• বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৫
ads

ফিচার

সড়ক দুর্ঘটনা এবং দায় ও প্রতিকার

  • হিমেল আহমেদ
  • প্রকাশিত ২৫ এপ্রিল ২০১৯

বাংলাদেশে বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি দিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়কে মৃত্যুর খবর আমরা পাই, যা সত্যিই আমাদের জন্য বেদনাদায়ক। অনেক সচেতনতা, আন্দোলন ও নিয়মকানুনের পরেও দিন দিন সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি এক জরিপে জানা গেছে, সারা দেশে মহাসড়ক, আন্তঃজেলা ও আঞ্চলিক সড়কে গত তিন মাসে ১ হাজার ১৬৮টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২১২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন আরো ২ হাজার ৪২৯ জন। বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির (এনসিপিএসআরআর) নিয়মিত মাসিক জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য বলা হয়েছে। ওই জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে সড়কে মৃত্যু বর্তমানে দেশের জন্য একটি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত দিন যাচ্ছে ততই সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে। চাহিদা মেটাতে গিয়ে সড়কে বাড়ছে পরিবহন। আয়তন অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা অধিক এটি নতুন সমস্যা নয়। জনসংখ্যার চাহিদা মোতাবেক গণপরিবহনের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অভাব রয়েছে দক্ষ চালক ও প্রশস্ত রাস্তার। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির জরিপ অনুযায়ী, গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ হাজার ১২০ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২০ জন। এই সময়ে আহত হয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন, যা বিগত বছরগুলোর চেয়ে বেশি। এসব দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটেছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতির কারণে। সড়কে মৃত্যু নিয়ে অন্য একটি বেসরকারি সংস্থা নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি (এনসিপিএসআরআর) তাদের পর্যবেক্ষণে ১০টি কারণ উল্লেখ করেছে। সেগুলো হচ্ছে— চালকদের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও বেপরোয়া গতিতে চালানো; দিনভিত্তিক চুক্তিতে চালক, কন্ডাক্টর অথবা হেলপারের কাছে গাড়ি ভাড়া দেওয়া; অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক নিয়োগ; সড়কে চলাচলে পথচারীদের অসতর্কতা; বিধি লঙ্ঘন করে ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং; দীর্ঘক্ষণ বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো; ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব; জনবহুল এলাকাসহ দূরপাল্লার সড়কে ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা; সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেলসহ তিন চাকার যান চলাচল বৃদ্ধি; এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি ইঞ্জিনচালিত ক্ষুদ্রযানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। বুয়েটের এআরআইয়ের গত বছরের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে বছরে মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ হারিয়েছে বাংলাদেশ। দুর্ঘটনায় জানমালের ক্ষতি ও দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্ট যানজট অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করছে যা আমাদের দেশের জন্য অশনিসংকেত। এভাবে চলতে থাকলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কিছুদিন আগে এক দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি মাদক সেবন করেন কেন? তিনি জানিয়েছেন, মাদক সেবন ছাড়া গাড়ি চালাতে পারেন না! এ ধরনের অসংখ্য গাড়িচালক আছেন, যারা মাদকাসক্ত- তাদের চালকের আসনে বসানোর আগে  পুনর্বাসন জরুরি। অচিরেই চালকদের জন্য বিনামূল্যে সরকারিভাবে গাড়ি চালানোর ট্রেনিং সেন্টার খোলা উচিত। ফিটনেসবিহীন পরিবহন বাতিল করে সড়কে চলাচলযোগ্য পরিবহনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা উচিত। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই শহরে আমরা সবাই ব্যস্ত! তাই আমরা নিজেরাই ওই পরিবহনকে খুঁজি, যেটা সব ওভারটেক করে সবার আগে গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম। এখানে দায়ী আমরা নিজেরাই। তাই একতরফাভাবে চালকদের দোষ দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। যত্রতত্র রাস্তা পার হওয়া আমাদের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শুধু চালকদের নয়, সচেতন হতে হবে আমাদেরও। বেশি বেশি ফুটওভার ব্রিজ ও ফ্লাইওভার নির্মাণ করে দুর্ঘটনা কমানো যেতে পারে। আসুন, আমরা সবাই সচেতন হই; সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় নিয়ে যাই।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads