• সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৫
ads

ফিচার

রমজানে দ্রব্যমূল্য

মুসলিম বিশ্বে কমলেও বাংলাদেশে বাড়ে

  • এস এম নাজের হোসাইন
  • প্রকাশিত ১২ এপ্রিল ২০১৯

পবিত্র মাহে রমজান সমাগত। ইতোমধ্যে সারা দেশে রমজানে ব্যবহার্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রমজান শুরুর দুই মাস আগেই পরিকল্পিতভাবে রমজাননির্ভর নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে রমজানে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে এমন অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে বাজারে প্রচলিত জেলা প্রশাসন, ডিএমপি, র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের বাজার অভিযান পরিচালিত হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। উল্টো বেড়েই চলেছে নিত্যপণ্যের দাম। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে দুই মাস ধরে এ ধারা অব্যাহত থাকলেও গত দুই সপ্তাহে বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এ মূল্যবৃদ্ধির জন্য পাইকাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের এবং খুচরা বিক্রেতারা পাইকারদের দায়ী করছেন। তবে বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ী নির্ভরতা এবং রমজান মাস সামনে রেখে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মজুত করার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণেই বেশিরভাগ পণ্যের দাম বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মূল্যসন্ত্রাসী, মুনাফাখোর, সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নকল, ভেজাল ও মানহীন পণ্যের দৌরাত্ম্যের কারণে আজ নাগরিক জীবন অতিষ্ঠ। মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকার অধিকার এখন মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। একশ্রেণির নীতি আদর্শহীন, অতি মুনাফালোভী, অসাধু ব্যবসায়ীদের রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার বাসনায়, তাদের ইচ্ছামতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সঙ্কট সৃষ্টি করে ও দাম বাড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অতিষ্ঠ করে তোলে। আশ্চর্য ব্যাপারটি হলো, ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ালেও ওই পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য কমলেও তারা আর কমায় না। সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে গুটিকয়েক অসৎ ব্যবসায়ীর স্বার্থ সংরক্ষণে যাবতীয় রীতিনীতি প্রণয়ন করার কারণে সাধারণ জনগণের স্বার্থ বার বার উপেক্ষিত হয়। ফলে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়ানো, কমানো, সরবরাহসহ বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। যার কারণে রিকশা, সিএনজি, বাড়ি ভাড়া, বাস ভাড়া থেকে শুরু করে নগরীর সেলুন, ফটোস্ট্যাট, বিস্কুট, পাউরুটি, কাঁচাবাজার, ফলমূলের ব্যবসায়ী, ফার্মেসিসহ সবাই তাদের ইচ্ছামতো পণ্য ও সেবার মূল্য নির্ধারণ করছে। সেখানে সরকারি কোনো সমন্বয় তো দূরের কথা, সরকারের সংশ্লিষ্ট লোকজন এর খবরই রাখেন না।

স্বাভাবিক কারণে ব্যবসায়ীদের স্বার্থহানি হয় এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত তারা নেবেন না। আবার ব্যবসায়ী ও চেম্বারগুলোকে সরকার এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান ও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির অনেক উদ্যোগ নিলেও ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং তাদের সংগঠনগুলোর প্রতি অবহেলার কারণে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে বৈষম্য ও ব্যবধান বেশি হওয়ার কারণে দেশে ন্যায্য ব্যবসার পরিবেশ ও সংস্কৃতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে অসুস্থ পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং কিছু মধ্যস্বত্বভোগী ও মৌসুমি ব্যবসায়ীর আবির্ভাব ঘটছে। আর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে ভোক্তাদের সংগঠনগুলোর ব্যবধান এবং তাদের সক্ষমতা এত বেশি যে, সেখানে তাদের হাতে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকারি প্রশাসন যন্ত্রও অসহায় হয়ে পড়ে। সে কারণে পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখার জন্য সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সব মহল থেকে ব্যবসায়ীদের বার বার অনুরোধ করার পরও তাদের প্রতিশ্রুতি কোনো কাজেই আসে না।

সরকার ব্যবসা-বাণিজ্যের সহায়ক পরিবেশ তৈরি, দেশে ন্যায্য ব্যবসার প্রসার ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থধারা প্রবর্তনের স্বার্থে ব্যবসায়ী সংগঠন, বিশেষ করে ফেডারেশন অব চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজসহ বিভিন্ন চেম্বারগুলোকে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, তাদের সদস্য সংগঠনগুলোর দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি অনুদান ছাড়াও জিএসপি সুবিধা, কর রেয়াত, বিভিন্ন প্রণোদনা, ভর্তুকিসহ নানা ধরনের নগদ সহায়তা প্রদান করে থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বিগত অর্থবছরে এফবিসিসিআই ও অন্যান্য চেম্বারকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক অনুদান ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বহুজাতিক ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো থেকে বিশেষ অনুদান ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে।

আমাদের জানামতে ভোক্তা সংগঠনগুলো সমগ্র জেলা ও উপজেলা, মহানগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে, পৌরসভাগুলোতে শাখা কমিটি গঠন করে ভোক্তাদের সংগঠিত ও ভোক্তাদের সচেতনতা বিস্তারে কাজ করছে। এ জন্য সদস্য-সদস্যাদের চাঁদা, স্থানীয় জনগণের অনুদান, সদস্যদের স্বেচ্ছাশ্রম নিয়েই যাবতীয় কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে হয়। আর্থিক সঙ্কট, প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল, লজিস্টিক ও অন্যান্য সুবিধার অভাবে ভোক্তা সংগঠনগুলো জনগণের বিপুল চাহিদা মিটাতে পুরোপরি সক্ষম হয়ে উঠতে পারছে না। ফলে বাংলাদেশে ব্যবসায়ী সংগঠন ও ভোক্তা সংগঠনগুলোর মাঝে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা, কারিগরি সক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে বিশাল আকারের পার্থক্য রয়ে গেছে, যেটি বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ ধারার বিকাশে বড় প্রতিবন্ধক। উন্নত বিশ্বে ভোক্তারা পণ্যের নিয়ামক হলেও বাংলাদেশে তার পরিস্থিতি উল্টো। এখানে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরাই পণ্যের মূল। তারা যা বাজারজাত করবে, ভোক্তারা তা-ই হজম করতে বাধ্য। কারণ এখানে ভোক্তাদের পছন্দ-অপছন্দের কোনো সুযোগ নেই। সরকার এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাংলাদেশে ভোক্তা আন্দোলন গতি পায়নি। ফলে ভোক্তারা প্রতি পদে পদে ঠকছে। আর এজন্য ব্যবসায় সুস্থ ধারার বিকাশ সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণে এখানে ফটকাবাজ, মৌসুমি ব্যবসায়ী, অসৎ ধান্ধাবাজ ব্যবসায়ীর আবির্ভাব ঘটেছে প্রচণ্ডভাবে। দিনে দিনে কোটিপতি হওয়ার বাসনায় অনেক লোক অনৈতিক ব্যবসায় ঝুঁকছেন। তাদের সে অপবাসনার বলি হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। যার পরিণতি পবিত্র রমজান, ঈদ, পূজা-পার্বণে বাজারে চিনি, ছোলা, সয়াবিন, পেঁয়াজ উধাও হয়ে যায়।

ভোক্তাদের সঙ্গে আরেকটি অধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে, তাহলো ভোক্তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্বের অধিকার হরণ। বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত যে কোনো নীতিনির্ধারণীর প্রশ্নে সব জায়গায় অসম অংশগ্রহণ এবং সব ক্ষেত্রেই যাদের জন্য নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে, তাদের অংশগ্রহণ থাকে নামমাত্র। যেমন- আঞ্চলিক সড়ক পরিবহন কমিটি, বাস ভাড়া নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব নেই, এখানে বাস মালিক, শ্রমিক ছাড়া কিছু সরকারি কর্মকর্তা প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। সে কারণে যাত্রীদের প্রকৃত সমস্যা উদঘাটনের পরিবর্তে এখানে বাস মালিকদেরই স্বার্থ রক্ষা করা হয়। ঠিক একইভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ, মূল্য নির্ধারণ বিষয়ক যে কোনো সভায় শুধু ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সেক্টরের সরকারি কর্মকর্তারাই অংশ নিয়ে থাকেন। এখানে ভোক্তাদের অংশগ্রহণ নেই। এসব নীতিনির্ধারণী সভায় শুধু ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব থাকার কারণে সাধারণ ভোক্তা বা জনগণ তাদের সমস্যা ও ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরতে পারেন না। সে কারণেই এসব নীতিনির্ধারণী সভা অনেকটাই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যস্ত থাকেন। ফলে জনগণের স্বার্থ ও অধিকার এখানে পুরোপুরি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। অথচ ভোক্তা সংরক্ষণ আইন ২০০৯ অনুযায়ী এফবিসিসিআই ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং ক্যাব ভোক্তাদের প্রতিনিধি হলেও সরকারের অধিকাংশ নীতিনির্ধারণী ফোরামে ক্যাবকে সে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না, যা ভোক্তা অধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন।

তাই এখন প্রয়োজন এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মাঝে বৈষম্য দূর করতে ভোক্তা সংগঠনগুলোর প্রতি সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো জরুরি। সরকার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতো ভোক্তা সংগঠন, বিশেষ করে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও শাখাগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব ও সমন্বয় সাধনে সক্ষমতা বাড়ানো, ভোক্তাদের মাঝে সচেতনতা ও শিক্ষা প্রদান করে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মাঝে ব্যবধান হ্রাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, সেবা সার্ভিসসহ ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ বিষয়ে সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংগঠনের সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া আধিপত্য ও প্রভাব খর্ব হবে। তখন জনগণ আর মূল্য সন্ত্রাসীদের দ্বারা সর্বস্বান্ত হবে না। মনে রাখতে হবে, জনগণ তথা সাধারণ ভোক্তারাই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

 

লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

হধুবৎ.পধননফ—মসধরষ.পড়স

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads