• বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯, ৯ শ্রাবণ ১৪২৫
ads

ফিচার

খুলে দিই মনুষ্যত্বের দ্বার

  • তন্বী আক্তার
  • প্রকাশিত ০৭ এপ্রিল ২০১৯

আমাদের পৃথিবীটা যে এত সুন্দর, তার কারণ হচ্ছে পৃথিবী বৈচিত্র্যময়। আর বৈচিত্র্যময় এই ধরণী সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয় তখনই, যখন স্বর্গীয় ফুলের মতো পবিত্র আর নিষ্পাপ শিশুদের আগমন ঘটে। তবে এ কথা নির্মম সত্য হলেও বলতে হয় যে, আমাদের সমাজে প্রতিটি শিশু আন্তরিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। বিশেষ কিছু কারণে এদের অনেকের পরিচয় পর্বে বিশেষণ যোগ করা হয়, যেমন- বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, বাক্শ্রবণ প্রতিবন্ধী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও একটু ভদ্র ভাষায় বললে সেটিকে অনেকে বলেন অটিস্টিক শিশু। আবার অনেকেই পাগল, কানা, বোবা প্রভৃতি শব্দ জুড়ে দেন, যা একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সৃষ্টিকর্তা যেখানে তার সৃষ্টিতে কোনো বৈষম্য সৃষ্টি করেননি। সেখানে মানুষ হয়ে সামান্য কিছু বিষয়ে আমরা নিজেদের তাদের থেকে আলাদা ভাবি। সেই সঙ্গে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর এবং তাদের অভিভাবকদের মানসিক পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের মানুষ প্রতিনিয়ত এই বিশেষ শিশুদের এবং তাদের বাবা-মাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে পিছপা হয় না। অনেক সময় বিশেষ শিশু জন্ম নেওয়ায় সব দোষ যেন ওই শিশুর মায়ের একার! এই রেশ ধরে দাম্পত্য জীবনে কলহও দেখা দেয়।

কখনো বা শিশুটির বাবা অন্যত্র বিয়ে করে নিজ বংশ রক্ষায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে এই শিশুদের জীবন রঙিন রঙে উদ্ভাসিত হওয়ার অনেক আগেই ধূসর তথা নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে যায়। কেউ কেউ বদ্ধঘরের এক কোণে শেকলবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে; আবার কেউ বা ঘরের জানালার গ্রিল ধরে বাইরের জগতের আলোর মিছিলে চোখ মেলায়। তবে অনেকেই সহযোগিতাসম্পন্ন মনোভাব নিয়ে পাশে দাঁড়ান। এসব বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে সরকার ২০১৩ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করে যা ২০১৫ সালে গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, অধিকার আইনে প্রণীত আছে তা আমরা কেন এখনো বাস্তবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করি না? তাহলে আজ সহসা প্রশ্ন এসে যায়, এখনো কি আমরা তাদের একজন সাধারণ মানুষ ভাবতে পারিনি? এসবের কারণ অজ্ঞতা, সচেতনতার অভাব, শিক্ষার অভাব। আমাদের দেশ যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু নিরক্ষতা, দরিদ্রতা, সুশিক্ষার অভাব বিদ্যমান। এত প্রতিকূলতা ছাপিয়ে প্রতিটি মানুষের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর অন্যতম মাধ্যম হলো মিডিয়া। মিডিয়াই পারে সমাজের সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে।

মিডিয়ায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা বিধিমালার ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপন, প্রামাণ্যচিত্র, সিনেমা, নাটক, স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা, বেতার ও টেলিভিশনে নানা কর্মসূচি তৈরি করা দরকার। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের নিয়ে লেখালেখি, ভিডিও শেয়ার করা, সচেতনতামূলক ও অনুপ্রেরণামূলক বিষয় তুলে ধরাও অত্যন্ত জরুরি। ২০১৮ সালের ২ এপ্রিল ১১তম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫৪৩ জন।’ এই বড় অঙ্কের সংখ্যার মানুষদের প্রাপ্য অধিকার ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত করলে কখনো কোনো সমাজ বা দেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে না। তবে এই অবহেলা, অধিকার না দেওয়া, সুযোগ করে না দেওয়ার নজির আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। আসুন, আজ থেকে আমরা যেন তাদের অবহেলা না করি। অফুরন্ত ভালোবাসার পরশ নিয়ে পাশে দাঁড়াই। খুলে দিই মনুষ্যত্বের দ্বার। ছড়িয়ে পড়ুক মুক্তির আলো।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads