• সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫
ads

ফিচার

অগ্নিকাণ্ড : জীবনের এমন অপচয় কাম্য নয়

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

  • প্রকাশিত ০৮ এপ্রিল ২০১৯

ঘিঞ্জি জনপদ পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার পর রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে ভয়াবহ আগুন কেড়ে নিয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণ। ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া তথ্যে অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন অন্তত ২৫ জন, যার মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। চুড়িহাট্টার পর বনানী, দুই ক্ষেত্রেই আগুন ছড়িয়ে পড়া এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির কারণ অভিন্ন। তা হলো ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মেনে না চলা। ভবনগুলোয় অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামের যথেষ্ট ব্যবস্থা না থাকা। কেমিক্যালসামগ্রীর আধিক্যও ভয়াবহ বিপদ ডেকে এনেছে। আগুন লাগার পর অতিউৎসাহী মানুষের ভিড়ের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম যেভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে তা দুর্ভাগ্যজনক। ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরাও আগুন নেভানো এবং উদ্ধারকাজে অংশ নেন। ছয় ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে আসে আগুন শ’খানেক মানুষের হতাহতের পর।

বনানীর এফআর ভবনের সিঁড়ির প্রশস্ততা ছিল মাত্র তিন ফুট। ভবনটির জরুরি সিঁড়ি মাত্র দুটি। হাজারখানেক লোকের জন্য এ ভবনে রয়েছে তিনটি লিফট। প্রতি লিফটে ১২ জন উঠতে পারতেন। উদ্ধারকর্মীদের অভিযোগ, ভবনের বেশিরভাগ ইমারজেন্সি এক্সিটের গেট তালাবদ্ধ ছিল। আগুন নেভানোর সময় পানির সঙ্কটও দেখা দিয়েছিল। এর পরও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পুরান ঢাকার মতো অভিজাত এলাকা বনানীতেও যথাযথ নির্মাণ নীতিমালা মেনে বহুতল ভবনগুলো নির্মিত না হওয়ায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এড়ানো যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২২ তলা বিল্ডিংয়ে ফায়ার ফাইটিংয়ের নিজস্ব কোনো ক্যাপাসিটি না থাকা দুর্ভাগ্যজনক। বিল্ডিংগুলোয় যতদিন পর্যন্ত আগুন নির্বাপণের নিজস্ব সক্ষমতা না থাকবে, ততদিন এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এফআর ভবনে প্রচুর দাহ্য পদার্থ থাকার পাশাপাশি বেশিরভাগ ইমারজেন্সি এক্সিটের গেট তালাবদ্ধ থাকায় বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, প্রতিটি বিল্ডিংয়ের গেটে একাধিক তালা দেওয়া ছিল। এতে মানুষের নামতে বাধার সৃষ্টি হয়েছে। চকবাজারের চুড়িহাট্টায় নিমেষেই ৬৯ জনসহ ৮১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে সংশ্লিষ্ট ভবনে কেমিক্যাল পণ্যের গোডাউন থাকায়। বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউর অগ্নিকাণ্ডে বিপুল হতাহতের ঘটনা ঘটেছে সংশ্লিষ্ট ভবনে পর্যাপ্ত বহির্গমন পথ না থাকার কারণে।  এদিকে বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউর এফআর টাওয়ারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজারে আগুন লেগে দেড় শতাধিক দোকান পুড়ে গেছে। অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের কোনো ঘটনা না ঘটলেও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দেড় শতাধিক পরিবারের কয়েকশ মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস। ভয়াবহ আগুন পাশের গুলশান শপিং সেন্টারের তিন তলার দুটি দোকানেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। স্মর্তব্য, প্রায় ২৭ মাস আগে গুলশানের একই মার্কেটে আগুন লেগে বিপুলসংখ্যক দোকান ভস্মীভূত হয়েছিল।  আগুন লাগলেও অল্পের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পায় ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটটি। ভোরে আগুন লাগায় রাস্তায় মানুষের ভিড় না থাকায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয়। দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হলে গুলশান শপিং সেন্টারও ভস্মীভূত হতো, কোনো সন্দেহ নেই।

গুলশানের কাঁচাবাজারের আগুন এ কথাই মনে করিয়ে দেয় যে, এসব বাজার ও মার্কেটে কোনোভাবে আগুন লাগলে তা যে কোনো বিপর্যয় ডেকে আনবে। আমরা আশা করব, জননিরাপত্তার স্বার্থেই সরকার এবং সিটি করপোরেশন সব ধরনের ভবন ও বিপণি কেন্দ্রে যাতে আগুন নেভানোর যথাযথ ব্যবস্থা থাকে তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে যত্নবান হবে। বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন তৈরি হলে ভবনের মালিক বা নির্মাণের সঙ্গে জড়িত আবাসন কোম্পানির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবতে হবে। চকবাজারের চুড়িহাট্টা ও বনানীর অগ্নিকাণ্ডে বিপুলসংখ্যক প্রাণহানি বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশের জননিরাপত্তা সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে, যার পুনরাবৃত্তি একটি দেশের জন্য কাম্য হতে পারে না। সুতরাং বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে আইন অনুসরণসহ কিছু লোভী মানুষের লোভ যাতে প্রশ্রয় না পায়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করছি।

 

লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads