• রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫
ads

ফিচার

মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা আর শেখ মুজিব এক ও অভিন্ন

  • আসাদ উল্লাহ
  • প্রকাশিত ১২ এপ্রিল ২০১৯

শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মহান নেতা। বাংলাদেশের জাতির পিতা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জন আর মুজিব এক ও অভিন্ন। রাজনীতিতে মতবিরোধ বা ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না রাজনীতির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ব্যক্তির জীবনকে যতদূর সম্ভব সুন্দর করে গড়ে তোলা। যাদের এই বোধ-বিবেচনা নেই তারা মুজিব নিয়ে, জাতির পিতা নিয়ে অর্থহীন বিতর্ক করতেই পারেন।

জাতির পিতাকে অসম্মান ও অশ্রদ্ধা করে যারা কথা বলেন, তারা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না।  বিশ্বাস করেন না বাংলাদেশে। বাংলাদেশে তাদের থাকা ও রাজনীতি করার অধিকার আছে বলে মনে করি না। বলছিলাম মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা আর মুজিব এক ও অভিন্ন। পাকিস্তানের দুঃশাসন থেকে মুক্তির লড়াই বাঙালির জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতা, মুক্ত স্বদেশ, বাংলাদেশ। অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল দূরদর্শী আর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। মিছিলে নেতৃত্ব অনেকেই দিতে পারেন, দেশের স্বাধীনতার নেতৃত্ব সহজ কথা নয়। মুজিব পেরেছিলেন স্বাধীনতা অর্জনের নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করতে। তার ভাষণ, বক্তৃতা বাঙালিকে স্পন্দিত করে যুদ্ধজয়ের নেশায় উদ্ভাসিত করেছিল। মুজিবের দূরদর্শী নেতৃত্ব কেমন ছিল, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের বক্তব্য থেকে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে- বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের পেছনে পাকিস্তান প্রবর্তিত ঔপনিবেশিক গণতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা আছে। এই ধারাবাহিকতা থেকে তৈরি হয়েছে ১৯৭১-এর মার্চ মাসের অসহযোগ প্রতিরোধ উদ্ভূত অনিবার্যতা, যে অনিবার্যতা তৈরি করেছে মুক্তিযুদ্ধের অপ্রতিরোধ্যতা এবং একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের কার্যক্রম।

১৯৭১-এর মার্চ মাসের অসহযোগ প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। অসহযোগ আন্দোলনের লক্ষ্য পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো প্রত্যাখ্যান। পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে এই প্রতিরোধের সূত্রপাত। শেখ মুজিবুর রহমান একটি সামরিক রাজনৈতিক কার্যক্রমের মধ্যে এই প্রতিরোধকে একটি রাষ্ট্র গঠনে বদলে দেন। এক পক্ষে অসহযোগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো প্রত্যাখ্যান, অন্যপক্ষে অসহযোগের মাধ্যমে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রবর্তনার সম্ভাবনা জনমনে সত্য করে তোলা এই রণকৌশল শেখ মুজিবুর রহমান ৩৫টি নির্দেশনার মধ্য দিয়ে বাস্তব করে তোলেন। এই নির্দেশনার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের ভিত্তি তৈরি করে দেন এবং মুক্তিযুদ্ধের আগেই স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় নীতিমালার নির্দেশনা দেন। এই রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে জনসাধারণ, এই কর্তৃত্বের স্বরূপ সিভিল এবং সিভিল কর্তৃত্বের পুলিশ ও মিলিটারি। শেখ মুজিবুর রহমান এভাবেই  বঙ্গবন্ধু এবং জাতির জনকে অভিষিক্ত হন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের বাংলাদেশ নিয়ে আসলেন। নয় মাসের যুদ্ধ শেষে বিধ্বস্ত আর রক্তাক্ত বাংলাদেশ। পাক হানাদাররা শুধু হত্যাযজ্ঞই করেনি, একই সঙ্গে ধ্বংস করেছে দেশের সম্ভাবনার সম্পদও। প্রায় অন্তঃসারশূন্য একটি দেশ  পেয়েও প্রচণ্ড বিশ্বাসবোধ ছিল তার।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কি কেবলই স্বাধীনতার জন্য স্বাধীনতা চেয়েছিলেন? না। তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন দেশের আমজনতার অর্থনৈতিক মুক্তি। প্রতিটি মানুষের জীবনে যদি অর্থনৈতিক মুক্তি না আসে, তাহলে স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না কোনোদিনই। সে বিশ্বাস থেকেই তিনি লড়াই অব্যাহত রেখেছিলেন। লড়াই ছিল দেশগড়ার। লড়াই ছিল সমৃদ্ধতর দেশ বিনির্মাণের। তিনি বুঝেছিলেন বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ জিইয়ে রেখে সম্ভব নয় ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত দেশ- বিশ্ব। যে কারণে তিনি সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন। ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তা ও গণতন্ত্রের কথাও বলেছেন। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব চায় না দেশে দেশে অর্থনৈতিক সমতার পথ প্রতিষ্ঠিত হোক। তারা চায় দরিদ্রতা টিকে থাকুক, শ্রেণিবিভাজন বেঁচে থাকুক। দরিদ্রতা আর শ্রেণিবিভাজন মানেই তো শোষক, শোষিতের সমাজ বা দেশ, যা সাম্রাজ্যবাদীদের কাম্য। কাম্য এ জন্যই যে, তাহলে বিশ্বে মোড়লিপনার পথ সুগম থাকে। শিরদাঁড়া যার দৃঢ়, ব্যক্তিত্ব যার পর্বতের চেয়েও উচ্চকিত, সর্বোপরি যার মানবিক বোধ সীমাহীন, তিনি কখনোই এই নিষ্ঠুরতা মেনে নিতে পারেন না। যেমন পারেননি মুজিব। তা পারেননি বলেই বিশ্বচক্রান্তের শিকার হন এবং হয়ে ওঠেন বিশ্বের বিস্ময়, বিশ্বনেতা।

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। স্থূল এবং অসৎ উদ্দেশ্যে অনেকে ধর্মনিরপেক্ষতার ভুল বা অপব্যাখ্যা দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চান। ধর্মনিরপেক্ষতা মানেই হচ্ছে হানাহানিমুক্ত থাকা এবং অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ব্যবহারিক জীবনে নিজের ধর্মবোধের প্রয়োগ। নিজের ধর্মের মূলমন্ত্র সাম্য আর শান্তির কনকপ্রভা উচ্চকিত করা। জাতীয়তাবাদ মানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বাঙালিদের নিয়ে যে দেশ, সেই দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, অর্থাৎ বাংলাদেশের ভূখণ্ডের প্রতি নিয়ত প্রেমবোধ জাগিয়ে রাখা। সর্বোপরি বাঙালি জাতীয়তাবাদ মানে বাংলাদেশের শেকড়কে উজ্জীবিত করা, নিজের স্বাধীন পরিচয়কে আলোকিত করা। অনেকেই বলতে পারেন, বাঙালি তো ভারতেও আছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই বাঙালি আছে। সুতরাং এ ধরনের প্রশ্ন একমাত্র মূর্খরাই করবে।

গণতন্ত্রের ভিত সংহত না হলে মানুষ যেমন মতপ্রকাশের পথ হারায়, তেমনি হারায় অপরাপর অধিকার। তাছাড়া শেখ মুজিব যে সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন, সেই সমাজতন্ত্রের বিকাশ তো গণতান্ত্রিক ধারাতেই নিহিত। সুতরাং মুজিবের সংবিধান বিজ্ঞানসম্মত তো বটেই, বলা যায় সভ্যবভ্য মানবিক পৃথিবী নির্মাণেরও নিয়ামক।  নজরুল যেমন বলেছিলেন- ‘আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি, আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম, প্রেম পেলাম না বলে... চিরদিনের মতো নীরব অভিমানে বিদায় নিলাম।’ অনেকটা নজরুলের মতোই আমাদের মহান নেতা শেখ মুজিব এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘কোনো নেতা নয়, কোনো দলপতি নয়, আপনারা বাংলার বিপ্লবী, ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক ও সর্বহারা মানুষ রাতের অন্ধকারে কারফিউ ভেঙে মনু মিয়া, আসাদ, মতিউর, রুস্তম, জহুর, দোহা, আনোয়ারার মতো বাংলাদেশের দামাল ছেলেমেয়েরা প্রাণ দিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলে আমাকে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কবল থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন।

সেদিনের কথা আমি ভুলে যাইনি, জীবনের কোনোদিন ভুলব না, ভুলতে পারব না। জীবনে আমি যদি একলাও হয়ে যাই, মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো আবার যদি মৃত্যুর পরোয়ানা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, তাহলেও আমি শহীদের পবিত্র রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করব না। আপনারা যে ভালোবাসা আমার প্রতি অক্ষুণ্ন রেখেছেন, জীবনে যদি কোনোদিন প্রয়োজন হয় তবে আমার রক্ত দিয়ে হলেও আপনাদের এ ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ করব।’

সপরিবারে রক্ত দিয়ে শেখ মুজিব মূলত আমাদেরকেই ঋণী করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও বাঙালি বড় অকৃতজ্ঞ, এমনটিই যেন বলে গেছেন। তবে বাঙালি অকৃতজ্ঞ নয়। দিন যাচ্ছে আর উজ্জ্বল হচ্ছে মুজিব আদর্শের পতাকা। ইতোমধ্যে তার ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের আলোকিত ভাষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে। দিন আসবে কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের পথে পথে দ্যুতি ছড়াবে মুজিব-দর্শন, এমনটিই আমাদের বিশ্বাস।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads