল হতে শিখত তবে তা সবার জন্যই ভালো হতো।’

অটিজম চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ
অটিজম বাংলাদেশের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ এবং এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের অটিজম সোসাইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ অটিজম আক্রান্ত। বাংলাদেশে প্রায় দেড় লাখের মতো অটিজম আক্রান্ত মানুষ রয়েছে। এ ছাড়া প্রতি বছর তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে আরো প্রায় ১৫শ’ শিশু। সে হিসেবে প্রতিদিন দেশে ৪ জনের বেশি শিশু অটিজম নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা নির্ণয়ের জন্য যে জরিপ পরিচালিত হয় তাতে দেশে ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ১৩০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ হচ্ছে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অটিজম এমন একটি বিকাশজনিত সমস্যা যেখানে শিশুদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ, সামাজিক আচরণ, সামাজিক কল্পনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বেশ সমস্যা লক্ষ্য করা যায়। তবে কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, অটিজমের পেছনে দুটি কারণ রয়েছে- ১. জিনগত সমস্যা, ২. পরিবেশগত সমস্যা। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর ডিএনএ জিনে ‘কপি নাম্বার অব ভেরিয়েন্ট’ নামক ত্রুটি বহন করে। ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে অটিজমের সঠিক কারণ জানা সম্ভব হয় না। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে গড়ে ১৭ জন অটিজমে আক্রান্ত। এ সমস্যা মোকাবেলা দেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

অটিজম দিবস
অটিজম বিশ্বে এতই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে, জাতিসংঘ প্রতি বছর ২ এপ্রিলকে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করছে। এবারের অটিজম দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- ‘সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবহার, অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির অধিকার।’
অটিজমে আক্রান্ত শিশু ও বয়স্কদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে ২ এপ্রিলকে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ হিসেবে পালনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক শিশু অটিজম নামের এই নিউরো-ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত। ইতোমধ্যে এ সম্পর্কে পিতা-মাতা, পরিবার-পরিজন ও সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের চিকিৎসা ও যথার্থ পরিচর্যার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। নেই শিশুদের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠানও। অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে বিশেষ প্রয়োজন সম্পন্ন বা বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদাসম্পন্ন শিশু বলা হয়। এসব শিশুকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তাদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে। অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদ সম্মেলনে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে মোট ১৬ লাখ ৪৪ হাজার ৬০৮ জন প্রতিবন্ধীর মধ্যে ৪৭ হাজার ৪১৭ জন অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।’ তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপ অনুযায়ী দেশে অটিস্টিক শিশুদের সংখ্যা ছিল ৪১ হাজার ৩২৯ জন। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা আরো বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার ৬৭৫ জন। দেখা যাচ্ছে দিন দিন অটিজমে আক্রান্তদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রতিপাদ্যটির তাৎপর্য তুলে ধরে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন সুদৃঢ় অবস্থানে দাঁড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়ার পাশাপাশি প্রায় প্রতিঘরেই ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে গেছে। অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মতো করে দেশের অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও ডিজিটাল সেবার প্রয়োজন রয়েছে।’

অটিস্টিকদের জন্য উপনগরী হচ্ছে কলকাতায়
বিশ্বে প্রথম অটিজমে আক্রান্তদের জন্য কলকাতার অদূরে একটি আলাদা উপনগরী গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার উস্তিতে শিরাখেলে ৫২ একর জমির ওপর এই উপনগরীতে অটিজম নিয়ে সুসংহত উন্নয়ন কর্মসূচি রূপায়ণের কাজ হবে। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সুরেশ সোমানি ও রত্নাবলী গ্রুপের উদ্যোগে গঠিত ইন্ডিয়া অটিজম সেন্টার এই উপনগরী গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে বলে জানাগেছে। এই উপনগরীতে অটিজম শিশুদের থাকার ব্যবস্থা যেমন থাকবে তেমনি থাকবে এদের আগামী দিনে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে নানা কর্মসূচি রূপায়ণের ব্যবস্থাও। একই ছাতার তলায় থাকবে হাসপাতাল, স্কুল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এছাড়া অটিজম নিয়ে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগের কাজও হবে। উল্লেখ্য, সুরেশ সোমানির পুত্রও অটিজম আক্রান্ত। সেখান থেকেই তিনি অটিজম নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।

পাশে দাঁড়াতে হবে সবাইকে
বলতে দ্বিধা নেই পরিবারের বাইরে সমাজেও অটিস্টিক শিশুর গ্রহণযোগ্যতা খুব কম। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিশেষ স্কুল অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য যথেষ্ট নয়, তাদের মূল ধারার স্কুলে সুস্থ, স্বাভাবিক বাচ্চাদের সঙ্গে পড়ালেখা ও খেলাধুলার সুযোগ দিলে তাদের দ্রুত উন্নতি হয়। অনেক স্কুলের কর্তৃপক্ষ রাজি হলেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কোনো কোনো সুস্থ বাচ্চার বাবা-মা স্কুলে অটিস্টিক বাচ্চা নেওয়ায় আপত্তি জানান। তারা মনে করেন এমন বাচ্চাদের সঙ্গে মিশলে তাদের বাচ্চার ক্ষতি হবে অথচ এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং অটিস্টিক বাচ্চাদের সঙ্গে সুস্থ বাচ্চা মিশলে অটিস্টিক বাচ্চাদের মানসিক বৃদ্ধির সম্ভাবনা বেড়ে যায় তেমনি সুস্থ বাচ্চারাও নেতৃত্ব, সহমর্মিতা শেখে, হূদয়বান হয়।


শুরু হয় শৈশব থেকেই
জন্ম থেকেই শিশুরা অটিজমে আক্রান্ত হয়। তবে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় তিন বছর পর থেকে। বড় হতে হতে অটিজম ভালো হয়ে যায়। অটিজমের কারণে শিশুরা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার কারণে অনেকেরই অকাল মৃত্যু হয় বা অনেকেই অস্বাভাবিকতা নিয়ে বড় হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনোবিকাশের প্রতিবন্ধকতার কারণ, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক জৈব রাসায়নিক কার্যকলাপ, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন, বংশগতির অস্বাভাবিকতা প্রভৃতির কথা বলে থাকেন। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের সুষ্ঠু পরিচর্চার অভাবেও অটিজম হতে পারে। সাধারণভাবে অটিস্টিক শিশুরা একই কথা বার বার বলে এবং একই কাজ বার বার করতে পছন্দ করে। অটিজমে আক্রান্তরা সামাজিক আচরণে দুর্বল হয়, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। এই রোগে আক্রান্ত শিশু কারো সঙ্গেই, সে সমবয়সী হোক কিংবা অন্য যে কোনো বয়সী, কারো সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। ডাকলেও সাড়া দেয় না। আকার ইঙ্গিতে কথা বলতে পছন্দ করে। এ ধরনের শিশু আপন মনে থাকতে পছন্দ করে। নিজের ইচ্ছেমতো চলে। যখন যা করতে ইচ্ছে হয় তা করতে না পারলে এদের খিঁচুনি ভাব হয়। এরা কারো চোখের দিকে তাকায় না।
শারীরিক দিক দিয়ে অটিস্টিক শিশুর সঙ্গে সাধারণ শিশুদের অনেক সময় পার্থক্য করা যায় না। অটিস্টিকদের মস্তিষ্কের আকৃতি সাধারণের চেয়ে বড় হয়। একেকজন অটিস্টিকের একেক ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকে। অটিস্টিক শিশুরা অতি চাঞ্চল্য, জেদী ও আক্রমণাত্মক আচরণ, অহেতুক ভয়ভীতি, খিঁচুনি ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য একজন অটিস্টিকের থাকতে পারে। জিনিসপত্র ছুড়ে মারা, নিজের কাজে আত্মমগ্ন থাকা, ডাকলে সাড়া না দেওয়া, কারো সঙ্গে সহজে মিশতে না চাওয়া এবং দূরে দূরে থাকার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। শব্দ, আলো, স্পর্শ ইত্যাদির প্রতি অটিস্টিকদের আচরণ সাধারণদের থেকে পৃথক ও অদ্ভুত। এদের স্বভাব একই কাজ বার বার করা; নিষেধ করলে আরো বেশি করে করা।

অটিজম বার্তা
সমাজসেবা অধিদফতরের প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপ অনুযায়ী (২০১৩-২০১৬) দেশে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা ৪১ হাজার ৩২৯ জন। কুসংস্কার, সামাজিক বাধা ও অজ্ঞতার কারণে অটিস্টিক শিশুরা আজ শিক্ষা ও নানান সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অটিজম নির্ণয় ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও মনোবিদ প্রয়োজন যা বাংলাদেশে অপর্যাপ্ত। এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য আমাদের স্বয়ংক্রিয় টেকনিক্যাল টুলসের প্রয়োজন।
বর্তমানে অটিজম নিরূপণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত লোক ও নির্দিষ্ট অটিজম সেন্টারে ম্যানুয়াল পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় যদিও তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শহর অঞ্চলে সীমাবদ্ধ।

‘অটিজম বার্তা’ একটি মোবাইলভিত্তিক, ইন্টারেক্টিভ ও কমিউনিটি বেজড স্ক্রিনিং টুল যা অটিজম নিরূপণ ও পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয়। বাবা-মা, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা অ্যাপটি ব্যবহার করে অটিজম স্ক্রিনিং ও পরবর্তী করণীয় বিষয়গুলো জানতে পারবেন। অ্যাপটি দ্বারা পরীক্ষার মাধ্যমে একটি শিশুর অটিজম হওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ পেলে তার খবর নিকটস্থ অটিজম সেন্টারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবহিত করা হয়। পাশাপাশি শিশুর অভিভাবককে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে অবহিত করা হয়। অ্যাপটির মাধ্যমে শিশুর অবস্থা মনিটর করা ও পরবর্তীকালে সময়মতো বাবা-মাকে মোবাইলে অবহিত করা হয়। পাশাপাশি অটিজম বিষয়ক সামাজিক সচেতনতা ও শিক্ষিত করা ‘অটিজম বার্তা’র অন্যতম লক্ষ্য।

অটিজম : কোনো রোগ নয়
স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হলো এক ধরনের মানসিক জটিলতা, যেখানে অনেক ধরনের মানসিক সমস্যা একসঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। আর অটিজম এক ধরনের স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার। এ ধরনের নিউরোলজিক্যাল বা স্নায়ুবিক সমস্যার কারণে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, যার সঙ্গে মানসিক বিকাশগত জটিলতাও প্রকাশ পায়। এই সমস্যার কারণে জন্মের পরের ১৮ মাস থেকে ৩ বছর বয়সের মধ্যেই শিশুর আচরণগত এবং মানসিক সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। জানা যায়, ১৯০৮ সালে ‘অটিজম’ শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন সাইকিয়াট্রিস্ট ইউজেন ব্লিউলার। আর অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার ধারণার জন্ম দেন অস্ট্রিয়ান মেডিকেল থিয়োরিস্ট হ্যানস অ্যাসপারগার এবং আমেরিকান শিশু মনোবিজ্ঞানী লিও ক্যানার। লিও ক্যানার ১৯৪৩ সালে ১১ শিশুকে নিয়ে গবেষণা করেন। তার গবেষণায় দেখা যায়, ওইসব শিশুর স্মৃতি, সামাজিক সম্পর্ক তৈরি, ডাক দিলে সাড়া না দেওয়া, সহনশীলতা, বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা, একই কথার পুনরাবৃত্তি ইত্যাদি সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত ছেলেশিশুরা এ ধরনের সমস্যায় বেশি ভোগে। প্রতি ২৫০ শিশুর মধ্যে একটি শিশুর অটিস্টিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অবাক ব্যাপারটি হলো, অটিস্টিকরা নিম্ন বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন হয় না। এরা গড় বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন হয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে এরা উচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন হয়।

অটিস্টিক শিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেন- তরি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ডাউন সিনড্রোম অ্যাসোসিয়েশন, অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, সূচনা ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ। অটিস্টিক শিশুদের জন্য ঢাকার অটিজম বিশেষায়িত স্কুল রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে অ্যাডভান্সড স্কুল ফর স্পেশাল চিলড্রেন, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় অটিস্টিক শিশুদের বিশেষায়িত স্কুল ‘প্রয়াস’। খিলগাঁও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক স্কুল। স্কুলটি সুইড বাংলাদেশের অধীনে পরিচালিত হয়। ঢাকার গুলশানে রয়েছে রেইনবো অটিজম কেয়ার ফাউন্ডেশন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads