• মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬
ads

ফিচার

কৃষিজমি রক্ষায় পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ২৪ এপ্রিল ২০১৯

উন্নত দেশগুলোয় ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব উপাদানের ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশে এখনো ব্যবহূত হচ্ছে গতানুগতিক ধারার নির্মাণসামগ্রী। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নগরায়ণ। সারি সারি সুউচ্চ ভবন বা বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণ হলেও ভবন নির্মাণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় উপাদান ইট। আর এই উপাদানটি এখনো মাটি পুড়িয়ে প্রচলিত পদ্ধতির ওপরই নির্ভর করছে। অথচ উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশই প্রচলিত ইটের বদলে ভবন নির্মাণে বালি, সিমেন্ট ও নুড়িপাথর দিয়ে বানানো ব্লক ব্যবহার করছে। যার মাধ্যমে কমছে কার্বন নির্গমন। রক্ষা পাচ্ছে ফসলি জমি ও বনভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ। অনুসন্ধানে জানা যায়, ভবনে প্রচলিত ইটের বদলে এসব পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করা হলে নির্মাণব্যয় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। শুধু ব্লক ব্যবহারেই এ ব্যয় কমবে কম করে হলেও ১০ শতাংশ। বাজারে প্রতিটি ব্লকের দাম এখন ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। একেকটি ব্লক আকারে সাড়ে চারটি প্রচলিত ইটের সমান, যার বর্তমান বাজারমূল্য ৪০ থেকে ৫০ টাকা।

ফসল উৎপাদনের পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে মাটির জৈব পদার্থ। জৈব পদার্থ শুধু মাটির উপরাংশে বিদ্যমান থাকে। যতই নিচের দিকে যাওয়া যায়, জৈব পদার্থের পরিমাণ ততই কমতে থাকে। এ কারণে ফসলি জমির উপরিভাগ থেকে মাটি সংগ্রহের ফলে এসব জমিতে ফসল উৎপাদনের জন্য অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়। যার প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্যের ওপর। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে সাত হাজারের অধিক ইটভাটায় কমপক্ষে ১২৭ কোটি ঘনফুট মাটির প্রয়োজন হয়। এই মাটির বেশিরভাগই ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ অর্থাৎ কৃষিজমির উপরিভাগ থেকে উত্তোলন করা হয়। এর ফলে দেখা কৃষি কাজের উপযোগী একটি আদর্শ মাটিতে শতকরা পাঁচ ভাগ জৈব পদার্থের উপস্থিতির আবশ্যকতা থাকলেও  বেশিরভাগ মাটিতে গড় শতকরা এক ভাগেরও কম রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিবছর ৪৫ মিলিয়ন কৃষিজমির ভূ-উপরিভাগের মাটি চলে যাচ্ছে ইট নির্মাণে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৫০ বছরে বিপর্যয় ভয়াবহ হবে। আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের মতে, কংক্রিট ব্লক ছাড়াও পরিবেশ বান্ধব ও সাশ্রয়ী আরো অনেক প্রযুক্তিই আছে। এ ধরনের নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, ব্যবহার ও অর্থায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির মতে, ব্লকের চাহিদা এখনো খুব কম। সরকারও তার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্লক ব্যবহার করছে না। এ কারণে তারা উৎপাদনেও যেতে পারছেন না। এ বিষয়ে নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘ইটের বিকল্প কংক্রিট ব্লক’ বিষয়ক মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা  দেখা  দেবে। এ কারণে পরিবেশের ক্ষতিকর প্রচলিত ইটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি সংস্থা পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী  তৈরি করছে; কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই তা ব্যবহার করছে না। পরিবেশবান্ধব এসব নির্মাণসামগ্রী তৈরি করছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারি প্রতিষ্ঠান হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই)। রাজধানীর টেকনিক্যাল রোডে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানে তৈরি করা হচ্ছে এসব সামগ্রী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করলে নির্মাণ খরচও কমবে। তাই এসব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের জন্য প্রথমে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। এইচবিআরআই’র সামগ্রীগুলোর মধ্যে রয়েছে মাটি ও সিমেন্টের সংমিশ্রণে তৈরি ইট, ভবনের মেঝে, ছাদ ও দেয়াল তৈরির উপকরণ, হলো স্ল্যাব, বালু-সিমেন্টের কংক্রিট হলো ব্লক, পলি ব্লক, ড্রেজড মাটির ব্লক, মাটি-সিমেন্টের স্ট্যাবিলাইজড ব্লক, ফেরোসিমেন্ট পানির ট্যাংক, একতলা ভবনের খুঁটি, চাল প্রভৃতি।

এইচবিআরআই’র তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন বছরে ১৭ দশমিক ২ বিলিয়ন পিস ইট তৈরি হয়। প্রতি মিলিয়ন ইট তৈরিতে পোড়াতে হয় ২৪০ মিলিয়ন টন কয়লা। কয়লার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে বনভূমি ধ্বংস করে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ ও বাঁশের লাকড়ি। ইটভাঁটা থেকে বছরে কম করে হলেও ৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হচ্ছে বায়ুমণ্ডলে। বলা হচ্ছে, দেশে মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয় প্রায় ২৩ শতাংশ। সঙ্গে যোগ হচ্ছে কার্বন মনোক্সাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস। এসব বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির পাশাপাশি অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণিরও ক্ষতি হচ্ছে। মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। তাই পরিবেশ ও জলবায়ুর কথা বিবেচনা করে ২০২০ সালের মধ্যে সব ইটভাঁটা বন্ধের দাবি উঠেছে পরিবেশবাদীদের পক্ষ থেকে।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের তথ্যমতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১৭ লাখ একর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, ১৯৮৪ সালে দেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৩৮ হাজার একক। ১৯৯৭ সালে এসে কমে তা ১ কোটি ৭৪ লাখ ৪৯ হাজার একরে এবং সর্বোপরি ২০১২ সালে বাংলাদেশের আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৪ হাজার একরে। দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর জনসংখ্যা বাড়ার কারণে বাড়তি আবাসন, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাঠামো নির্মাণে ভূমির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ইটের বিকল্প ও ব্যয়সাশ্রয়ী নির্মাণ উপকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই)। প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উঠে আসে ইটের বিকল্প কংক্রিটের ব্লকের কথা। এই ব্লক নির্মাণ করা হয় সিমেন্ট ও নুড়ি পাথর দিয়ে। ইটের মতো পোড়াতে হয় না। এই ব্লক দিয়ে বাড়ি নির্মাণের বিষয়টি প্রচারের অভাবে গ্রামাঞ্চলের মানুষ খুব একটা জানে না। তাই এই পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করতে হলে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। এই পদ্ধতির সুবিধাগুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে। তাহলেই আমরা সার্বিকভাবে এর সুফল পাব।

উন্নত-উন্নয়নশীল দেশগুলো ভবন নির্মাণে বালু, সিমেন্ট ও নুড়িপাথর দিয়ে ব্লক ব্যবহার করছে। এতে করে একদিকে  যেমন কমছে কার্বন নির্গমন; অন্যদিকে রক্ষা পাচ্ছে ফসলি জমি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে ইটের ব্যবহার বন্ধ করে ব্লক ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, আমাদের দেশেও কংক্রিট ব্লককে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিয়ে পর্যায়ক্রমে পরিবেশবিরোধী ও কৃষিজমি ধ্বংসকারী ইটভাঁটাগুলো নিষিদ্ধ করা দরকার।  আশার খবর হলো, আমাদের দেশে কংক্রিট ব্লক ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। দেশের বেশকিছু নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে তাদের ভবনে ব্লক ব্যবহার করছে। ২০টির অধিক ব্লক নির্মাণ কারখানা গড়ে উঠেছে। কনকর্ড, মীর সিরামিক, মিরপুর সিরামিক, খাদিম সিরামিকসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠান এ ধরনের পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী তৈরি করছে। নদী থেকে ড্রেজিং করা বালুর সঙ্গে সিমেন্ট এবং পাথরকুঁচি ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে এসব ব্লক। তাই দেশের সার্বিক পরিবেশ ও ফসলি জমি রক্ষাকল্পে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পরিবেশবান্ধব ও সময়োপযোগী নীতিমালা গ্রহণ করে ইটের পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে সরকারের জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads