• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
ads
গর্ভাবস্থায় বিষণ্নতা...

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

গর্ভাবস্থায় বিষণ্নতা...

  • সৈয়দা রাকীবা ঐশী
  • প্রকাশিত ২২ এপ্রিল ২০১৯

গর্ভাবস্থায় নারীদের মধ্যে যেসব মানসিক পরিবর্তন লক্ষ করা যায় তার মধ্যে বিষণ্নতা অন্যতম। গর্ভাবস্থায় মায়েদের শরীরে এক ধরনের হরমোন উৎপাদন বেড়ে যায় যেটি মস্তিষ্কের সেসব অংশকে প্রভাবিত করে, যা মানুষের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ ছাড়া আরো কিছু কারণে এ সময়ে মায়ের বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তা বা অবসাদ্গ্রস্তভাব দেখা দিতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে লিখেছেন সৈয়দা রাকীবা ঐশী

 

অনেক সময় গর্ভাবস্থায় কিছু অসুস্থতায় যেমন মর্নিং সিকনেস, অ্যানেমিয়া, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ইত্যাদি কারণে মায়ের দেহ স্বাভাবিকভাবে দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে এ সময় নানা ধরনের দুশ্চিন্তা এমনকি মৃত্যুভয়ও কাজ করে। ফলে মায়ের মধ্যে বিষণ্নতা তৈরি হয়।

গর্ভকালীন হবু মা তার দুর্বলতা ও ক্লান্তির কারণে অনেক সময় স্বাভাবিক কাজকর্ম সহজে করতে পারে না। যেটি তার মনে হতাশা ও বিষণ্নতা তৈরি করে। নারীদের বিশেষ এই সময়টাতে সঙ্গীর কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায় অনেক। ফলে সঙ্গীর কাছ থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা এবং স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা না পেলে বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে।

বর্তমান সমাজে একক পরিবারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হবু মাকে অনেক সময়েই একা থাকতে হয়। পরিবার-পরিজনকে কাছে না পাওয়ার ফলে তাকে একাকী নানা রকম মানসিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যা মাকে বিষণ্ন করে তুলতে পারে।

পরিবারের আসন্ন নতুন সদস্যটির জন্য সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা থাকে বাবা-মায়ের। অনাগত শিশুর ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়েও মায়ের মধ্যে উদ্বিগ্নতা লক্ষ করা যায়।

মায়ের কম বয়স অথবা বেশি বয়সে গর্ভধারণে কোনো শারীরিক সমস্যা হয়ে থাকলে, অথবা পূর্বে গর্ভপাত অথবা মৃত শিশু প্রসবের ইতিহাস থাকলে, পরবর্তী সময়ে আবার গর্ভধারণ করা মা এক ধরনের আশঙ্কায় ভুগতে থাকেন- যা থেকে বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে।

যদি ইতোমধ্যে আপনি অতীতে বিষণ্নতায় ভুগে থাকেন বা আপনার পরিবারের কারো এই সমস্যা থেকে থাকে। পূর্বে বিষণ্নতা না থেকে থাকলেও আপনার পুরোপুরি সম্ভাবনা থাকে গর্ভাবস্থায় এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার। যদি আগেরবার গর্ভধারণের সময় বা প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকে, তবে পরবর্তী গর্ভধারণের সময় বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

বিষণ্নতার লক্ষণগুলো কী কী?

গর্ভাবস্থায় এবং প্রসব-পরবর্তী সময়ে ঠিক কতজন মহিলা বিষণ্নতায় ভোগেন তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই মহিলাদের ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, মানসিক বিক্ষিপ্ততা এবং মেজাজের তারতম্য দেখা যায়- যেটা বিষণ্নতা চিহ্নিত করাকে ব্যাহত করতে পারে। একজন গর্ভবতী কী করে বুঝবেন যে তিনি বিষণ্নতায় ভুগছেন কি না। নিম্নোক্ত কিছু বিষয় যদি মায়ের মধ্যে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অপরিবর্তনীয় থাকে, তাহলে বুঝতে হবে আপনি বিষণ্নতায় ভুগছেন।

* কোনো কিছুতে আনন্দ খুঁজে না পাওয়া। খুব পছন্দের কোনো কাজ বা ঘটনাতেও আনন্দ লাভ না করা।

* গভীর দুঃখবোধ এবং হতাশা কাজ করা।

* সবসময় কান্না আসা।

* সবসময় অস্থির বোধ করা।

* অল্পতেই রেগে যাওয়া এবং অকারণে বিরক্ত হওয়া।

* অপরাধ বোধে ভোগা, নিজেকে দোষী ও মূল্যহীন ভাবা।

কারো সঙ্গে না মেশা।

* সবসময় ক্লান্তিবোধ এবং নিদ্রাহীনতা।

গর্ভাবস্থায় বিষণ্নতা মারাত্মক আকার ধারণ করার আগেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

মায়ের বিষণ্নতায় শিশুর ক্ষতি

গর্ভাবস্থায় মা যদি বিষণ্নতায় ভুগে থাকেন, তবে তা গর্ভস্থ সন্তানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। মা বিষণ্নতায় ভুগলে পরবর্তী সময়ে সে সন্তানের মধ্যেও বিষণ্নতা লক্ষ করা যায়। এবং একপর্যায়ে সেও বিষণ্নতার শিকার হতে পারে। ফলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় যেসব মা বিষন্নতার শিকার হন, সেসব মায়ের সন্তানের মস্তিষ্ক বিকাশ ঠিকমতো হয় না। বিষণ্নতা গর্ভের শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশে বাধা প্রদান করে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষকের গবেষণা ফল থেকে জানা যায় যে, বিষণ্নতায় মায়েদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের পরিমাণ বেশি থাকে। এই  হরমোনটি গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা ভেদ করতে সক্ষম। যার ফলে গর্ভস্থ ভ্রূণের মস্তিষ্ক বিকাশে বাধার সৃষ্টি করে।

বিষণ্নতাগ্রস্ত মা উদাসীনতার কারণে নিজের ঠিকমতো যত্ন নেন না, যেমন-পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত ঘুম, প্রি-ন্যাটাল চেকআপ। ফলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। এসব শিশুর মধ্যে সাধারণত জন্মের পর অন্যান্য শিশুর চেয়ে প্রাণচাঞ্চল্য কম দেখা যায়। এরা অন্য স্বাভাবিক শিশুর মতো স্বতঃস্ফূর্ত কথাবার্তা ও খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে না।

গর্ভকালীন বিষণ্নতা যথাসময়ে কাটিয়ে উঠতে না পারলে মা প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন। প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত মায়ের সার্বিক অবস্থা বাচ্চার ওপর প্রভাব ফেলে।

গর্ভস্থ শিশু স্বল্প ওজন নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই ভূমিষ্ঠ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ৩৭ সপ্তাহের আগেই বাচ্চার জন্ম হতে পারে।

গর্ভবতীর বিষণ্নতা আপাতদৃষ্টিতে অনেক সাধারণ মনে হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads