• রবিবার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৫
ads
চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী তিসিখালি মেলা

হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.)-এর মাজার শরিফ

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী তিসিখালি মেলা

  • মোহাম্মদ অংকন
  • প্রকাশিত ২৩ এপ্রিল ২০১৯

নাটোরের সিংড়া উপজেলা শহর থেকে প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে চলনবিলের মাঝখানে অবস্থিত হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.)-এর মাজার শরিফ, লোকে যাকে ‘তিসিখালি মাজার’ বলে চিনে থাকেন। প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে এই মাজার প্রাঙ্গণে পবিত্র ওরস শরিফ বা মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই মেলাকে কেন্দ্র করে চলনবিল এলাকার বিভিন্ন গ্রামে চলে মহোৎসব। মেলা সামনে রেখে বাড়ি বাড়ি নানা আয়োজন এ অঞ্চলে এক সম্প্রীতির বার্তা বয়ে আনে। এ মেলা শুধু মেলা নয় যেন চলনবিল অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি প্রতীক্ষিত দিন, একটি উৎসবের দিন।

ঐতিহ্যবাহী তিসিখালি মেলার প্রচলন বহু বছর আগে থেকে। মাজার তৈরি ও মেলা শুরুর সঠিক ইতিহাস কোথাও তেমন লিপিবদ্ধ নেই। লোকমুখে এই মাজার ও মেলাকে নিয়ে অনেক কিংবদন্তি শুনতে পাওয়া যায়। জনশ্রুতি আছে, বড়পীর হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর নির্দেশে হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.) সুদূর আরব থেকে নাটোর জেলায় আসেন। তার আসল নাম কেউ না জানলেও হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.) বা ‘ঘাসি বাবা’ নামটি লোকমুখে প্রচলিত। হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.)-এর জীবনাচরণ ও নামকরণের বিষয়টি সম্পর্কে আরো জোরালো কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। তা হলো, চলনবিলের ফসলি জমিতে একসময় প্রচুর তিসি বা তিল ফলের চাষ হতো। মাঠে বেড়ানোর সময় একদিন দেওয়ান সাহেব মালিকের অনুমতি ছাড়া একটি তিল মুখে দেন। হঠাৎ দৈববাণীতে তিনি তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত বোধ করেন এবং মালিকের কাছে নিজের ক্ষমা লাভের আশায় তাকে খুঁজতে থাকেন। স্থানীয় ডাহিয়া গ্রামে এক ঘোষ পরিবার ছিলেন সেই জমির মালিক। তার কাছে বারো বছর বিনা বেতনে চাকরের কাজের জন্য আবেদন করেন। উল্লেখ্য, জমির মালিক ছিলেন হিন্দু ধর্মের লোক। দয়াবশত তিনি দেওয়ানকে রাখালের কাজ দেন। তার কাজ ছিল গবাদিপশুর দেখভাল করা এবং তাদের  জন্য চলনবিলের মাঠ থেকে ঘাসের জোগান দেওয়া।

কিন্তু ক্রমেই তার কিছু অলৌকিক ঘটনা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং সবাইকে অবাক করে দেয়। এসব অলৌকিক ঘটনা হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.)-কে করে তোলে অনন্য। অবশেষে বারো বছর বিনা বেতনে শ্রমের পর তিনি মুক্ত হন এবং তার আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাস করে সেই মালিকের পরিবার হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.)-এর কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। দেখতে দেখতে তার অগণিত অনুসারী জুটে যায় এবং তিনি এ অঞ্চলে নির্বিঘ্নে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে শুরু করেন ও জনসেবায় ব্রতী হন। পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যুর পর সবাই কবরটিকে হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.)-এর মাজার হিসেবে বিবেচনা করে আস্তানা গড়ে তোলেন এবং প্রতি বছর ওরস শরিফ পালন করা হয়। বর্তমান সময় থেকে প্রায় ৬০০-৭০০ বছর আগে চন্দ্রবর্ষের চৈত্র মাসের অষ্টমী-নবমী তিথি থেকে মেলার প্রচলন শুরু হয়েছিল যা এখনো প্রতি বছর হয়ে আসছে একই সময়ে। তিসি খাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন অলৌকিক ঘটনার জন্য মেলার নামকরণ করা হয় ‘তিসিখালি মেলা’।

তিসিখালি মেলা চলনবিলাঞ্চলে সর্ববৃহৎ মেলা। বিগত কয়েক বছরের মেলার পরিবেশ থেকে উঠে এসেছে যে ক্রমশ ঐতিহ্য হারাচ্ছে মেলাটি। আগের মতো তেমন লোকের সমাগম নেই বললেই চলে। তেমন দোকানপাটও বসে না। হারিয়ে গেছে মেলার বিশেষ বিশেষ কিছু আকর্ষণীয় বিষয়। যেমন— আগে টিনের বেড়া টিনের চাল ছিল এখানে। মেলার দিন মাটির তৈরি ঘোড়া ছিল মূল আকর্ষণ। এগুলো টিনের চালে নিক্ষেপ করা হতো। কবুতর, মুরগি মানত করে ছেড়ে দেওয়া হতো টিনের চালে। এবং দৌড়াদৌড়ি করে সবাই এগুলো ধরতো।

এসব নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যা অনেককে ব্যথিত করে। একসময় মেলাকে কেন্দ্র করে রাতভর ভক্তদের আয়োজনে বাউল গান, হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহঃ)-কে নিয়ে লেখা গানসহ বিভিন্ন গানের আসর বসত। এখনও বসে, তবে তুলনামূলক কম। তবে এর ঐহিত্য হারানোর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে— মেলাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত খাজনা আদায়, পরিচালনা কমিটির দুর্নীতি, স্থানীয়দের দখলদারিত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং দোকানদারদের থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি। তাছাড়া একশ্রেণির জুয়াড়িদের দাপটে মেলায় আগতদের আগ্রহ কমে গেছে। নিরাপত্তার অভাবে দেশের অন্যান্য প্রান্ত থেকে আগতরাও আসার অনীহা প্রকাশ করে থাকেন।

এছাড়া ধীরে ধীরে মেলার পরিধি কমছে। এর পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতার দায় রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। মেলার শৃঙ্খলা বিন্যাসে অনীহার কারণে মেলাকে দখল করা নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা গন্ডগোল, হট্টগোল করে থাকে যা মেলার ঐতিহ্য নষ্টের মূল কারণ বলে বিবেচ্য। জেলা প্রশাসন মেলাকে কেন্দ্র করে অপরিমেয় ডাক দেয়, খাজনা আদায় করে। এতে চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় দোকানদাররা দূরদূরান্ত থেকে এসে জিনিসপত্র বিক্রি করে পুষিয়ে উঠতে পারে না।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় মাটির হাঁড়ি, পাতিল, বাঁশ, কাঠ, বেতের তৈজসপত্র ব্যবহারের আগ্রহ না থাকায় মেলায় এসব আর তেমন বিক্রি হয় না। ফলে দোকানিদের লোকসান গুনতে হয় এবং অনেকেই এসব কারুকাজের কাজ ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত। মেলায় পাওয়া মিষ্টি, দই ও অন্যান্য খাবারে ভেজাল থাকায় অনেকে এগুলো মেলা থেকে সংগ্রহ না করে বাজার থেকে সংগ্রহ করে মেলা উদযাপন করে। এসব কারণে মেলার আনুষ্ঠানিকতা ক্রমেই হ্রাসের দিকে। ঐতিহ্য নষ্টের পথে।

চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী তিসিখালি মেলা আমাদের প্রাণের চলনবিল অঞ্চলের মানুষের জন্য যেমন গর্বের বিষয়, তেমনি মেলা উদযাপনের মধ্যে নিহিত আছে অতীতের নানা অভিজ্ঞতা, ইসলাম ধর্মের প্রতি দৃঢ়তা। স্থানীয়দের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.)-এর মাজার ঘরটি টিকে আছে এবং তা ক্রমেই উন্নত হচ্ছে। সবাই সচেতন হলে, মেলা বসাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দখলদারিত্ব না হলে, মেলার পরিবেশ সুষ্ঠু থাকলে তিসিখালি মেলা ফিরে পাবে তার বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য। চলনবিল সম্পর্কে দেশের অনেকে অবহিত হলেও হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.)-এর মাজার সম্পর্কে লোকজন একটু কমই জানেন। তাই এটির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ঘটনাপ্রবাহ প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে মেলামুখী করা যাবে- এমনটাই প্রত্যাশা করছি।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক

সফ.ধহমশড়হ১২—মসধরষ.পড়স 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads