• সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads

ফিচার

কমিউনিটি ক্লিনিক

গ্রাম-জনপদে স্বাস্থ্যসেবা

  • মামুন মুস্তাফা
  • প্রকাশিত ০৯ এপ্রিল ২০১৯

সময়ের ব্যবধানে স্বাস্থ্যসেবা খাতে যে প্রসারিত পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে , তার  সুফল এখনো পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও পরিস্থিতি আগের জায়গায় পড়ে নেই। বিশেষ করে, গ্রামীণ জনপদে চিকিৎসাসেবা এবং মানুষের স্বাস্থ্যসচেতনতার বদলে যাওয়া চিত্রটি ইতিবাচক নিঃসন্দেহে। শহর থেকে দূরে বসবাস করেন যে মায়েরা, একটু সচেতন হলেই, তারাও খুব সহজেই পেতে পারেন দরকারি স্বাস্থ্যসেবা। সারা দেশে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো ছাড়াও কমবেশি ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক সেবা দিয়ে  যাচ্ছে। প্রত্যেক উপজেলায় আছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতাল। সেখানে আছেন কিংবা বলা যায়, থাকার কথা ডাক্তার-নার্স সবই। তবে পাসকরা চিকিৎসকদের অনেকেই কর্মস্থলে থাকতে চান না। তাদের প্র্যাকটিসের জন্যে উপজেলা সদর নাকি মোটেও আদর্শ নয়। কর্তব্যকর্মে একশ্রেণির চিকিৎসকের অবহেলা বিড়ম্বনাকর হলেও, তৃণমূল ছুঁয়ে যাওয়া স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর অসম্পূর্ণ সুফল হিসেবে প্রসূতি ও শিশুমৃত্যুর হার বহুগুণে কমেছে। গড় আয়ুও বেড়েছে। নোবেল লরিয়েট অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন বছর কয়েক আগেই বাংলাদেশের এই সাফল্যের প্রশংসা করেছেন।

সম্প্রতি কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এর সেবার মান এবং এর অবকাঠামোগত দিকটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অথচ ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ‘কমিউনিটি ক্লিনিক-হেলথ রেভল্যুশন ইন বাংলাদেশ’ বইতে বাংলাদেশের কমিউনিটি ক্লিনিক সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের কমিউনিটি ক্লিনিক যেন পৌরাণিক ফিনিক্স পাখি। পাখিটি যতবারই আগুনে ঝাঁপ দেয়, ততবারই নতুন করে বেঁচে ওঠে। তেমনি ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে তৈরি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ হওয়ার পর আবার দারুণভাবে ফিরে এসেছে।’ দেখা হচ্ছে একে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে।

এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো থেকে প্রসব-পূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী সেবাসহ সময়মতো সব প্রতিষেধক টিকাদান এবং জ্বর, ব্যথা, কাটা-পোড়া, হাঁপানি, চর্মরোগ, ক্রিমি এবং চোখ, দাঁত ও কানের সাধারণ রোগের ক্ষেত্রে লক্ষণভিত্তিক প্রাথমিক চিকিৎসাও দেওয়া হয়ে থাকে। ক্লিনিকগুলোতে অস্থায়ী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সংক্রান্ত বিভিন্ন উপকরণসহ বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩ হাজার ২৩৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ৮০ থেকে ৯০ লাখ মানুষ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবা নেন।

এই অবস্থায় বিশাল সংখ্যক কমিউনিটি ক্লিনিকের কোনো কোনোটিতে সাময়িক দুরবস্থা দেখা দিতেই পারে। কিন্তু তা উত্তরণের পথও রয়েছে। প্রয়োজন সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এর মান এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করা। আমরা মনে করি, জনগণকে সম্পৃক্ত করে যে কোনো উদ্যোগ সফল হতে বাধ্য। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সুতরাং তাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া চলে না।

নবজাতক ও শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু এবং প্রজনন হার নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য খাতের ১০টি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সন্তোষজনক অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের প্রবণতা এখন ৫৫ থেকে ৬২ শতাংশ। ২৩ মাসের মধ্যে শিশুর সবগুলো মৌলিক টিকা গ্রহণের হার উঠেছে ৮৪ শতাংশে। আবার শিশুমৃত্যুর হার হাজারে ৬৫ থেকে ৪৬ জনে নেমেছে এবং জন্মের আগেই স্বাস্থ্যকর্মীর সেবা পাচ্ছে ৬৪ শতাংশ শিশু।  বিশ্বব্যাংক মনে করে, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা এবং পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচি (এইচপিএনএসডিপি)-এর সুবাদে বাংলাদেশের এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে দেশে ১৩ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক এইচপিএনএসডিপি’র আওতায় চালু হয়। এসব পদক্ষেপের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মানুষের গড় আয়ুও বৃদ্ধি পায়। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি)-এর আওতায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে বাংলাদেশ ২০১০ সালে জাতিসংঘের এমডিজি অ্যাওয়ার্ডও অর্জন করে।

এতদসত্ত্বেও দারিদ্র্য, উপকরণের অভাব, বিভিন্ন রোগের প্রকৃতির পরিবর্তন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি সরকারও স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের ক্ষেত্রে কিছু বাধা চিহ্নিত করেছে। তার মধ্যে দাতাদের অর্থ ছাড়ের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি তহবিলের অর্থ ছাড় না হওয়া, দক্ষ জনবলের অভাব এবং দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাজ করার অনাগ্রহ অন্যতম। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন নির্ভর করে তার দক্ষ ও পেশাদার জনগোষ্ঠীর ওপর।

এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান সমস্যার যথাযথ সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও সামাজিক অবকাঠামোগত সংস্কারের ভেতর দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লিখিত পুষ্টি সেবাসমূহ কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে নগর এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার পরিধিও সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে পড়েছে। সুতরাং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব কার্যক্রম সম্পন্ন করা গেলে দেশের সব শ্রেণির জনগোষ্ঠীর কাছে তাদের প্রয়োজনীয় ও কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।

অথচ সেই লক্ষ্য নিয়ে একটি সময়ে অর্থাৎ ২০১৫ সালে গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলায় প্রথম বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু হয়। এরপর ২০১৬ সালে নওগাঁ জেলার বদলগাছি, পত্নীতলা ও মহাদেবপুর উপজেলায় এই কার্যক্রম চালু করা হয়েছিল। মূলত কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের মানুষের দিনের শুরু হয় মাঠের কাজ দিয়ে। বর্তমানে এ কাজে যুক্ত হয়েছেন ঘরের নারীরাও। উপরন্তু এ অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের পাঠদান এবং উপজেলার অফিস-আদালতগুলোতেও কাজের শুরু সকালেই। বলা যায়, সকালের দিকে রুটি-রুজির কাজে ব্যস্ত থাকেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। সেই ভাবনা থেকে এতদাঞ্চলে বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের শুরু। অথচ আজ তা বন্ধ হয়ে গেছে।

কিন্তু শুরুতে এটা ছিল অত্যন্ত জনমুখী ও ফলপ্রসূ কর্মসূচি। তখন চিকিৎসকদের পাশাপাশি অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরাও বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবায় মনোযোগী হন। প্রথমে শুধু আউটডোর সার্ভিস দেওয়া হলেও পরে এক্স-রে, প্যাথলজি, আলট্রাসনোগ্রাম সবকিছুই যুক্ত হয় ওই সেবার আওতায়। আজ পরিতাপের বিষয়, সারা দেশ তো নয়ই বরং নওগাঁ জেলার উক্ত চার উপজেলায় এ কার্যক্রম এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। জানা যায়, কর্মসূচির প্রতি অনাগ্রহ, উদাসীনতা এবং সংশ্লিষ্টদের গা-ছাড়া ভাব এর মূল কারণ। কার্যত এর মাধ্যমে আমাদের চিকিৎসকদের পেশাদারিত্বের অভাব আবারো প্রকট হয়ে উঠেছে। এর উত্তরণেই এখন কাজ করা দরকার।

বর্তমানে এ প্রশ্নে সরকারের অবস্থান কঠোর। গত সরকারের মেয়াদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও কড়া বার্তা দিয়েছেন অনিচ্ছুক চিকিৎসকদের। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হয় কর্মস্থলে থাকো, নয়তো চাকরি ছেড়ে দাও। এরপর আশা করা যায় যে, সংশ্লিষ্টরা সাবধান হবেন। লোকের অসুখ-বিসুখে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রটি আরো  সহজ ও প্রসারিত হবে। এ কথা সত্য, আমাদের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অনেক যুগান্তকারী পরিবর্তন হয়েছে। যার মধ্যে একসঙ্গে ৬ হাজার ডাক্তারের পদায়ন ও ১০ হাজার নার্সের নিয়োগ অন্যতম। খুব অল্প সময়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৪০ হাজার কর্মচারী নিয়োগের ঘোষণা সরকারের দায়বদ্ধতারই প্রমাণ। এমতাবস্থায় আমরা মনে করছি, গ্রামীণ জনপদের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবাকে ত্বরান্বিত করতে বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের বিকল্প নেই। অতএব একমাত্র সরকারের সদিচ্ছাই পারে আবারো বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করতে।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বের মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রকল্প। মা ও শিশুর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে এ প্রকল্প। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশে সফরে এসে কমিউনিটি ক্লিনিকের উদ্যোগকে বিপ্লব হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেক্টরের এই সাফল্যকে ‘রোল মডেল’ হিসেবে অনুসরণ করতে বিশ্ববাসীকে পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি এ প্রকল্প সম্পর্কে বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিক গোটা বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন এক ধারণা। প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি করে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের এই অনবদ্য ধারণার জনক বাংলাদেশ।’

আসল কথা হলো, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত স্বাস্থসেবা খাতে যে অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তার সঙ্গে দায়িত্বশীলতার যোগ ঘটলে আমাদের জনস্বাস্থ্য আরো নিরাপদ ও সবল হয়ে উঠবে। আমরা হয়ে উঠব সত্যিকার অর্থেই সুস্থ-সবল এক জাতি। বলা বাহুল্য, জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সম্পর্কটি গভীর ও নিবিড়। বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট সব মহলের মনোযোগ আকর্ষণ করি। জনগণকে সম্পৃক্ত করে যে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে তা সফল হতে বাধ্য। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কমিউনিটি ক্লিনিক এমন একটা উদ্ভাবনী শক্তি, যার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এ সাফল্য বর্তমান সরকারের, এ অর্জন বাংলাদেশের।

 

লেখক : কবি, সাংবাদিক

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads