• সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads

ফিচার

নিয়মের অবজ্ঞাই বাড়াচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা

  • হিমেল আহমেদ
  • প্রকাশিত ১৩ এপ্রিল ২০১৯

বাংলাদেশে বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়কে মৃত্যুর খবর আমরা পাই যা সত্যিই বেদনাদায়ক। ইদানীং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। আছেন নারী ও শিশুরাও। অনেক সচেতনতা, আন্দোলন ও নিয়মকানুনের পরেও দিন দিন সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি এক জরিপে জানা গেছে, সারা দেশে মহাসড়ক, আন্তঃজেলা ও আঞ্চলিক সড়কে গত তিন মাসে ১ হাজার ১৬৮টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২১২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন আরো দুই হাজার ৪২৯ জন। বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির (এনসিপিএসআরআর) নিয়মিত মাসিক জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য বলা হয়েছে।

এই জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে সড়কে মৃত্যু বর্তমানে দেশের জন্য একটি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত দিন যাচ্ছে ততই সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে; কিন্তু এর সমাধানও পাওয়া যাচ্ছে না। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে। চাহিদা মেটাতে গিয়ে সড়কে বাড়ছে পরিবহন। আয়তন অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা অধিক এটি নতুন সমস্যা নয়। জনসংখ্যার চাহিদা মোতাবেক গণপরিবহনের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অভাব রয়েছে দক্ষ চালক ও প্রশস্ত রাস্তার। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় মৃত্যু কেন এত বাড়ছে এ নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার শেষ নেই।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির জরিপ অনুযায়ী গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ হাজার ১২০ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২০ জন। এই সময়ে আহত হয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন, যা বিগত বছরগুলোর চেয়ে বেশি। এসব দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটেছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতির কারণে। সড়কে মৃত্যু নিয়ে  অন্য একটি বেসরকারি সংস্থা নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি (এনসিপিএসআরআর)   তাদের পর্যবেক্ষণে ১০টি কারণ উল্লেখ করেছে। যে কারণগুলো পর্যবেক্ষণ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। সংস্থাটির ১০টি কারণগুলো হলো :

১.   চালকদের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও বেপরোয়া গতিতে চালানো।

২.   দিনভিত্তিক চুক্তিতে চালক, কন্ডাক্টর অথবা হেলপারের কাছে গাড়ি ভাড়া দেওয়া।

৩.   অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক নিয়োগ।

৪.   সড়কে চলাচলে পথচারীদের অসতর্কতা।

৫. বিধি লঙ্ঘন করে ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং।

৬.   দীর্ঘক্ষণ বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো।

৭.   ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব ।

৮.   জনবহুল এলাকাসহ দূরপাল্লার সড়কে ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা।

৯.   সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেলসহ তিন চাকার যান চলাচল বৃদ্ধি।

১০.  স্থানীয়ভাবে তৈরি ইঞ্জিনচালিত ক্ষুদ্রযানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন।

উক্ত কারণগুলোর সঙ্গে আমিও একমত। দেশের বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থা পাল্টানো জরুরি। সেই সঙ্গে জনগণের সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। বুয়েটের এআরআইর গত বছরের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে বছরে মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ হারিয়েছে বাংলাদেশ। দুর্ঘটনায় জানমালের ক্ষতি ও দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্ট যানজট অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা আমাদের দেশের জন্য অশনিসংকেত। এভাবে চলতে থাকলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। অচিরেই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে আমি মনে করি। সড়কে দেখা যায় বেপরোয়া গাড়িচালক গণপ্রতিযোগিতায় নামেন কে কাকে ওভারটেক করে আগে যেতে পারে। গাড়িচালকদের এটি বন্ধ করা উচিত। গাড়ি মালিকদের কখনো উচিত নয় যে অদক্ষ চালকদের ড্রাইভারে আসনে বসানো। রাস্তার দুই ধারে খুবই স্পষ্টভাবে লেখা থাকে গাড়ি চালানোর বিভিন্ন নিয়মরীতি। চালকরা সেগুলো মানতে নারাজ। অনেকেই আছেন যারা শিক্ষিত নন। গাড়িতে থেকে কোনোমতে গাড়ি চালানো শেখার পর ড্রাইভারের আসনে বসেন। একজন চালকের ওপর অসংখ্য যাত্রীর জীবন নির্ভরশীল এই বিষয়ে  অনেকেরই মূল্যবোধের প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। পরিবহন সেক্টরে বেশিরভাগ ব্যক্তি মাদকাসক্ত। কয়েকদিন আগেই এক দুর্ঘটনাজনিত গাড়ির ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল- তিনি কেন মাদক সেবন করেন? জবাবে তিনি বলেছেন, মাদক সেবন ছাড়া গাড়ি চালাতে পারেন না! এমন অসংখ্য গাড়িচালক আছেন যারা মাদকাসক্ত যাদের  চালকের আসনে বসানো উচিত নয়। এজন্য অচিরেই চালকদের জন্য বিনামূল্যে সরকারিভাবে গাড়ি চালানোর ট্রেনিং সেন্টার খোলা উচিত। ফিটনেসবিহীন পরিবহন বাতিল করে সড়কে চলাচল যোগ্য পরিবহনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা উচিত।

প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই শহরে আমরা সবাই ব্যস্ত! তাই আমরা নিজেরাই ওই পরিবহনকে খুঁজি যেটা সব ওভারটেক করে সবার আগে গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম! এখানে দায়ী আমরা নিজেরাই। তাই একতরফা চালকদের দোষ দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই! যত্রতত্র রাস্তা পার করা আমাদের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই আছেন যাদের চোখ মোবাইল স্ক্রিনে থাকে! অন্য পাশ দিয়ে যে গাড়ি আসছে, সেদিকে খেয়াল নেই। ফুটপাথ ছেড়ে সড়ক দিয়ে হাঁটছি আমরা, রাস্তায় গাড়ি তীব্রগতিতে আসা দেখেও রাস্তা পার হতে দ্বিধান্বিত হই না। ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা অতিক্রম করছি। এরকম অসংখ্য নিয়মকানুনকে আমরা প্রতিনিয়ত অবজ্ঞা করছি যার কারণে ক্রমাগত সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছেই। তাই শুধু চালকদের নয়, সচেতন হতে হবে আমাদেরও। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু আমরা আর চাই না। সবার সহযোগিতা ও সচেতনতায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক

রসঢ়ধৎভবপঃযববসবষ—মসধরষ.পড়স

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads