• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

ফিচার

বাটাম দ্বীপের রাজ্যে একদিন

  • এটিএম মোসলেহ উদ্দিন জাবেদ
  • প্রকাশিত ২৯ জুন ২০১৯

ভ্রমণপ্রিয় মানুষ আমি, সময়-সুযোগ পেলে কোথাও না কোথাও ভ্রমণে বের হয়ে যাই। তেমনি গত ২১ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার আর ২২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার এই দুদিন বন্ধ, সঙ্গে ১৯ ও ২০ তারিখ আরো দুদিন ছুটি নিয়ে দুই বন্ধু মিলে সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার বাটাম আইল্যান্ড ভ্রমণ করে এলাম। আমরা যারা ভ্রমণ করি, তারা সবাই কমবেশি সিঙ্গাপুর ভ্রমণ করে এসেছি, তাই সিঙ্গাপুর নিয়ে এবার কিছু লিখব না। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না সিঙ্গাপুরের খুব কাছেই সমুদ্রপথে মাত্র এক ঘণ্টা সময় পাড়ি দিয়ে ইন্দোনেশিয়ার বাটাম দ্বীপে পৌঁছানো যায়। যেহেতু ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশিদের বিনামূল্যে অন-অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়া হয়, তাই যে কেউ ইচ্ছা করলেই একদিনে বা ভালো করে দেখতে চাইলে দুদিনে সিঙ্গাপুর থেকে নৌপথে ২০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত অপূর্ব সুন্দর বাটাম আইল্যান্ড দেখে আসতে পারেন। যদিও এর আগে ইন্দোনেশিয়ার বালি ঘুরে এসেছি, কিন্তু এবার সিঙ্গাপুর থেকে সমুদ্রপথে ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। নৌপথে ইন্দোনেশিয়ার বাটাম দ্বীপের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের খুব ভালো যোগাযোগ আছে। সিঙ্গাপুরের দক্ষিণ উপকূল থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপ এলাকার আয়তন প্রায় সিঙ্গাপুরের সমান। সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের দুই ঘণ্টা সময়ের ব্যবধান, আর ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সময়ের ব্যবধান এক ঘণ্টা।

সিঙ্গাপুরে আমাদের হোটেল ছিল মুস্তফা সেন্টারের পাশেই। পূর্বপরিকল্পনা মতো আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা সেরে ফেলার পার্ক এমআরটি স্টেশন থেকে পাতাল রেলে সোজা চলে এলাম হারবারফ্রন্ট স্টেশনে। হারবারফ্রন্ট থেকে প্রথমে পাসপোর্ট ও সিঙ্গাপুরের ডাবল এন্ট্রি ভিসা দেখিয়ে ৪৯ সিঙ্গাপুর ডলারে রিটার্ন টিকেট কেটে ইমিগ্রেশন শেষ করে নির্দিষ্ট ওয়েটিং রুমে বসলাম। কিছুক্ষণ পর আমাদের ফেরিতে (যাত্রীবাহী নৌযান) বোর্ডিংয়ের ঘোষণা এলো। আমরা টিকেট দেখিয়ে জেটির দিকে রওনা করলাম। সুন্দর পরিষ্কার পরিপাটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেয়ার কোচ সমৃদ্ধ ফেরিতে উঠে বসলাম। নির্দিষ্ট সময়ে ফেরি যাত্রা শুরু করল। এখানে উল্লেখ্য যে, বাটাম গিয়ে আবার সিঙ্গাপুরে ফিরে আসতে হলে বাংলাদেশ থেকে ডাবল এন্ট্রি ভিসা নিয়ে যেতে হবে। সিঙ্গাপুর থেকে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সারাদিনই প্রতি ১৫ মিনিট পরপর ফেরি ছেড়ে যায় আবার একই নিয়মে ফিরে আসে।

স্বচ্ছ পানির সমুদ্রের বুক চিরে সমুদ্র থেকে একপাশে সিঙ্গাপুর শহর ও অন্য পাশে ইন্দোনেশিয়ার বাটাম দ্বীপের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে মাত্র এক ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম ইন্দোনেশিয়ার বাটাম জেটিতে। জেটির দিকে জাহাজ আগাতেই অর্থাৎ সমুদ্র থেকে চোখে পড়ে বাটাম পাহাড়ের গায়ে বড় করে লেখা ‘ওয়েলকাম টু বাটাম’। ইমিগ্রেশন সিস্টেম দেখে মনে হলো এটাও যেন সিঙ্গাপুর। খুব দ্রুততার সঙ্গে লাইন ও শৃঙ্খলার সঙ্গে সবকিছু শেষ হলো। ইমিগ্রেশন শেষে এগোতেই বাটাম সেন্টারেই চোখে পড়ল ইনফরমেশন সেন্টার, মানি এক্সচেঞ্জ, খাবারের দোকান, কাপড়, কসমেটিকস ও জুয়েলারিসহ বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান। আমরা ইনফরমেশন সেন্টার থেকে আইল্যান্ডটি সম্পর্কে ধারণা নিলাম, তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম ধারাবাহিকভাবে বাটামের প্রধান মসজিদ, নোংসা বিচ ও রিসোর্ট, নাগোয়া, কোস্টারিনা দেখতে যাব। ইনফরমেশন সেন্টার থেকে দেখিয়ে দিল ট্যাক্সি ভাড়া করার কাউন্টার। আমরা ডলার ভাঙিয়ে নিলাম আর লাখ লাখ টাকার মালিক হয়ে গেলাম। মানি এক্সচেঞ্জে ১০০ ইউএস ডলার ভাঙিয়ে ইন্দোনেশিয়ার ১৩ লাখ ৪০ হাজার রুপি পেলাম। মুদ্রার মান কম হলেও তাদের অর্থনীতি নড়বড়ে নয়, শক্ত ভিতের ওপর দণ্ডায়মান।

ইন্দোনেশিয়া হাজারো দ্বীপের একটি দেশ। বালি ও জাকার্তার পরেই তৃতীয় ব্যস্ততম প্রবেশদ্বার হলো বাটাম। এটি সেদেশের অষ্টম বৃহত্তম শহর। বাটাম দ্বীপ সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া ত্রিদেশীয় বিনিয়োগসমৃদ্ধ ফ্রি ট্রেড জোন বিধায় জিনিসপত্রের দাম সিঙ্গাপুরের চেয়ে কম। এখানে জাহাজ শিল্প ছাড়াও বহু ইলেকট্রনিকস ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে। যদিও উন্নত বিশ্বের সারিতে ইন্দোনেশিয়ার নাম নেই, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশটি উন্নতও নয়, তবু এ দেশটি ভীষণ সুন্দর ও সমৃদ্ধ। পর্যটন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ভর করে দেশটি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মূলত সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার জোহর বাহরুতে আসা বিদেশি পর্যটক ও সিঙ্গাপুর আর মালয়েশিয়ার জনগণই বাটামে বেশি বেড়াতে আসে। এখানে শপিং, খাওয়া, থাকা ও বেড়ানোর খরচ খুব কম। বিদেশিদের আকৃষ্ট করার জন্য রয়েছে অনেক সমুদ্র, বিচ, পাহাড় বন, মার্কেট, হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, বার, নাইট ক্লাব, ম্যাসাজ পার্লার ইত্যাদি। বাটামে চকোলেট, পোশাক, টুপি, জুতা, ব্যাগ, প্যাকেটজাত খাবার, ইলেকট্রনিকস পণ্য, মসলা ইত্যাদি পণ্যের ব্যাপক সমাহার ও দামেও সিঙ্গাপুরের তুলনায় সস্তা।

একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম বাটামের সৌন্দর্য দেখতে। বাটাম সেন্টারের ঠিক পাশেই অবস্থিত ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত হাইপার মার্কেট শপিং সেন্টার। অনেক বড় ও আধুনিক একটি শপিং মল। বিশ্বখ্যাত প্রায় সব ব্র্যান্ড পণ্যের (পোশাক, জুতা, কসমেটিকস, খাবার) পাশাপাশি স্থানীয় পণ্যের অনেক সমাহার রয়েছে। বাটাম সেন্টারে রয়েছে সেখানকার বেশিরভাগ সরকারি অফিস আদালত। সুন্দর গোছানো পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, দালানকোঠা, হোটেল, মার্কেট, মসজিদ ও বিভিন্ন স্থাপনা দেখতে দেখতে চলে এলাম বাটামের প্রধান মসজিদের সামনে। এটির নাম হলো ‘মসজিদ রায়া’, খুব সুন্দর একটি স্থাপনা। ভেতরে সাড়ে তিন হাজার আর বাইরের এলাকা মিলিয়ে ১৫ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারে। পিরামিড আদলের অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর গম্বুজই মসজিদটিকে বিখ্যাত করেছে। তার পাশের পাহাড়ে গায়ের সেই ‘ওয়েলকাম টু বাটাম’ লেখাটা খুব কাছ থেকে দেখলাম। এবার আমরা নোংসা বিচের উদ্দেশে রওনা হলাম। রাস্তাঘাটে লেটেস্ট মডেলের জাপানি, ব্রিটিশ ও আমেরিকান গাড়িও দেখা যায়। তবে শহরটিকে মনে হলো যেন মোটরসাইকেলের শহর। সবাই ট্রাফিক আইন মেনে চলে। গাড়িতে কোনো হর্ন বাজানো হয় না।

প্রায় আধঘণ্টা জার্নির পর নোংসা পয়েন্ট মেরিনা রিসোর্টের প্রধান ফটক দিয়ে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করলাম। শুরুতেই ডানদিকে চোখে পড়ল একটি দৃষ্টিনন্দন গলফকোর্স আর বাঁদিকে রিসোর্টের নয়নাভিরাম ফুলফলের বৃক্ষঘেরা কটেজগুলো দেখতে দেখতে আমরা চলে এলাম শান্ত নীল জলরাশির সমুদ্রতীরে। সাদা বালির সৈকতে শান্ত নীল জলরাশির সমুদ্র, কাঠের পাটাতনে তৈরি অস্থায়ী জেটিতে ভেড়ানো প্রমোদতরী (ইয়ট), কংক্রিটের বাঁধানো সমুদ্রতীরে নারকেল গাছের সারি, তার পাশে খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত রেস্তোরাঁ, স্থলভাগে রিসোর্ট, সুইমিংপুল, এককথায় পশ্চিমা ধাঁচে তৈরি অসাধারণ সুন্দর একটি পাঁচ তারকা মানের রিসোর্ট। রিসোর্টের সামনে ইসমাইল নামে একজন কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় হলো। পরিচয় দিয়ে বললাম আমরা বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে এসেছি। সে জানালো, বাংলাদেশ সম্পর্কে সে জানে ইন্দোনেশিয়ার মতো মুসলিম দেশ, তাই আগ্রহ নিয়ে কথা বলল। তার থেকে জানলাম রিসোর্ট সম্পর্কে। সে জানালো প্রমোদতরীগুলোতে রয়েছে হোটেলের মতো থাকার ব্যবস্থা, রেস্টুরেন্ট, বারসহ অনেক ব্যবস্থা। সারা বছরই কম বেশি গেস্ট থাকে, পশ্চিমা দেশের গেস্ট বেশি আসে। আশপাশে ছোট ছোট অনেক দ্বীপ আছে বিধায় এই বিচের জলরাশি শান্ত প্রকৃতির। যেহেতু আমাদের হাতে সময় কম অর্থাৎ একদিনের ভ্রমণ, তাই কিছু সময় সেখানে বেড়িয়ে রওনা করলাম বাটামের মূল কেন্দ্র নাগোয়া অভিমুখে।

প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের ভ্রমণ শেষে আমরা নাগোয়ায় পৌঁছে গাড়ি ভাড়া মিটিয়ে ড্রাইভারকে বিদায় করে দিলাম। নাগোয়া বাটামের মূল কেন্দ্র। এখানে ছোট বড় অনেক শপিং মল, রেস্টুরেন্ট, হোটেল, নাইট ক্লাব, ম্যাসাজ পার্লার রয়েছে। আমরা নাগোয়া হিলে মাতাহারি শপিং সেন্টার ঘুরে দেখলাম। বিশ্বখ্যাত প্রায় সব ব্র্যান্ড পণ্যের পাশাপাশি স্থানীয় পণ্যের অনেক দোকান রয়েছে। সেখান থেকে বেরিয়ে মিনিট তিনেক পায়ে হেঁটে চৌরাস্তার দিকে এগিয়ে গেলাম। এ জায়গাটিও জমজমাট, এটাই নাগোয়ার সবচেয়ে বড় চৌরাস্তা। আশপাশে অনেক দোকান, রেস্টুরেন্ট। আমরা রাস্তা পেরিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করলাম দুপুরের খাবার খেতে। এই রেস্টুরেন্টে ইউরোপিয়ান, চাইনিজ, ইন্ডিয়ান খাবার পাওয়া যায়। আমরা ফ্রেশ হয়ে খাবার অর্ডার করলাম সি-ফিশ (রূপচাঁদা) বিরিয়ানি। খাবারটা খুবই সুস্বাদু ছিল। খাওয়া শেষে বিল দিতে গিয়ে পরিচয় হলো এক বাংলাদেশি ভাইয়ের সঙ্গে। কথা বলে জানা গেল পরিবার নিয়ে সিঙ্গাপুর বেড়াতে এসে আমাদের মতো বাটামে বেড়াতে এসেছেন। তারা দুদিনের জন্য এসেছেন। ভালোই লাগল দেশি লোকজন পেয়ে, কিছুক্ষণ গল্প করে বিদায় নিয়ে যার যার মতো আশপাশের এলাকাটা ঘুরে দেখতে বেরিয়ে পড়লাম।

নাগোয়া থেকে বিকেলে রওনা করলাম নিও-কোস্টারিনা অভিমুখে। নাগোয়া থেকে ট্যাক্সিতে প্রায় মিনিট পনেরোর মতো লাগল সেখানে পৌঁছাতে। সমুদ্রতীরে অবস্থিত নিও-কোস্টারিনা একটি বিশাল এমিউজমেন্ট পার্ক। পার্কটিতে প্রবেশের মুখে সাগরের তীর ঘেঁষে রাস্তার পাশে রয়েছে ড্রাগন, সিংহ, ঘোড়া, গোখরা, গরু, মোরগসহ অনেক প্রাণীর বড় বড় স্ট্যাচু। পার্কটি থেকে সমুদ্রের মধ্য দিয়ে চলা সিঙ্গাপুর বাটামের চলমান ফেরি, মাছ ধরার বোটগুলো দেখতে খুব সুন্দর লাগে। সেখানে ঘুরতে ঘুরতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই আমরা ফিরে চললাম বাটাম সেন্টারের দিকে সিঙ্গাপুরে ফিরে আসার জন্য। যেহেতু আমাদের ভ্রমণটা ছিল একদিনের তাই বাটামের আরো অনেক জায়গা ঘুরে দেখার সুযোগ পেলাম না। যার মধ্যে রয়েছে বাটামের বিখ্যাত রেয়ারলাং ব্রিজ (ঝুলন্ত ব্রিজ), টুয়া প্যাং কোং বৌদ্ধ বিহার, দুতা বৌদ্ধ মন্দির উল্লেখযোগ্য। দুদিন থাকলে পুরো বাটাম ভালোভাবে ঘুরে দেখা সম্ভব ছিল। বাটামের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, মার্কেট, পর্যটন এলাকা তথা সর্বত্রই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সুন্দর। সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ায় পলিথিনের ব্যাপক ব্যবহার দেখেছি; কিন্তু রাস্তাঘাট বা খোলা জায়গায় ছুড়ে ফেলা কোনো পলিথিন দেখিনি। সেদেশের জনগণ নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলে। সবক্ষেত্রে তারা নিয়ম মেনে চলে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads